
- গ্যাসসঙ্কট, ভর্তুকির বোঝা আর ডলারের চাপ
- ৫ বছরে তিনটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলেও ১০টি প্রকল্প স্থবির
- বিদ্যুৎকেন্দ্র বেড়েছে, কিন্তু জ্বালানিসঙ্কটে উৎপাদন ব্যাহত
- টার্মিনাল নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা, তৃতীয়ের অপেক্ষা ফুরোয়নি
- ৫ বছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি বেড়েছে প্রায় ৫ গুণ
আমদানিনির্ভর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। অন্য দিকে, আমদানি বাড়লেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা কাটছে না। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানির অভাবে সেগুলোর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
গত পাঁচ বছরে তিনটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ১০টি প্রকল্প বাতিল, প্রত্যাহার কিংবা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়াই আটকে রয়েছে। এসব স্থগিত প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় আট হাজার মেগাওয়াট। অন্য দিকে, ২০১৮-১৯ সালে দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালুর পর তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগও দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস সরবরাহের বাস্তবতা ভিন্ন। ২০২৬ সালের জুনের শেষ দিকে দু’টি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর সুযোগ থাকলেও পেট্রোবাংলা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদার মাত্র ৩৯ শতাংশ পূরণ করতে পেরেছে।
জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগের এই সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বাড়ছে আর্থিক চাপ। ২০১৯ সালে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি ছিল আট হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে ভর্তুকি বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। গ্যাস সরবরাহের প্রকৃত ব্যয় ও বিদ্যুতের বিক্রয়মূল্যের ব্যবধানও ক্রমেই বাড়ছে। ডলারের সঙ্কট, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্য এবং বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) নভেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত ‘এলএনজি-টু-পাওয়ার ইন এমার্জিং এশিয়া: ফাইভ ইয়ার্স অব প্রজেক্ট আউটকামস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের এই দুর্বল চিত্র উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির গবেষক স্যাম রেনল্ডস ও ক্রিস্টোফার ডলম্যান যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করেছেন।
আমদানি বাড়ছে, প্রকল্প আটকে আছে
আইইইএফএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি ছিল ৪৪ লাখ ৩০ হাজার টন। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ লাখ ৩০ হাজার টনে। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। অথচ একই সময়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়েনি; বরং ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছর গড়ে ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ হারে কমেছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের অংশ নেমে এসেছে ৪৪ দশমিক ১ শতাংশে। অথচ একসময় বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি ছিল দেশীয় গ্যাস। ২০২১ সালের পর বাংলাদেশে মোট এক হাজার ৯০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার তিনটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। এসব প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ আনুমানিক ১৮০ কোটি ডলার। বিপরীতে, ১০টি প্রকল্প বাতিল, প্রত্যাহার কিংবা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়াই পড়ে রয়েছে। এসব প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা আট হাজার মেগাওয়াট এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৭৭০ কোটি ডলার।
২০২২ সালে পায়রা বন্দরে তিন হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি থেকেও সরকার সরে আসে। অর্থাৎ পরিকল্পিত সক্ষমতা ও বাস্তবায়িত সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় টার্মিনাল অবকাঠামো নির্মাণেও একই ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। ২০১৮-১৯ সালে দু’টি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) চালুর পর তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ আর বাস্তব রূপ পায়নি।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার সামিট ও এক্সিলারেটরের সাথে দু’টি এফএসআরইউ নির্মাণের চুক্তি বাতিল করে। একই সময়ে দৈনিক ৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন সক্ষমতার একটি টার্মিনালের দরপত্রও বাতিল করা হয়। আইইইএফএর হিসাবে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ছয়টি টার্মিনাল প্রকল্প বাতিল অথবা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা ৩৮ এমটিপিএর বেশি।
৭ বছরের দীর্ঘসূত্রতা
এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশের জ্বালানি পরিকল্পনার আরেকটি বড় দুর্বলতা। চালু হওয়া তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রেও প্রাক্-নির্মাণ কার্যক্রম শুরু থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে গড়ে সাড়ে সাত বছর সময় লেগেছে।
এর একটি উদাহরণ রিলায়ান্স মেঘনাঘাটের ৭১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০১৬ সালে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় এবং ২০১৯ সালে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালেও প্রকল্পটির কাজ ৭০ শতাংশের কম সম্পন্ন হয়েছিল। ২০২৪ সালের মার্চে নির্মাণকাজ শেষ হলেও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পুনর্নির্ধারণ এবং গ্যাসসঙ্কটের কারণে কেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারেনি। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি চালুর দুই সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস সঙ্কটে কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্তও জ্বালানি ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ থেকে স্পষ্ট, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ, পাইপলাইন, আমদানি অবকাঠামো এবং অর্থায়নের নিশ্চয়তা না থাকলে নতুন কেন্দ্রও কার্যত অকার্যকর সম্পদে পরিণত হতে পারে।
ভর্তুকির পাহাড়, বাড়ছে আর্থিক চাপ
গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য ঐতিহাসিকভাবে সরবরাহ ব্যয়ের তুলনায় কম রাখার কারণে পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ওপর ভর্তুকির চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ খাতের জন্য পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহ ব্যয় নির্ধারিত দামের তুলনায় ৫০ শতাংশের বেশি ছিল। অথচ গত পাঁচ বছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের দাম বেড়েছে ২৪৮ শতাংশ।
অন্য দিকে, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিপিডিবির গড় বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় ইউনিটপ্রতি ছয় টাকা থেকে বেড়ে ১২ টাকা ১০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গড় বিক্রয়মূল্য পাঁচ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে সাত টাকা ১০ পয়সা। ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রিতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ টাকা।
