মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

একটি দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক মেজাজ বা স্বাস্থ্যের সঠিক ধারণা পাওয়া যায় দেশটির রাজধানীর সামগ্রিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। রাজধানী হলো একটি রাষ্ট্রের হৃৎপিণ্ড। সেখানে যদি শঙ্কা, অপরাধ ও নৈরাজ্যের কালো ছায়া দীর্ঘ হয়, তাহলে তার প্রভাব পুরো রাষ্ট্রকাঠামোতে সংক্রমিত হতে বাধ্য। বর্তমান সময়ে এসে প্রশ্ন উঠেছে— আমাদের রাজধানী ঢাকা কী তবে আজ এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে? আজ রাত নামলে ঢাকার বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকা যেভাবে নিরাপত্তাহীনতার চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে, তাতে এটিকে কেবল ‘শহর’ না বলে ‘দুর্দশা ও দুষ্কৃতির রাজধানী’ কিংবা ‘ছিনতাই নগরী’ বললেও খুব একটা বাড়িয়ে বলা হয় না।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাতের একটি ঘটনার কথা ধরা যাক। রাত তখন সাড়ে ১০টা। ধোলাইরপাড় চৌরাস্তা থেকে পোস্তগোলা সেতু পর্যন্ত এলাকায় তৈরি হয়েছে এক দীর্ঘ ও অসহনীয় যানজট। ট্রাক, বাস, মিনিবাস, কাভার্ডভ্যান, প্রাইভেটকার আর মাইক্রোবাসের অন্তহীন সারি। রোড লাইটের আবছা ও ম্লান আলোয় হঠাৎ দেখা গেল, একদল কিশোর-তরুণ এক্সপ্রেসওয়ের রোড ডিভাইডার টপকে অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে নিচে নেমে আসছে। তাদের কারো হাতে ছোট রড, কারো হাতে ধারালো ছুরি বা চাকুসদৃশ বিপজ্জনক অস্ত্র।
এই অস্ত্রধারী তরুণের দল মুহূর্তের মধ্যে চড়াও হলো রাস্তায় আটকে থাকা একেকটি গাড়ির ওপর। কেউ প্রাইভেটকারের দরজা টেনে খোলার চেষ্টা করছে, কেউ আবার গাড়ির বনেটে হাত দিয়ে হিংস্র থাবা বসাচ্ছে। পাশেই ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের পেছনের ত্রিপল ও রশি কেটে মালামাল লুটের পাঁয়তারা চলছে। অনেকে আবার গাড়ির সামনে ইচ্ছাকৃতভাবে দাঁড়িয়ে চালকের সাথে ঝগড়া বাধানোর ভান করছে। চোখের পলকে এ আকস্মিক দৃশ্য যাত্রীদের মনে তীব্র ভীতি ছড়িয়ে দিলো। ভয়ে চালকরা দ্রুত গাড়ির দরজা-জানালা লক করে দিলেন। কেউ কেউ আবার আতঙ্কে গাড়ির ভেতরের বাতি পর্যন্ত নিভিয়ে দিলেন। ভ্যাপসা গরমের মধ্যেও ট্রাকচালকরা কাচ তুলে দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে ভেতরে বসে রইলেন। নারী ও শিশুসহ যেসব গাড়িতে যাত্রীর সংখ্যা কম ছিল, সেগুলোতে আতঙ্কের মাত্রা ছিল আরো বহুগুণ বেশি। এ চিত্র কোনো একক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি আজকের ঢাকার নৈমিত্তিক সন্ধ্যার একটি ভয়ঙ্কর প্রতিচ্ছবি।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসা দূরপাল্লার যানবাহনের একটি বড় অংশ পদ্মা সেতু হয়ে এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে দ্রুত ঢাকায় প্রবেশ করলেও ধোলাইরপাড় চৌরাস্তায় এসে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে পড়ে। অনেক সময় এ জ্যামের দীর্ঘ সারি পোস্তগোলা সেতু পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ একই স্থানে গাড়িগুলো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়, আর ঠিক তখনই এ স্থবিরতাকে অপরাধীরা সুবর্ণ সুযোগ বা ‘নিশানা’ হিসেবে বেছে নেয়।
খুলনার তেরোখাদা থেকে তাজা শাকসবজি নিয়ে যাত্রাবাড়ী পাইকারি বাজারে আসছিলেন চালক আল আমিন। তার অভিজ্ঞতার বয়ান অনুযায়ী, প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ধোলাইরপাড়ের এই যানজটে পড়ে তাদের এমন নারকীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। অপরাধীরা খুব ভালো করে জানে, জ্যামে আটকে থাকা গাড়ি চটজলদি নড়াচড়া করতে পারবে না। ফলে চালক ও যাত্রীদের অসহায়ত্ব পুঁজি করে তারা অনায়াসে অপরাধ সংঘটিত করে পালিয়ে যায়।
শুধু ছিনতাই বা থাবাপার্টি-টানাপার্টি নয়; রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, এমনকি প্রকাশ্য হামলা, ভাঙচুর ও দখলের মতো গুরুতর অভিযোগও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মোহাম্মদপুর, আদাবর, ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, মিরপুর থেকে শুরু করে যাত্রাবাড়ী— প্রতিটি এলাকার বাসিন্দাদের রাতের নিরাপত্তা নিয়ে আজ গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ঘটনার দিকে তাকালে এ ভীতিকর পরিস্থিতির গভীরতা আরো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। পল্লবীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রোপার্টিজে প্রকাশ্য হামলা, ভাঙচুর ও দখলের চেষ্টা; মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিকে সশস্ত্র হামলা; মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এবং আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও জোরপূর্বক দখল চেষ্টার ঘটনাগুলো রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে এক গভীর সঙ্কটে দাঁড় করিয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে আদাবরে পুলিশ বাহিনীর ওপর সংঘটিত হামলার ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধীরা আজ কতটা বেপরোয়া ও উদ্ধত হয়ে উঠেছে।
রাজধানীতে চলমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন বিশেষ অভিযান, যেমন— ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ চলাকালেও অপরাধীদের তৎপরতা কমেনি। বরং নাগরিকদের মনে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন— কখন, কার জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক কিংবা সাজানো বাসাটিতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দুর্বৃত্তরা হামলা চালাবে?
