যথেচ্ছ ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে কৃষক

বালাইনাশকের লাগাম টানতে হবে

কৃষকের জীবন বিপন্ন করে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো কোনোভাবে টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদক নন; তিনি দেশের খাদ্যনিরাপত্তার রক্ষক। তার হাতে বিষ তুলে দিয়ে নিরাপদ খাদ্যের প্রত্যাশা করা স্ববিরোধী। তাই আর কালক্ষেপণ না করে বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষকের সুস্থ জীবন এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাÑ দুটোই জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনার সময় এসেছে।

কৃষি আমাদের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আর কৃষির প্রাণ কৃষক ফসল উৎপাদনের উপকরণের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হলে সেটি আর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না। তখন এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ ক্ষেত্রে বালাইনাশকের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে কৃষকদের ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার যে ভয়াবহ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গভর্নিং বডির সভায় এটি উঠে আসে।

ফসলের রোগবালাই ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে বালাইনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্রয়োজন আর যথেচ্ছ ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য করতে না পারলে বিপদ আসন্ন। স্মরণযোগ্য যে, কোনো জিনিস যতটুকু না হলে নয়, তাই প্রয়োজন। অন্য দিকে দরকারের চেয়ে বেশি ব্যবহার করা হলো যথেচ্ছ। সরকারি কৃষি তথ্যানুযায়ী, বালাইনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারে তাৎক্ষণিকভাবে চোখ-ত্বকের জ্বালা, শ্বাসকষ্ট, বমিভাবসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, টিউমার, বন্ধ্যত্ব, জন্মগত ত্রুটি এবং কিডনি, লিভার ও ফুসফুসের ক্ষতির মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়Ñ বালাইনাশকের ঝুঁকি সম্পর্কে বেশির ভাগ কৃষক সচেতন নন। এর ক্ষতিকর দিক না জানা থাকায় তারা সুরক্ষা পোশাক, মাস্ক, দস্তানা বা চোখ রক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া জমিতে বিষাক্ত রাসায়নিক ছিটান। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রশিক্ষিত কৃষি কর্মকর্তার পরিবর্তে কীটনাশক বিক্রেতার পরামর্শ হয়ে ওঠে প্রয়োগের প্রধান নির্দেশনা। সাম্প্রতিক সময়ে এক প্রতিবেদনে প্রশিক্ষণহীন বিক্রেতার পরামর্শ এবং দুর্বল সরকারি তদারকির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রভাব শুধু কৃষকের শরীরে সীমাবদ্ধ থাকে না। অতিরিক্ত বালাইনাশক মাটি, পানি ও পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফসলে অবশিষ্টাংশ থেকে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ফলে যে কৃষক খাদ্য উৎপাদন করছেন, তিনি এক দিকে বিষের সংস্পর্শে আসছেন, অন্য দিকে তার উৎপাদিত খাদ্যের মাধ্যমে ভোক্তারাও ঝুঁকিতে পড়ছেন; অর্থাৎ এটি কৃষক ও ভোক্তাÑ উভয়ের নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

এমন অবস্থায় শুধু কৃষকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না। সচেতনতা বাড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরকে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অনুমোদিত বালাইনাশক, সঠিক মাত্রা, প্রয়োগের সময় এবং ফসল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত বিরতিসহ সব বিষয়ে কৃষককে হাতে-কলমে শিক্ষা দিতে হবে। একই সাথে অনিবন্ধিত ও উচ্চঝুঁকির বালাইনাশক বিক্রি বন্ধ এবং দোকান পর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। তবে এর মধ্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলোÑ সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, জৈব ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি এবং নিরাপদ বিকল্পকে কৃষকের কাছে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা। আমরা মনে করি, কৃষকের জীবন বিপন্ন করে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো কোনোভাবে টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদক নন; তিনি দেশের খাদ্যনিরাপত্তার রক্ষক। তার হাতে বিষ তুলে দিয়ে নিরাপদ খাদ্যের প্রত্যাশা করা স্ববিরোধী। তাই আর কালক্ষেপণ না করে বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষকের সুস্থ জীবন এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাÑ দুটোই জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনার সময় এসেছে।