
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। বিপরীতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে ডেমোক্র্যাটরা। শুধু কংগ্রেস নয়, গভর্নর নির্বাচনেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে দলটি।
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই জয়কে ট্রাম্পের প্রতি ভোটারদের স্পষ্ট অনাস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে থেকেই তার জনপ্রিয়তায় ভাটা ছিল। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং অভিবাসননীতি নিয়ে অসন্তোষের প্রভাব পড়েছে ভোটের ফলাফলে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের চারটি আসনে জয় প্রয়োজন ছিল। শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও জয় পেয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। আইওয়া, ওহাইও, সাউথ ক্যারোলিনা, টেক্সাস ও কানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
সিনেটের পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় পাওয়া আসনের চেয়েও এটি বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হতে পারে। অঙ্গরাজ্যগুলোর গভর্নর নির্বাচনেও ভালো ফল করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি।
টেক্সাসে সাত শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা। এ ছাড়া জর্জিয়া, ওহাইও ও আইওয়ায় গভর্নরের পদ রিপাবলিকানদের কাছ থেকে নিজেদের দখলে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
নির্বাচনের আগে সিনেটের আসনগুলোর হিসাব ডেমোক্র্যাটদের জন্য কঠিন বলে মনে করা হচ্ছিল। কারণ, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে দলটিকে এমন কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে জয় পেতে হতো, যেখানে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প বড় ব্যবধানে জিতেছিলেন।
তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় সেই কঠিন সমীকরণও পাল্টে যায়। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং বিদেশে যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; কিন্তু বাস্তবে ইরানের সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। একই সাথে শুরু করেন বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ।
এ দিকে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি ছিল। ডিজেলের দামও রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছায়। ছয় মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল। তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল বাড়ি কেনার ঋণের সুদের হারও। ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব পড়েছে কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে। তার প্রশাসনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় ধরনের ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্তও সমালোচিত হয়েছে। এসব কারণে ভোটারদের মধ্যে রিপাবলিকানদের প্রতি অসন্তোষ তৈরি হয়।
নির্বাচনে হিস্পানিক ভোটারদের সমর্থন হারানো রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সাথে ট্রাম্পের ব্যবধান অনেকটাই কমে এসেছিল। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে রিপাবলিকানরা এবার দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করেছিল; কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই হিসাব মেলেনি।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি- এমন এলাকাগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের ভোট উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। টেক্সাসের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী ওয়েব কাউন্টির উদাহরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
২০২০ সালে কাউন্টিটিতে জো বাইডেন ২৩ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। ২০২৪ সালে ট্রাম্প সেখানে দুই শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন; কিন্তু এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো ৪৭ শতাংশ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে রিপাবলিকানরা যে সুবিধা নিতে চেয়েছিল, হিস্পানিক ভোটারদের সমর্থন ফিরে আসায় সেই পরিকল্পনাও অনেকটা ব্যর্থ হয়েছে।
প্রচারণার শেষ দিকে রিপাবলিকানদের হাতে ভোটারদের সামনে তুলে ধরার মতো ইতিবাচক সাফল্য খুব বেশি ছিল না। তাই অনেক রিপাবলিকান প্রার্থী সমাজতন্ত্র, উদারনৈতিক রাজনীতি ও ইসলাম নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালান। মিশিগানে ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুর রহমান আল-সায়েদকেও ‘জিহাদি’ বলে আক্রমণ করেন ট্রাম্প।
আল-সায়েদ একজন প্রগতিশীল রাজনীতিক। তার নির্বাচনী প্রচারণায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং ইসরাইলে মার্কিন সামরিক সহায়তার বিরোধিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। তবে এসব আক্রমণ রিপাবলিকানদের প্রত্যাশিত নির্বাচনী সুবিধা এনে দিতে পারেনি।
ডেমোক্র্যাটদের এই জয় যুক্তরাষ্ট্রে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করতে যাচ্ছে। তবে কংগ্রেসের দুই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও দলটি প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা অকার্যকর করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ফলে ডেমোক্র্যাটদের সব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আইন হিসেবে বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। অন্য দিকে রিপাবলিকান পার্টির জন্য শুরু হচ্ছে কঠিন সময়। গত এক দশক ধরে দলটির রাজনীতিতে ট্রাম্পের প্রভাব ছিল ব্যাপক। দলের অনেক নেতা তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে রাজনীতি করেছেন; কিন্তু নির্বাচনের এই বিপর্যয়ের পর তাদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের সমালোচনা করলে দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে তার বিরোধিতার মুখে পড়তে পারেন তারা। আবার তাকে সমর্থন দিয়ে গেলে সাধারণ নির্বাচনে ভোটারদের সমর্থন হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে। এ কারণে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলের ঘটনা নয়, রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