অপরাধ দমনে কেবল মাঠপর্যায়ের চুনোপুটিদের গ্রেফতার করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলবে না। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধের পেছনে থাকা মূল অর্থদাতা, নেপথ্যের আশ্রয়দাতা, সংগঠক এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক বা সামাজিক শক্তিগুলোকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা না গেলে, এ চক্রের এক সদস্য ধরা পড়লেও নতুন কোনো মুখ ঠিকই মাঠে নেমে আসবে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকারে’র পরিচালক সম্প্রতি এক বক্তব্যে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এক ত্রুটির কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘অপরাধের মূল উৎপাটন করতে না পারার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। পুলিশ মাঠপর্যায়ের অনেক অপরাধীকে গ্রেফতার করছে বটে, কিন্তু অপরাধের মূল শিকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না। ফলে নেপথ্যের কারিগররা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে’।
রাড্ডা ক্লিনিকে হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, ওই ঘটনায় একজন প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির নাম এলেও তাকে আইনের আওতায় আনা হয়নি। পুলিশ মূলত ভাড়ায় আনা মাঠের কিছু ক্যাডারকে ধরে দায় সারছে। এ ছাড়া আইনি ব্যবস্থার ফাঁকফোকরের বিষয়টিও জোরালোভাবে তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, জামিন পাওয়া মানুষের সাংবিধানিক অধিকার হলেও, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় অপরাধের মারাত্মক ধরন দেখে আইনি কাঠামো আরো কঠোর করা দরকার। যাতে গুরুতর অপরাধীরা দ্রুত আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে এসে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়তে না পারে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনে সংঘটিত বেশ কিছু অপরাধ সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশকে অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীন ও পেশাদারত্বের সাথে কাজ করতে দেয়া হয় না। প্রভাবশালী মহলের রাজনৈতিক বা নানামুখী মদদে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশি পদক্ষেপ অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। অপরাধী যেই হোক না কেন, তার রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের একমাত্র চাবিকাঠি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো: রেজাউল করিম সোহাগ অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে ‘সময়’ এবং ‘স্থান’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। অপরাধীরা সবসময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বা তৎপরতা যেখানে কম বা ঢিলেঢালা মনে হয়, তারা সেখানে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমান সময়ে রাতের অপরাধের প্রবণতা বেশি হলেও বিভিন্ন নির্দিষ্ট লোকেশনে অপরাধের ধরন ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি মারাত্মকভাবে বেড়েছে। তার মতে, অপরাধ দমনে পুলিশকে কেবল ঘটনা ঘটার পর সক্রিয় হওয়া বা ‘রিঅ্যাকটিভ’ হওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আরো বেশি ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ বা পূর্বপ্রস্তুতিমূলক ভূমিকা নিতে হবে। পুলিশি কার্যক্রমে এ দূরদর্শিতার ঘাটতি থাকায় অপরাধীরা দিন দিন আরো বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। তিনি জোরালোভাবে পরামর্শ দিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারব্যবস্থা এবং কারাব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। অপরাধী গ্রেফতার, নিবিড় তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং যথাসময়ে সাজা কার্যকর— এ পুরো চক্রের মধ্যে শক্ত সমন্বয় না থাকলে কোনো দিন অপরাধ দমনের দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
পরিশেষে বলা যায়, ঢাকা আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাং, টানাপার্টি, থাবাপার্টি থেকে শুরু করে সঙ্ঘবদ্ধ দখলদার চক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এই মেগাসিটি। ইসিবি চত্বরের তাণ্ডব, রাড্ডা ক্লিনিকের হামলা কিংবা মোহাম্মদপুর ও আদাবরের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের ওপর দুর্বৃত্তদের চড়াও হওয়ার ঘটনাগুলো কোনোভাবে একটি সভ্য রাষ্ট্রের রাজধানীতে কাম্য হতে পারে না। শহরটি রক্ষা করতে হলে কেবল দায়সারা গোছের সাঁড়াশি অভিযান চালালে চলবে না; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দৃঢ়তা এবং বিচারব্যবস্থার আমূল সংস্কার। চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সরকারের নতুন করে কঠোর অভিযান পরিচালনার কথা শোনা গেলেও তার দ্রুত ও দৃশ্যমান বাস্তবায়ন দেখতে চায় নগরবাসী। অপরাধীদের মনে আইনের এমন এক কঠোর ভীতি তৈরি করতে হবে, যাতে কেউ আর ঢাকাকে অপরাধের অভয়াশ্রম ভাবার দুঃসাহস না পায়। ঢাকা বাঁচলে তবেই বাঁচবে আমাদের জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা। 
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Advertisement