
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাতসহ নানা বিতর্ক সামলে দলকে সুসংগঠিত রাখতে হিমশিম খাচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। এ ছাড়া কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কটে ভুগছে দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি। বিশ্লেষকরা বলছেন, কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের বড় অংশ এখন রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যস্ত। ফলে দল গোছানোর পাশাপাশি দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এখন বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সূত্র মতে, প্রায় দেড় যুগ পর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার আট মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো নিজের দল গোছাতে হিমশিম খাচ্ছে বিএনপি। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করতে পারেনি তারা। এমনকি দলের কয়েকটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কাউন্সিলও সম্পন্ন হয়নি। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বেশির ভাগ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এর ঠিক আগে তৃণমূলে আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নানা বিতর্ক সামলে দলকে সুসংগঠিত রাখাই এখন বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সঙ্কট ও নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে দেশ এমনিতেই চাপে রয়েছে। এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দল শক্তিশালী করার দিকে বিএনপির সর্বোচ্চ মনোযোগ দেয়া উচিত ছিল। তারা বলছেন, জনসম্পৃক্ত বেশ কিছু ইস্যুতে বিরোধীরা সরকারকে চ্যালেঞ্জ করছে। কিন্তু দল হিসেবে বিএনপিকে রাজনীতিকভাবে মোকাবেলা করতে মাঠে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বিএনপির নীতিনির্ধারকদের বড় অংশ এখন সরকার পরিচালনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ায় তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মেতে উঠেছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে চাঁদাবাজি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মতো নানা অভিযোগ। এ ছাড়া অনেকেই অর্থের বিনিময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাথে একাকার হয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন। কেন্দ্র থেকে কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও সেটি তেমন দৃশ্যমান হচ্ছে না। বরং দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য প্রচেষ্টাকে আরো দুর্বল করছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে বিএনপি বড় সমস্যায় পড়তে পারে। তিনি বলেন, দল ও সরকারের মধ্যে যখন অতিরিক্ত মেলবন্ধন তৈরি হয়, তখন সরকারের সুযোগ-সুবিধা (জনগণের অর্থ, চাকরি ও বিভিন্ন সেবা) নাগরিকদের বদলে দলীয় নেতাকর্মীদের পকেটে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তিনি বলেন, বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত এক ধরনের অস্বস্তি বিরাজ করছে। কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেও সেটি তেমন দৃশ্যমান নয়। সরকারি দলকে আরো কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে।
একাধিক নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে, নানা সমস্যার মুখোমুখি তৃণমূল বিএনপিকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। দলের কিছু নেতাকর্মী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে এর প্রভাব সরকারের ওপর এসে পড়বে। এতে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে।
জানা গেছে, সম্প্রতি রাজধানীতে সক্রিয় ৫৪৫ সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের একটি তালিকা তৈরি করেছে সরকার। এই তালিকা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি) নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই ক্ষমতাসীন দলের সাথে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এটি দ্বিতীয়বারের মতো এ ধরনের তালিকা তৈরির ঘটনা। এর আগে মার্চ ও এপ্রিল মাসে তৈরি করা পুলিশের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে সারা দেশে এক হাজার ২০০ জন চাঁদাবাজিতে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি রাজনৈতিক দলে যুক্ত ১৯৭ জনের ১৮১ জনই বিএনপির সাথে সম্পৃক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ আরো ৩২৯ জনকে অভিযুক্ত চাঁদাবাজদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দলে যুক্ত ২৭১ জনের ২১৪ জন বিএনপির সাথে সংশ্লিষ্ট।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো: ফারুক হোসেন গণমাধ্যমে জানান, আগেরটির ধারাবাহিকতায় অক্টোবর মাসের তালিকা যাচাই-বাছাই এবং মাঠপর্যায় থেকে নতুন তথ্য সংগ্রহের পর তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, তালিকায় অনেকেই রাজনীতির সাথে যুক্ত।
এদিকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিএনপির জন্য বড় সাংগঠনিক পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন অনেকেই। তাদের মতে, ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদে দলের একাধিক নেতা প্রার্থী হতে আগ্রহী। একই পদে একাধিক নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছেন। যদিও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রতিটি পদে একজন করে প্রার্থী দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ প্রতিবেদকের সাথে একাধিক তৃণমূল বিএনপি নেতার সাথে কথা হয়েছে। তারা বলছেন, স্থানীয় পর্যায়ে দলের কার্যক্রম অনেকটাই কেন্দ্রীয় কর্মসূচি এবং জাতীয় ও দলীয় বিভিন্ন দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কেন্দ্র থেকে একক প্রার্থী থাকার কথা বলা হলেও সেটি কেউই মানছেন না। সবাই যার যার মতো প্রচারণা চালাচ্ছেন। নেতাকর্মীদের বড় অংশ সংসদ সদস্য (এমপি) ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের সাথে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের ধারণা, নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় এমপিদের সমর্থন বা আনুকূল্য পাওয়া গেলে নির্দলীয় এই নির্বাচনে দলীয় আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে প্রার্থী হওয়া এবং জয়ী হওয়ার পথ সহজ হবে। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় নির্বাচনে এমপি বা জেলা নেতাকেন্দ্রিক ‘মাইম্যান’ প্রার্থী সামনে এলে ত্যাগী ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় নেতারা বঞ্চিত হতে পারেন। তাদের অনেকেই প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে দলের ভেতরে সঙ্ঘাতের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। একইসাথে তারা এটিকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিটি এলাকায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক অবস্থান এবং অতীত আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। একই সাথে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া ঠেকাতেও প্রস্তুতি চলছে। সূত্র জানায়, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ে উপজেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের প্রার্থী বাছাইয়ে জেলা নেতাদের দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কোথাও সমস্যা তৈরি হলে প্রথমে জেলা এবং পরে বিভাগীয় পর্যায়ের নেতারা তা সমাধানের চেষ্টা করবেন।
ফেনী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপি বড় দল। কোথাও কোথাও সমস্যা থাকতেই পারে। তবে দল তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একেকটি ইউনিয়নে ১০ থেকে ১২ জন করে প্রার্থী হতে আগ্রহী। প্রতিটি ইউনিয়নে একক প্রার্থী দেয়া সম্ভব হলেও এ ক্ষেত্রে এমপি-মন্ত্রীদের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে প্রার্থী বাছাইয়ে তাদের যেন কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না থাকে, সেটিই এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তৃণমূলের মতামত ও প্রার্থীদের যোগ্যতা বিবেচনা করে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা সম্ভব হবে।
ঝালকাঠি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সৈয়দ হোসেন অভিযোগ করে এ প্রতিবেদককে বলেন, অসময়ে যারা দলকে আগলে রেখেছেন, তাদের বাদ দিয়ে বর্তমান এমপি অন্যদের নিয়ে কাজ করছেন। তার দাবি, স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, কেন্দ্র ও তৃণমূলে সম্পর্ক ক্রমশ অবনতি ঘটছে।
সম্প্রতি মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক শক্তি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে বেশ কিছু নেতিবাচক চিত্রও সামনে এসেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উপদলীয় কোন্দল সংঘর্ষে বেশ কিছু নেতাকর্মী হতাহত হয়েছেন। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, অনেক জায়গায় মাঠপর্যায়ের নেতারা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে দখলদারিত্ব বা স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে, কেন্দ্রের কঠোর নির্দেশনার সাথে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্বাসনের বাস্তব চাহিদার মধ্যে একটি বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে।
এদিকে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় বা আর্থিক সুবিধা দেয়ার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ দলটির শীর্ষ নেতাদের সাথে গোপন যোগাযোগ, অর্থের লেনদেন এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হালনাগাদ তালিকা তৈরির কাজ করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
মাঠপর্যায়ের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, রাজনীতিতে কর্মীরাই একটি দলের প্রাণশক্তি। বিএনপিও মনে করে, তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই দীর্ঘদিন ধরে দলকে সুসংগঠিত রেখেছেন এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শকে ধারণ ও বহন করে চলেছেন। তাই তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছে না। যিনিই অন্যায়ের সাথে যুক্ত হচ্ছেন, তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








