‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’কে দুর্বল অ্যাখ্যা, সংসদীয় কমিটির বৈঠক বর্জন বিরোধী দলের

বৈঠকে গত ছয় মাসে দেশে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি বলে উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে মব তৈরির চেষ্টা চললেও কোনো রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি বলেও সভায় জানানো হয়।

সংসদ প্রতিবেদক
আলোচনা শেষে বিলটি সংসদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়
আলোচনা শেষে বিলটি সংসদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয় |প্রতীকী ছবি

‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-কে দুর্বল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সুবিধা দেয়ার মতো বিল আখ্যা দিয়ে জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করেছেন বিরোধীদলীয় দুই সংসদ সদস্য মো: নূরুল ইসলাম ও মো: আব্দুল বাতেন। তাদের অভিযোগ, গুমের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলে ভুক্তভোগীরা যথাযথ বিচার পাবেন না। একইসাথে আগের অধ্যাদেশ ও বিল ল্যাপস করিয়ে নতুন করে দুর্বল আইন আনার প্রতিবাদেও তারা বৈঠক বর্জন করেন।

রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এ ঘটনা ঘটে। বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন দেয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে বিলটি সংসদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল সাংবাদিকদের বলেন, সরকার আগে আরো শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সংসদে এবার যে বিল উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটি আগের চেয়েও দুর্বল।

তিনি বলেন, গত ২৭ আগস্ট ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বক্তব্য দেয়া হয়েছিল। এর আগে ল্যাপস হয়ে যাওয়া ২০টি বিলের প্রতিবাদে তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং মানবাধিকার-সংক্রান্ত বিলও ওই প্রক্রিয়ার অংশ ছিল বলে তিনি দাবি করেন।

নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ‘আমরা এই বিলের কোনো আলোচনা বা কোনো প্রক্রিয়ার সাথে অংশগ্রহণ করতে চাই না। কারণ বিলটি দুর্বল। তার চেয়েও বড় বিষয় হলো, আগে যে বিলগুলো ল্যাপস করে দেয়া হয়েছে, সেগুলো নতুন করে নিজেদের মতো করে আনা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সামগ্রিক সংস্কার চাই। সংবিধান ও রাষ্ট্রের মেরামত চাই। কিন্তু সেই সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাইপাস করে সরকার নিজেদের মতো করে বিভিন্ন বিষয় সামনে আনার চেষ্টা করছে। এই প্রক্রিয়ার সাথে আমরা সম্পৃক্ত হতে চাই না।’

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে রাষ্ট্র ও সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। এর বাইরে অন্য কোনো বিল পাসের প্রক্রিয়ায় তারা অংশগ্রহণ করতে চান না।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের ১৪ নম্বর ধারা নিয়ে আপত্তি তুলে নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ওই ধারায় গুমের অভিযোগ এলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘গুমের ঘটনায় যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই তদন্ত করে, তাহলে সেটি যথাযথ তদন্ত ও বিচারের পরিবর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়মুক্তি দেয়ার প্রক্রিয়ায় পরিণত হতে পারে।’

তার অভিযোগ, ‘এই বিলটি আসলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী-বান্ধব বিল হয়েছে। এটি জনবান্ধব বা ভিকটিমবান্ধব হয়নি।’

তিনি বলেন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গুমের ঘটনা তদন্ত করলে ভুক্তভোগীরা যথাযথ আইনি সহায়তা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ বেশি থাকবে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলে ভুক্তভোগীদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিরোধীদলীয় এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘সরকার বলেছিল অধিকতর শক্তিশালী আইন করবে। অথচ সামনে এনেছে অধিকতর দুর্বল বিল। এ কারণে আমরা আজকে স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করেছি।’

এদিকে, কমিটির সদস্যদের ওয়াকআউটের বিষয়ে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, কমিটির সদস্য হিসেবে কোনো সংশোধনী বা মতামত থাকলে তা সভায় উপস্থাপন, পরামর্শ দেয়া এবং প্রয়োজনে বিরোধিতা করার সুযোগ রয়েছে। এটিই কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব।

তবে সভা থেকে ওয়াকআউট করা সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বৈঠকে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ এ বিল প্রণয়ন ও উত্থাপনের উদ্যোগ নেয়ায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে কমিটির পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয়।

বৈঠকে গত ছয় মাসে দেশে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি বলে উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে মব তৈরির চেষ্টা চললেও কোনো রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি বলেও সভায় জানানো হয়।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেনি বলেও বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।

মিরাজ শেখের অপহরণের ঘটনায় সরকারের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও বৈঠকে আলোচনা হয়। এ ধরনের দোষারোপের রাজনীতি বা ‘ব্লেম গেম’ পরিহার করা উচিত বলে সভায় মত প্রকাশ করা হয়।

বৈঠকে কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু, শিরীন সুলতানা, মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল এবং মো: আব্দুল বাতেন অংশ নেন।

এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অধিদফতরগুলোর মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রধান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।