- মূল বেতন সর্র্বোচ্চ ১০০% ভাগ বাড়ানোর সুপারিশ
- জুডিশিয়াল সার্ভিসের পে-কমিশনের সুপারিশ জমা
- চলতি বছরেই পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে-অর্থমন্ত্রী
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন স্কেল চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে বর্ধিত মূল বেতন এবং পরবর্তী ধাপে বিভিন্ন ধরনের ভাতা দেয়া হবে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, চলতি বছরেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে।
এদিকে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে গঠিত সচিব কমিটি এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশনের সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এখন তা মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হওয়ার পরই নতুন পে-স্কেল চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, চলতি বছরের মধ্যেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর করা হবে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে বেতন কাঠামোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আরো পর্যালোচনা ও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু পে-কমিশনের সুপারিশ নয়; এর সাথে আরো বেশ কিছু বিষয় যুক্ত রয়েছে। বিশেষ করে জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন কাঠামোসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন, ২০২৫’-এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। গতকালের বৈঠকে প্রতিবেদন ও সুপারিশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয় এবং বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামোর বিষয়টিও নতুন পে-স্কেলের সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অর্থমন্ত্রী আরো জানান, পে-কমিশনের প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা চলছে এবং আরো কিছু বিষয়ে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার পর তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
নবম পে-স্কেল চলতি বছরের মধ্যে কার্যকর হবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী দৃঢতার সাথে বলেন, “এ বছরের মধ্যেই হবে, অবশ্যই হবে। এ বছরের মধ্যেই হবে, সবই হবে।” অন্যদিকে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে কি না জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করেন, “একটু একটু।”
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বাজেটের ওপর প্রভাব, মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি এবং সরকারি ব্যয়ের ভারসাম্যের বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব বিষয়ের আলোকেই পে-স্কেলের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে।
সচিব কমিটির সুপারিশে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সচিব কমিটি পে-কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বেতন বৃদ্ধির হার নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর আগে পে-কমিশন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করলেও বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় সচিব কমিটি তা কমিয়ে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ করার সুপারিশ করে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকার কাছাকাছি করার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে, সর্বোচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদনের সময় এসব অঙ্কে পরিবর্তন আসতে পারে।
দুই ধাপে বাস্তবায়ন হবে নতুন বেতন কাঠামো
নতুন পে-স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হবে। পরবর্তী ধাপে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সমন্বয় করা হতে পারে।
এদিকে সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষে প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুকে ‘নবম পে-স্কেল : সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুখবর’ উপশিরোনামে এটি বাস্তবায়নের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেতনভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন-গ্র্যাচুইটিসহ মোট এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। তৎকালীন অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন এই কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে কমিশন মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল।
পরে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ দিতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব, প্রতিরক্ষাসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রক রয়েছেন।
এর আগে গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোতে রয়েছেন এবং এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে।
কমিশনের সুপারিশের চেয়ে কম
নতুন কাঠামোর এই প্রস্তাব এসেছে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের মূল সুপারিশ পর্যালোচনার পর। ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে চেয়ারম্যান করে গঠিত কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছিল। কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে তখন জানানো হয়েছিল।
কিন্তু সরকারের পর্যালোচনা কমিটি আর্থিক সক্ষমতা, বাজেটের ওপর চাপ এবং বাস্তবায়নযোগ্যতা বিবেচনায় মূল বেতন বৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমা ১০০ শতাংশ রাখার সুপারিশ করেছে। একই সাথে আর্থিক চাপ সামাল দিতে বেতন ও ভাতা দুই ধাপে কার্যকরের প্রস্তাব করা হয়েছে।



