মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

উন্নয়ন নিয়ে হাজারো কল্পকাহিনী দেশের মানুষ শুনেছে। দেখানো হতো অন্তহীন খোয়াব আর সম্ভাবনার কথা। তবে রাত পোহালে সব হয়ে যেত মরীচিকা। যেন সেই গানের মতো, ‘এই হেরিলাম সোনার তরী, আবার দেখি নাই রে।’ উন্নয়নের চেহারা ঠিক এমন ছিল, যেমন হাজার কোটি টাকা খরচ করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল সড়ক বানানো হয়েছিল। কিন্তু এর প্রকৃত ব্যয় ১১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা। এই পথ রচনায় পরিকল্পনায় গলদ ছিল। কেননা কোনো পরিকল্পনা সফল সমাপ্তির জন্য বহু ডিসিপ্লিনকে একত্র করতে হয়। সেটি করা হয়নি বলে রেলপথ চালুর আগেই পাহাড়ি বন্যার তোড়ে প্রায় ভেসে গিয়েছিল। আবার টাকা ঢেলে চালু করার পর ২০২৬ সালের বন্যায় আবারো রেলপথটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে দুই-দুবার রেলপথটি চালু করতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। একেই বলে আক্কেলসেলামি। 
সব কর্তৃপক্ষ এমন বেআক্কেলের মতো কাজ করে দেদার অর্থ গচ্চা দিচ্ছে। জবাবদিহির অভাব এর মূল কারণ। বারবার আক্কেলসেলামি দিতে হয়। জানি না গরিবের টাকা কোথায় কোন ধনীর অ্যাকাউন্টে ঢোকে। এই বেয়াক্কলিপনা শুধু উন্নয়ন ঘিরে নয়। প্রায় সর্বত্র দৃশ্যমান। কোথায় নেই সেটিই দেখার মতো। কিন্তু কেউ জানার চেষ্টা করে না। যখন জানা যায়, তখন আর ফেরার পথ থাকে না। সবাই এ-ও জানে, লীগ জামানায় (২০০৯ থেকে ২০২৩) পর্যন্ত দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে বাইরে চলে গেছে। এই অঙ্কটা কত বড়, কত টাকার। এটা বড় কি ছোট এ নিয়ে কেউ কখনো ভাবে না। এই ক্ষতিটা কাকে স্পর্শ করছে, তা কেউ চিন্তা করে না। এই লুটতরাজের সাথে রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের বিভিন্ন ব্যক্তি, মধ্যস্বত্বভোগী ও সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পক্ষের সংশ্লিষ্টতায় একটি কাঠামো তৈরি হয়েছিল। আবারো একটি গানের কলি মনে আসে, ‘হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ।’ আসলেই আমাদের গোটা সমাজই এখন অন্ধ। অন্ধ না হলে কেন দেখি না, ভাবি না কার টাকা কিভাবে পানিতে ফেলা হচ্ছে। এখানেই শেষ না, কত যে ফাঁকফোকর আছে, সেই ছিদ্র পথ দিয়ে কত টাকা ভেসে যাচ্ছে, আমরা খবর রাখি না। বিষয়গুলো প্রায় সবারই জানা। যেন এক রহস্যেঘেরা গল্প। এমন ‘না’র  বৃত্তের মাঝেই দেশ বিরাজ করছে।