এই ব্যবধানের প্রতিফলন পড়েছে সরকারের ভর্তুকিতে। ২০১৯ সালে বিপিডিবির বার্ষিক ভর্তুকি ছিল আট হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ ছয় বছরে ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় পাঁচ গুণ হয়েছে।
এদিকে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পেট্রোবাংলার পাওনা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ১৬ হাজার কোটি টাকাই বিপিডিবির কাছে বকেয়া। ফলে জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার আর্থিক শৃঙ্খলও ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ডলার সঙ্কট ও ঋণনির্ভরতা
এলএনজি আমদানির অর্থ জোগাতে বাংলাদেশ ২০২২ সাল থেকে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। আইইইএফএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৫৫০ কোটি ডলারের কর্মসূচি, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) অর্থায়ন এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণসুবিধা জ্বালানি আমদানির অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৭ অর্থবছরে এআইআইবির অর্থায়ন ৬০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক ৩৫ কোটি ডলারের ঋণসুবিধা ২০২৬ সালের মে মাসে দ্বিগুণ করা হয়েছে বলে এতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে ঋণনির্ভর অর্থায়নের পাশাপাশি দেশের ঋণমান ও বৈদেশিক অর্থায়নের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ফিচ ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস নেতিবাচক করে। এর ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ সংগ্রহের ব্যয় বাড়তে পারে এবং নতুন অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামও বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২৭ দশমিক ৫ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় আরো বেড়েছে।
সক্ষমতা বাড়লেও গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি
আইইইএফএর প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও গ্যাস সরবরাহের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান।
২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩৪ শতাংশ বাড়লেও গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ। বরং ২০২০ সালের পর গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যবহার সক্ষমতার হার ২০২০ সালের ৫৩ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৪৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর তিন সপ্তাহ ধরে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গড় ব্যবহার সক্ষমতা ছিল মাত্র ৩১ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনের শেষ দিকে দু’টি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর সুযোগ থাকলেও পেট্রোবাংলা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চাহিদার মাত্র ৩৯ শতাংশ পূরণ করতে পেরেছে।
এর ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সেগুলো পুরোপুরি চালানো যাচ্ছে না। ৫৮৪ মেগাওয়াটের ইউনিক মেঘনাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্রও গ্যাস রেশনিংয়ের কারণে কয়েক সপ্তাহ শূন্য উৎপাদনে ছিল।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা না থাকায় সেই বিনিয়োগের কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
তৃতীয় টার্মিনাল কবে?
জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় সরকার নতুন করে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কুতুবদিয়ায় দৈনিক ৪ দশমিক ৫ এমটিপিএ সক্ষমতার টার্মিনাল নির্মাণে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনকে কাজ দেয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটি কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি।
এ ছাড়া মাতারবাড়ীতে দৈনিক ৭ দশমিক ৫ এমটিপিএ সক্ষমতার একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এ প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। আইইইএফএ সতর্ক করে বলেছে, শুধু টার্মিনাল নির্মাণ করলেই গ্যাসের প্রাপ্যতা বাড়বে না। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা, কার্যকরী মূলধন, সময়মতো অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা এবং নির্ভরযোগ্য পাইপলাইন অবকাঠামো। অতীতে বাংলাদেশ এসব অবকাঠামো যথাসময়ে সম্পন্ন করতে পারেনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেট্রোবাংলা ২০৩০ অর্থবছর পর্যন্ত দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে না। এ সময় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনফুটে স্থিতিশীল থাকবে বলে ধারণা করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এলএনজি অবকাঠামোয় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধরে রাখাও কঠিন হতে পারে।
বিকল্প জ্বালানির দিকে নজর
তবে চলমান সঙ্কট বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিকল্প উৎস সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের বেসরকারি সম্প্রসারণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে এলএনজি আমদানির চাপ কমানো সম্ভব।
এপ্রিল ২০২৬-এ দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে বৈচিত্র্য আনতে পারে। একই সাথে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমবে।
বিদ্যুতের মূল্য ও উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবধানও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। তবে ভর্তুকি কমানোর নামে একতরফাভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে সাধারণ ভোক্তা ও শিল্প খাতের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। তাই ভর্তুকি সংস্কারের ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি, অপচয় রোধ, সাশ্রয়ী উৎপাদন এবং নি¤œ আয়ের গ্রাহকদের সুরক্ষার বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের আগে জ্বালানি খাতের অর্থায়নের টেকসই কাঠামো নিশ্চিত করা। একই সাথে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
আইইইএফএর এশিয়াবিষয়ক এলএনজি ও গ্যাস গবেষণাপ্রধান স্যাম রেনল্ডসের মতে, জ্বালানি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরঞ্জাম এবং মুদ্রাবাজারের সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতায় এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের ঝুঁকি বেড়েছে। একই সাথে এসব প্রকল্পে বিনিয়োগের অর্থায়ন নিশ্চিত করার মতো রাজস্ব আয়ের নিশ্চয়তাও কমেছে। এ কারণে এশিয়ায় এলএনজির সম্প্রসারণ বৈশ্বিক গ্যাসশিল্পের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এই সতর্কবার্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরও যদি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও টার্মিনাল নির্মাণের বিনিয়োগও শেষ পর্যন্ত অব্যবহৃত সম্পদে পরিণত হতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তার নামে আরো ঋণ ও ভর্তুকির বোঝা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলার পরিবর্তে এখন প্রয়োজন সমন্বিত, বাস্তবসম্মত ও আর্থিকভাবে টেকসই জ্বালানি পরিকল্পনা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








