পাহাড়ে বাঙালিদের নির্ধারিত কর নৃগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যবস্থা
 
  •  কোটা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও বাড়ছে প্রশ্ন
  •  অশান্তির নেপথ্যে শান্তিচুক্তির সুফলভোগীরা
 
 
পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা এবং দায়-দায়িত্বের বণ্টন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাঙালি বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের একাংশ বলছেন, একই রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও দুই জনগোষ্ঠী দুই রকম ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। এই বৈষম্য দূর করে সমঅধিকার নিশ্চিত করা এখন জরুরি। তাদের দাবির কেন্দ্রে রয়েছে রাজস্বব্যবস্থা, চাকরি ও শিক্ষায় কোটা, প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শান্তিচুক্তি হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফেরেনি। বরং বেড়েছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। গোলাগুলি, খুন-জখম পার্বত্য চট্টগ্রামের নিত্যদিনের ঘটনা। ফলে ঘুরেফিরে প্রশ্ন উঠছে শান্তিচুক্তির সুফল নিয়ে। 
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শান্তিচুক্তির সুবিধাভোগী মুষ্টিমেয় কিছু উপজাতীয় বা পাহাড়ি নেতা। এর মধ্যে তিন জেলার (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান) সার্কেল চিফ বা রাজা, চাকমা সম্প্রদায়সহ শহরকেন্দ্রিক কিছু পাহাড়ি বাসিন্দা বিভিন্নভাবে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছেন। কিন্তু একেবারে দুর্গম এলাকায় যেসব সাধারণ নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে বা জনসংখ্যা ও শিক্ষার হারে যারা আগে থেকেই পিছিয়ে তাদের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং তারা আরো বেশি বিড়ম্বনায় পড়েছেন। একইভাবে এই শান্তিচুক্তির এমন কিছু ধারার কারণে একই স্থানে বসবাস করেও পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠী যেসব সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন, সেখানে বাঙালিরা তেমন কিছুই পাচ্ছেন না। এ জন্য সবাইকে নাগরিক হিসেবে সমানভাবে দেখার সময় এসেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্র বলছে, শান্তিচুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বাস্তবায়িত হয়েছে ৬৫টি। এ ছাড়া ৩টি আংশিক বাস্তবায়িত ও ৪টি বাস্তবায়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পক্ষান্তরে চুক্তিতে সই করা সন্তু লারমার সংগঠন জেএসএস বা পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে গড়ে উঠা ইউপিডিএফ, কেএনএফসহ আঞ্চলিক সংগঠনগুলো প্রধান শর্ত অনুযায়ী তাদের কাছে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রগুলোই জমা দেয়নি। বরং ধীরে ধীরে আরো মজুদ বাড়িয়ে চলেছে। ফলে শান্তিচুক্তির কার্যকারিতা বা যৌক্তিকতা নিয়েও এখন অনেকে প্রশ্ন তুলছেন। এর সাথে বিভিন্ন কূট-কৌশলে ঘুরেফিরে সামনে আনা হচ্ছে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ‘আদিবাসী’ শব্দ বিতর্ক। 
গত শুক্রবার বিকেলে কথা হয় রাঙামাটির নানিয়াচর উপজেলার মিনি সাজেক নামে পরিচিত রাবার বাগান এলাকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কিছু বাসিন্দার সাথে। তারা রাস্তার পাশে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী পিঠাসহ বিভিন্ন ফলের পসরা নিয়ে বসেছিলেন। আলাপকালে তাদের কয়েকজন বলেন, ‘পাহাড়ে যখনই আঞ্চলিক সংগঠনগুলো গোলাগুলি, অপহরণ বা সন্ত্রাসমূলক তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়, তখন আর পর্যটকরা ভয়ে আর এসব এলাকায় আসেন না। ফলে আমাদের ব্যবসা বা জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা শান্তিচুক্তি বুঝি না, শান্তি চাই।’ 
একই দিন খাগড়াছড়ির ৯ মাইল এলাকায় কথা হয় সাজেকের ‘হেডম্যান’ রবিন্দ্র ত্রিপুরার সাথে। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না ইউপিডিএফ ও জেএসএসের কারণে। তারাই মূলত সমস্যা তৈরি করে রেখেছে। সাজেকের অবরোধ কারা করছে, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইউপিডিএফ ও জেএসএসের আধিপত্যের কারণে পর্যটকরা সেখানে যেতে পারছেন না। তিনি বলেন, এই সমস্যা দূর হবে না যতক্ষণ না সমস্যার সমাধান হবে।  
করের বিষয়ে ক্ষোভ : সবচেয়ে বেশি আলোচিত অভিযোগ রাজস্ব নিয়ে। স্থানীয় বাঙালিদের একাংশের দাবি, তারা নিয়মিত সরকারকে কর ও খাজনা দেন। অন্য দিকে পাহাড়িরা সরকারকে একই হারে কর দেন না। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী পাহাড়িরা প্রথাগত ব্যবস্থায় সার্কেল চিফ বা রাজাকে সামান্য পরিমাণ কর দেন। তাদের প্রশ্ন, রাষ্ট্রের সেবা ও উন্নয়ন বরাদ্দ সবাই পাবেন, অথচ রাজস্বের দায় একই হবে না কেন।
পার্বত্যাঞ্চলে রাঙামাটির চাকমা, বান্দরবানের বোমাং ও খাগড়াছড়ির মং-এই তিন সার্কেল চিফের প্রথাগত প্রশাসনিক কাঠামো এখনো কার্যকর। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি এবং ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির পর গঠিত পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ ব্যবস্থার মধ্যেই এই কাঠামো টিকে আছে। সমালোচকদের মতে, এর ফলে ভূমি রাজস্ব ও স্থানীয় কর আদায়ে সমতল ও পাহাড়ের মধ্যে কার্যত দুই রকম চিত্র তৈরি হয়েছে।