পশ্চিমা দুুনিয়ায় উন্নয়ন নিয়ে একটি সংজ্ঞা আছে। চলুন দেখে নিই, সেখানে কী বলা আছে। নানা ডিসিপ্লিনের ‘বিশেষজ্ঞদের’ গবেষণালব্ধ জ্ঞানের আলোকে, নির্ভুল পরিকল্পনা রচনা, পরে  নিখুঁত পথনকশা তৈরি করা। সব কিছুতে ধারাবাহিকতা রক্ষার শৈলী অনুসরণ করা। এখানে বিরতির কোনো অবকাশ নেই। দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সামর্থ্য নির্মাণ। উপযুক্ত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, নারী-পুরুষের নিরাপত্তা, নগর গ্রামের বৈষম্য দূর করা, লিঙ্গ ভেদাভেদে কর্মসংস্থান, সামাজিক ও নাগরিকের অধিকার ও ভবিষ্যতে সুযোগ সমানভাবে দেয়া। নিরবচ্ছিন্ন অগ্রগতি, পরিবেশ ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ রচনা। যেহেতু পশ্চিম পূর্ব থেকে হাজার হাজার মাইল দূরত্বে; তাই এসব নীতিবাক্য থেকে দূরে থাকাই ভালো। এই ভূখণ্ডের সাথে সেটি খাপ খায় না। এমনটিই আমাদের চিন্তাচেতনা। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, এসব বিষয়কে উপেক্ষার কোনো সুযোগ নেই। দেশের সর্বোচ্চ আইনগ্রন্থ তথা সংবিধানে এমনটাই উল্লেখ আছে। যাই হোক, মুদ্রার অপর পিঠে কী আছে সেটি না হয় দেখা যাক। 
দীর্ঘ সময় ডুবে থাকার পর, মগ্ন মৈনাকের মতো গভীর ঘুম থেকে জেগে কোনো এক মন্ত্রী বাহাদুর গর্বভরে বলেছেন, আমরা তো আর হতদরিদ্র নই। সে পথ অতিক্রম করে আমরা এখন দারিদ্র্যের মধ্যে সংহত হয়েছি। সামান্য বিলম্বের পর অপর এক বাহাদুর মন্ত্রী কণ্ঠ উঁচিয়ে বলেন, না, আমরা এখন দরিদ্র না, মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়ে ওঠার দ্বারপ্রান্তে। হায়রে, সেই সব মন্ত্রী বাহাদুরদের তেলেসমাতি। রাত না পোহাতে এত বড় হাইজাম্প। কথা বলতে তো কারো ট্যাক্স দেয়া লাগে না। তাই বাকওয়াজ করা খুব সহজ। তা ছাড়া জাতি হিসেবে আমরা প্রচণ্ড বাকপটুতা ও স্মৃতিভ্রষ্টতায় ভুগী। আমরা অঙ্কে বড় কাঁচা। সে কারণেই নেতাদের ভুয়া স্লোগানের সাথে সুর মিলিয়ে ধ্বনি তুলতে আমরা অদ্বিতীয়। দিনে একবার খেতে না পারলেও রাতে স্বপ্নে ভূরিভোজে আমাদের ক্ষুধা মিটে যায়। ভোর না হতেই সেই নেতার সাথে স্লোগানে মেতে উঠতে কষ্ট হয় না। কেননা, ‘দাদায় কইছে দিবো’। বিশেষ করে এ দেশে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষকে নিয়ে মশকরা করতে অনেকেই আনন্দ পান। ‘ইনহাস্ত ওয়াতানাম’, এটিই আমাদের দেশ।
একবার ভেবে দেখুন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে আমাদের গতিটা কার মতো। সবাই হয়তো ভুলে গেছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প কবে কখন শুরু হয়েছিল। স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, সেই গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। ইতোমধ্যে নতুন শতাব্দীর সিকি ভাগ অতিক্রান্ত হয়েছে। তাহলে এখন বিদ্যুৎ কোথায়!
