
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল জাপান থেকে
‘মাউন্ট ফুজি আমাদের কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। প্রতিদিন এর সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পাওয়া আমাদের জন্য বিশেষ অনুভূতির। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে পাহাড়টির রূপও বদলে যায়। বিশেষ করে শীতকালে বরফে ঢাকা ফুজি দেখতে অসাধারণ লাগে’। জাপানের ইয়ামানাশিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা স্থানীয় বাসিন্দা লাইসেন্সপ্রাপ্ত পর্যটন গাইড মিদোরি গত শুক্রবার মাউন্ট ফুজির সামনে নয়া দিগন্তের প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে এ কথা বলেন।
জাপানের পরিচিতি, সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের কথা উঠলেই সবার আগে যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সেটি হচ্ছে মাউন্ট ফুজি। দেশটির সর্বোচ্চ এই পর্বত শুধু একটি পাহাড় নয়, বরং জাপানের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বরফে ঢাকা সুউচ্চ চূড়া, চারপাশের সবুজ প্রকৃতি এবং আকাশের সাথে মিশে থাকা বিশাল অবয়ব- সব মিলিয়ে মাউন্ট ফুজি এক অপূর্ব প্রাকৃতিক বিস্ময়।
টোকিও থেকে বেশি দূরে নয়, মাত্র দেড় ঘণ্টায় যাওয়া যায় জাপানের হোনশু দ্বীপের ইয়ামানাশি ও শিজুওকা প্রিফেকচারের সীমান্তে অবস্থিত এই আগ্নেয়গিরি দেখতে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা তিন হাজার ৭৭৬ মিটার। দূর থেকে তাকালে এর প্রায় নিখুঁত শঙ্কু আকৃতি সহজেই দৃষ্টি কেড়ে নেয়। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে অনেক দূর থেকেও দেখা যায় বরফে সাদা হয়ে থাকা এর চূড়া।
সরেজমিন শুক্রবার মাউন্ট ফুজির সৌন্দর্য উপলব্ধি সুযোগ হয় এই প্রতিবেদকের। এর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো প্রকৃতির বিশালতার সামনে মানুষের ক্ষুদ্রতা অনুভব করা। পাহাড়ের চারপাশের নৈসর্গিক পরিবেশ, নীল আকাশ, মেঘের আনাগোনা এবং ঋতুভেদে বদলে যাওয়া প্রকৃতি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। বিশেষ করে শীতকালে বরফের সাদা আবরণে ঢাকা ফুজি যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত ছবি। এই এলাকায় দ্রুত আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়। মাউন্ট ফুজির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় ইতিহাস। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, প্রায় এক লাখ বছর আগে এই আগ্নেয় পর্বতের গঠন শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক অগ্ন্যুৎপাতের মধ্য দিয়ে এটি বর্তমান রূপ লাভ করে। সর্বশেষ বড় অগ্ন্যুৎপাত ঘটে ১৭০৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর, যা ‘হোয়েই অগ্ন্যুৎপাত’ নামে পরিচিত। ওই অগ্ন্যুৎপাতের ছাই তৎকালীন রাজধানী এডো, বর্তমান টোকিও পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর থেকে নতুন কোনো অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়নি। তবে এটি এখনো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি হিসেবে বিবেচিত।
স্থানীয়রা জানান, জাপানিদের কাছে মাউন্ট ফুজি শুধু পর্যটন আকর্ষণ নয়, গভীর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসেরও প্রতীক। বহু শতাব্দী ধরে মানুষ এই পর্বতকে পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। শিন্তো ও বৌদ্ধ ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। একসময় ধর্মীয় সাধনা ও তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে মানুষ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এর চূড়ায় উঠতেন। জাপানের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী কাতসুশিকা হোকুসাইয়ের শিল্পকর্মেও মাউন্ট ফুজি বিশেষ স্থান পেয়েছে।
এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে ইউনেসকো মাউন্ট ফুজিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। শুধু পাহাড়টিই নয়, এর সাথে সম্পর্কিত ২৫টি ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক স্থান এই বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।
মাউন্ট ফুজির আশপাশের পর্যটন এলাকাও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বিশেষ করে ফুজি ফাইভ লেকস বা পাঁচটি হ্রদ অঞ্চল থেকে পাহাড়টির সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। লেক কাওয়াগুচিকো পর্যটকদের কাছে অন্যতম জনপ্রিয়।
এখান থেকে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে হ্রদের পানিতে মাউন্ট ফুজির প্রতিবিম্ব এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তৈরি করে। ছবি তোলা, নৌভ্রমণ, পাহাড়ি পরিবেশ উপভোগ এবং স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা এখানে আসেন।
প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে নির্দিষ্ট সময়ে পর্বতারোহীদের জন্য মাউন্ট ফুজির আরোহণ মৌসুম চালু থাকে। তখন দেশী-বিদেশী অসংখ্য পর্যটক এর চূড়ায় ওঠার অভিজ্ঞতা নিতে আসেন। তবে উচ্চতা, আবহাওয়া ও দুর্গম পথের কারণে এ যাত্রায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সতর্কতা জরুরি।
ঢাকা থেকে আসা রফিক রাফি জানান, মাউন্ট ফুজি জাপানের প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য সম্মিলন। এটি দেখতে পারা সৌভাগ্যের বিষয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও নগরসভ্যতার দেশ জাপানে দাঁড়িয়েও এই পর্বত মানুষকে প্রকৃতির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এর সৌন্দর্য শুধু চোখকে মুগ্ধ করে না, মানুষের মনেও তৈরি করে গভীর অনুভূতি। তাই মাউন্ট ফুজি দেখতে আসা মানে কেবল একটি পাহাড় দেখা নয়, বরং জাপানের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাথে পরিচিত হওয়া।
মাউন্ট ফুজির আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই পর্বত শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উৎস নয়, বরং তাদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও গর্বের অংশ।
মাউন্ট ফুজির পাদদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা স্থানীয় পর্যটন গাইড মোমোয়ো আজিকি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকেরা এখানে আসেন। এতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাত উপকৃত হচ্ছে। তবে পর্যটকদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তারা যেন পরিবেশ পরিষ্কার রাখেন এবং পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতন থাকেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