কোটা ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব : সরকারি চাকরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য আলাদা কোটা রয়েছে। এই কোটার সুবিধা সমতলের সাধারণ নাগরিকের সাথে প্রতিযোগিতার সমীকরণ বদলে দেয় বলে তারা মনে করেন। পার্বত্য মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে মূলত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের হাতে থাকছে। এতে বাঙালি জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভূমি বন্দোবস্ত, কেনাবেচা ও হস্তান্তরে বিধিনিষেধের কারণে বাঙালি বাসিন্দারা দলিলহীন জমিতে বসবাস করছেন। এতে ব্যাংকঋণ, উন্নয়ন সহায়তা ও আইনি সুরক্ষা পেতে তাদের বেগ পেতে হয়। সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বন্দোবস্ত প্রায় ৪ দশক ধরে বন্ধ। পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর মানুষ বংশপরম্পরায় জমি ভোগদখল করলেও অনেকের হাতে লিখিত দলিল নেই। এই অচলাবস্থা নিরসনের দাবি দুই পক্ষ থেকেই উঠেছে।
সমঅধিকার প্রশ্নে পাল্টা যুক্তি : বিষয়টির অপর পক্ষও আছে এবং তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার সংগঠন ও নেতারা মনে করেন, বিশেষ ব্যবস্থাগুলো ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও শান্তিচুক্তির ফল। তাদের বক্তব্য, কাপ্তাই বাঁধের কারণে হাজার হাজার পরিবারের উচ্ছেদ, ভূমি হারানো এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার প্রয়োজন থেকেই এসব সুরক্ষা প্রবর্তিত হয়েছে। পাহাড়ি সংগঠনগুলোর অভিযোগ, শান্তিচুক্তির মূল ধারা, বিশেষ করে ভূমি কমিশনের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বান্দরবানসহ বিভিন্ন এলাকায় জুম্ম পরিবারের উচ্ছেদ ও ভূমি দখলের অভিযোগও তারা তুলে ধরেন। তাদের প্রশ্ন, বৈষম্য দূরের কথা বললে আগে চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন কেন নয়।
কেন আংশিক বাস্তবায়িত : পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে ভূমি কমিশন গঠিত হয়েছে। তবে কমিশন কর্তৃক পার্বত্যাঞ্চলে ভূমি জরিপের উদ্যোগ নেয়া হলেও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বাধার কারণে সম্পন্ন করা যায়নি। ১৯৮৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ভূমি জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। এ সময় সশস্ত্র গোষ্ঠীরা রাঙ্গামাটির কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া থেকে দু’জন কর্মচারীকে অপহরণ করে যার ফলে ভূমি জরিপের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এরপর ১৯৯২ সালে আবার ভূমি জরিপ কাজ শুরু করা হলে সশস্ত্র গোষ্ঠী কর্তৃক একজন কানুনগোসহ মোট তিনজন সরকারি কর্মচারীকে অপহরণ করা হয়। এরপর ভূমি জরিপের কাজ স্থগিত হয়ে যায়। 
এরপর ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম কর্তৃক ভূমি জরিপের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও জেএসএসের সভাপতি সন্তু লারমাসহ অন্যান্য উপজাতি নেতাদের তীব্র বিরোধিতার মুখে তিনি এই উদ্যোগ থেকে সরে আসেন। 
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পার্বত্য অঞ্চল সারা দেশের এক দশমাংশ হলেও পার্বত্য জেলাগুলোতে  সারা দেশের তুলনায় ৮০ শতাংশ এনজিও প্রজেক্ট চলমান রয়েছে। তারপরও পার্বত্য অঞ্চলে দৃশ্যমান উন্নয়ন নেই। অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু এনজিও তাদের প্রজেক্টের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আঞ্চলিক দলগুলোর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। এনজিওগুলোর সামাজিক সচেতনতামূলক সেশনে অনেক সময় এমনভাবে তথ্য উপস্থাপন করা হয় যা বাঙালিদের ‘বহিরাগত’, ‘সেটলার’ বা ‘দখলদার’ হিসেবে চিত্রিত করে। এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙালিদের বিষয়ে বিরূপ মনোভাব তৈরি করে এবং জাতিগত দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে পার্বত্য অঞ্চলের এনজিওগুলোর মধ্যে সন্দেহজনক এনজিও কার্যক্রম নজরদারিতে এনে সব দেশ বিরোধী বিদেশীদের দালাল ঘরনার এনজিও কার্যক্রম বাতিল করতে হবে।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফজলে এলাহী আকবর বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় এই বিতর্ককে সম্প্রীতি ও আইনের শাসনের পরিপ্রেক্ষিতেই এগিয়ে নিতে হবে। বৈষম্যের ধারণা কোনো পক্ষের মধ্যেই দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকলে তা অবিশ্বাস ও সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করে। এ কারণে পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ আলোচনা এবং তথ্যভিত্তিক নীতি গ্রহণ জরুরি বলে তারা মনে করেন।
সমঅধিকারের দাবি তাই এখন একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরীক্ষা। রাষ্ট্র পাহাড়ের সব নাগরিকের জন্য একই নীতির কাঠামো দাঁড় করাতে পারে কি না এবং একই সাথে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক সুরক্ষা অক্ষুণœ রাখতে পারে কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।