আবারো ফিরে যাওয়া যাক বেহুদা টাকা খরচের খতিয়ানে। বাংলাদেশের খোয়া যাওয়া টাকার অঙ্ক কত বড়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিডিপি বলেছে, ২০০৮-২৩ সাল পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা ২৪টি বড় ব্যাংক ব্যবস্থার অনিয়ম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট ৯২ হাজার ২৬১ টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতের হিসাব আছে। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদানীন্তন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংক খাত থেকে ভুয়া ঋণের মাধ্যমে আনুমানিক ১৮-২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। এ ব্যাপারে তাদের হাতে তথ্য প্রমাণ আছে বলে দাবি করেন। তিনি আরো বলেন, এই অর্থ উদ্ধারের জন্য তদন্ত চলছে। নতুন সরকার আসার পর এ নিয়ে কোনো উদ্যোগের খবর এখনো জানা যায়নি। আর এই হিসাবে ২৩৪ বিলিয়ন অবৈধ অর্থ পাচারের একটি অনুমাত্র মাত্র। বাস্তবে এর বেশি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। অপর দিকে দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সাথে সম্পর্কিত দেশে-বিদেশে প্রায় ১০ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করার কথা জানানো হয়েছিল।
নদীমাতৃক বাংলাদেশ; হাজারো নদী জালের মতো জড়িয়ে রেখেছে এই জলাভূমিকে। তাই এখানে ব্রিজ, কালভার্টের গুরুত্ব বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। এক পরিসংখ্যান বলছে, দেশের গ্রামীণ জনপদে একসময় (১৯৮২-২০১৭) ২৮ হাজার ৬৭৪টি সেতু-কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছিল। আরো তথ্য হচ্ছে, এর মাঝে বহু সেতু-কালভার্ট অসমাপ্ত থেকে যায় বা নির্মাণকাজ পরিত্যক্ত হয়। ফলে ওই সব গ্রামীণ জীবনে বসবাস অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এমন কষ্টের খবর প্রায় প্রতিদিন অঞ্চলে প্রকাশ পাচ্ছে। 
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি। প্রতি বছর সরকার সড়ক, সেতু, রেলপথ, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পানি ও নগর অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেয়। এসব বিনিয়োগের উদ্দেশ্য হলো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উন্নয়ন বাজেটের আকার যতটা বড় হচ্ছে, তার পুরোপুরি ও কার্যকর বাস্তবায়ন সেই অনুপাতে হচ্ছে না।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। পরিবহন ও যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং নগর অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতকে উন্নয়ন ব্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে রাখা হয়েছে।
কিন্তু উন্নয়ন বাজেটের প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে শুধু বরাদ্দের পরিমাণ দেখলে চলে না। বরাদ্দই সব নয়। দেখতে হবে সেই অর্থ কতটা সঠিকভাবে ব্যয় হয়েছে এবং তার বিনিময়ে জনগণ কতটা সুফল পেয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির পরিমাণ ছিল প্রায় দুই লাখ ৮ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা ছিল। বছর শেষে এর প্রায় ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। অর্থাৎ বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ব্যয় করাই সম্ভব হয়নি। বাস্তবায়নের এই হার গত কয়েক বছরের তুলনায়ও কম। এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে আরো হতাশ হতে হবে।
অন্য দিকে বৈদেশিক অর্থায়ননির্ভর প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা দেখা যায়। ঋণ বা অনুদান পাওয়া গেলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশাসনিক ও কারিগরি সক্ষমতা না থাকলে সেই অর্থ যথাসময়ে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। ফলে বৈদেশিক অর্থায়ন থাকলেও প্রকল্পের কাজ এগোয় ধীরগতিতে।
উন্নয়ন বাজেটের সাথে দুর্নীতি ও অপচয়ের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় কত হওয়া উচিত এবং বাস্তবে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে— সে বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে তার কারণ জনসমক্ষে পরিষ্কার করা দরকার। একই সাথে নিম্নমানের কাজ, অতিরিক্ত ব্যয়, ঠিকাদারি অনিয়ম কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বার্থের সঙ্ঘাত থাকলে তা কঠোরভাবে তদন্ত ও প্রতিরোধ করতে হয়। 
আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় চিত্র হলো, ২০২৬ সালের একটি সরকারি গ্রামীণ সড়ক পুনর্বাসন প্রকল্পে দেশে গ্রামীণ সড়কে বিদ্যমান সেতু-কালভার্টের মোট দৈর্ঘ্য দুই লাখ ১৯ হাজার ৯৭১ মিটার উল্লেখ করা যায়। অথচ এর অধিকাংশ এখন সচল নয়। অচল কয়েকটি সেতু-কালভার্টে ব্যয় করা হয়েছে ১৩ কোটি কয়েক লাখ টাকা। 
লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
ndigantababar@gmail.com

Advertisement