যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটগ্রহণ

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ, সিনেটের মধ্যবর্তী নির্বাচনে গতকাল ভোটগ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার  ভোর ৫টায় সবার আগে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ভার্মন্টে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বিবিসি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য ভার্মন্টে স্থানীয় সময় ভোর ৫টায় (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টা) সবার আগে কেন্দ্র খুলে দিয়ে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
এরপর নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি, ভার্জিনিয়া, কানেকটিকাট, কেনটাকি ও মেইনসহ দেশের পূর্ব উপকূলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে ভোর ৬টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। অন্যান্য রাজ্যেও নিজস্ব স্থানীয় সময়সূচি অনুযায়ী ধাপে ধাপে কেন্দ্রগুলো খুলে দেয়া হয়। ডাকযোগে পাঠানো মেইল-ইন ব্যালট ও আগাম ভোটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক নিবন্ধিত ভোটার ইতোমধ্যে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
চলমান এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের প্রতিটিতেই ভোটগ্রহণ চলছে। এর পাশাপাশি উচ্চকক্ষ সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসন এবং দেশের ৩৬টি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনের ফল চূড়ান্ত হবে আজকের এই ভোটাভুটিতে।
আনাদোলু এজেন্সি  জানায়, বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী দুই বছরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনিক নীতি বাস্তবায়নের ক্ষমতা। যে কারণে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান; উভয় দলের জন্য এই নির্বাচন অত্যন্ত সংবেদনশীল পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই কেন্দ্রগুলোতে আনুষ্ঠানিক গণনা প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা ইলেকশন ল্যাব জানিয়েছে, ৩ নভেম্বরের প্রধান ভোটের আগেই এবার রেকর্ড পাঁচ কোটি ৮০ লাখের বেশি আগাম ভোট পড়েছে, যা ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের (চার কোটি ৫৯ লাখ) চেয়ে অনেক বেশি। টেক্সাসে সর্বোচ্চ ৭৭ লাখের বেশি ভোট পড়েছে। দলীয় নিবন্ধনের তথ্য প্রকাশ করা রাজ্যগুলোর মধ্যে ৪৩ শতাংশ ডেমোক্র্যাট, ৩২ শতাংশ রিপাবলিকান এবং ২৫ শতাংশ স্বতন্ত্র ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রায় ২৪ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন নাগরিক ভোট দেয়ার যোগ্য, যা ২০২২ সালের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি। মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ৬১ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ, ১৬ শতাংশ হিস্পানিক, ১২ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ এবং ৫ শতাংশ এশীয় আমেরিকান।
নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটি এবং ১০০ আসনবিশিষ্ট সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে। এ ছাড়া ৩৬টি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর এবং ৪৬টি অঙ্গরাজ্যের ছয় হাজার ১৩৯টি বিধানসভা আসনে ভোট গ্রহণ চলছে। পাশাপাশি ৩৯টি অঙ্গরাজ্যে কর ও সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত ১৪৬টি ব্যালট পরিমাপের বিষয়েও রায় দেবেন ভোটাররা। নির্বাচনে বিজয়ী নতুন সদস্যরা ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি ১২০তম কংগ্রেসে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এই নির্বাচন পরবর্তী দুই বছরের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষমতা ও নীতির ভারসাম্য নির্ধারণ করবে।
যেভাবে পাল্টাতে পারে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি
আপাত দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়ত দেশটির কেবলই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ বা ক্ষমতার লড়াই। কিন্তু এর বাইরেও এ নির্বাচনের প্রভাব যে আরো সুদূরপ্রসারী, তা স্বীকার করছেন সব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে এ নির্বাচন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং দেশের অর্থনীতির মধ্যকার গভীর যোগসূত্রকেও যে জোরালভাবে সামনে এনেছে তা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ভাষ্যে স্পষ্ট।
প্রশ্ন উঠেছে, সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের ব্যয়, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নানা বিতর্কিত মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সম্পর্কে যে ক্ষতি হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচন সেসব ঠিকঠাক করতে কতটুকু ভূমিকা পালন করবে। সাধারণত প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদকালের ঠিক মাঝপথে অর্থাৎ দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রেসিডেন্ট পদে থাকা না থাকা নির্ধারিত না হলেও, মার্কিন পার্লামেন্ট বা কংগ্রেসের (প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট) নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে, তা নির্ধারিত হয়। ফলে মধ্যবর্তী এ নির্বাচনকে বর্তমান প্রশাসনের ক্ষমতার ওপর এক ধরনের গণভোট বা মূল্যায়নও বলা চলে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স গত ২৫ অক্টোবর এক খবরে বলেছে, চিরাচরিতভাবে এবারো মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ‘হাতি’ ও বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের ‘গাধা’ প্রতিকের মধ্যে লড়াই হবে। এতে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট যারাই জিতুক, তা ভবিষ্যতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে সুনির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।
নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের বরাতে বলা হয়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে এবার ডেমোক্র্যাটদের মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটেও জয়ী হওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। আর তেমনটি হলে গত দুই বছর ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানরা পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে যে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা একটু হলেও আলগা হয়ে ডেমোক্র্যাটদের কাছে ক্ষমতার কিছুটা অংশ এনে দেবে।
রয়টার্সের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ভবিষ্যতে বেশ কিছু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে। যেমন- ইসরাইলকে সাথে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করার আগে কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি ট্রাম্প; যা স্বাভাবিকভাবেই সিনেটর থেকে শুরু করে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদেরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। ট্রাম্প যেন অবিলম্বে লড়াই বন্ধ করেন সেজন্য ডেমোক্র্যাটরা বারবার ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি প্রস্তাব কয়েকজন রিপাবলিকানের সমর্থনে পাস হলেও ট্রাম্প প্রশাসন তা উপেক্ষা করে। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ভালো করলে চলমান ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভবিষ্যতে বড় সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে ধারণা সবার। আর এ নির্বাচনকে তাই তেহরানও খুব গভীরভাবে পযর্বেক্ষণ করবে। বলা হচ্ছে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হাতে পেলে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিরক্ষা ব্যয় কমাতে পারেন; যাতে ট্রাম্প যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কংগ্রেসের অনুমতি নিতে বাধ্য হন। তারা প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রকাশ্যে সাক্ষ্য দিতেও বাধ্য করতে পারেন।
ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তা
রাশিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করতে ইউক্রেনের প্রতি ব্যপক সমর্থন ব্যক্ত করেছেন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা। অথচ ব্যাপক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প ইউক্রেনে সরাসরি মার্কিন আর্থিক ও সামরিক সহায়তা স্থগিত রেখেছেন। সম্প্রতি ট্রাম্প আইনে স্বাক্ষর করার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই রাশিয়ার ডিজেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে এবং রাশিয়ান জ্বালানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা মওকুফ করেছেন; যা ক্ষুব্ধ করে তুলেছে কংগ্রেসের সদস্যদের; যাদের মধ্যে আবার অনেকেই তার দলেরও।
রয়টার্স বলছে, নভেম্বরে উভয় কক্ষে জয় লাভ করলে ডেমোক্র্যাটরা সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ পাবেন কখন কোন বিষয়ে ভোট হবে। এটি তাদের ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তা অনুমোদনের সুযোগ দিতে পারে। আর তেমনটি হলে, সম্ভবত কোনো সিদ্ধান্তে ট্রাম্পের ভেটো দেয়ার ক্ষমতা বাতিলের বিষয়টি প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পাস হয়ে যাবে। এ ছাড়া ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের অন্যান্য কর্মকাণ্ডকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারেন।
ইসরাইলে সামরিক সহায়তা বন্ধ
গাজা যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন ব্যাপকভাবে কমেছে। ইসরাইলের দখলকৃত পশ্চিম তীরে চলমান সহিংসতা এবং রিপাবলিকানদের সাথে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ জোটও এর কারণ ছিল। উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ইসরাইলে সামরিক সহায়তা সীমিত বা বন্ধ করতে পারে। চলমান অর্থবছরে ইসরাইলে মার্কিন সহায়তা ছিল ৩.৮ বিলিয়ন ডলার। এটি অন্য যে কোনো দেশকে দেয়া সহায়তার চেয়ে বেশি।
সামরিক ব্যয় সীমিত করা এবং বৈদেশিক সহায়তা পুনর্বহাল
ডেমোক্র্যাটরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সামরিক ব্যয় সীমিত করার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ট্রাম্প এই বছর সামরিক বাজেট রেকর্ড ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার করার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসের সাথে পরামর্শ না করা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে তার ব্যাপক কাটছাটের অজুহাত দেখিয়ে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে তা আটকে দেন।
ট্রাম্প কংগ্রেস কর্তৃক অনুমোদিত কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক সহায়তা আটকে রেখেছেন বা বাতিল করেছেন। অনেক ডেমোক্র্যাটই এই ছাঁটাইয়ে ক্ষুব্ধ। স্বাভাবিকভাবেই তারা এই তহবিল পুনরায় চালু করার চেষ্টা করবেন। এর ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটবে, যদি কংগ্রেস ও সিনেটে রিপাবলিকানরা আবারো সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখে। তেমনটি হলে কি কি ঘটতে পারে সে সম্পর্কে সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন রিপাবলিকানরা পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে শক্তিশালী হলে ধারণা করা হচ্ছে, প্রথমেই ট্রাম্প সামরিক বাজেট বৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষা শক্তি জোরদারে প্রতিরক্ষা বাজেট সর্বোচ্চ বৃদ্ধি করতে পারেন। কারণ রিপাবলিকানরা ঐতিহ্যগতভাবেই প্রতিরক্ষায় বেশি বরাদ্দের পক্ষে। এ ছাড়া ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে কঠোর অবস্থান ধরে রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। আর এর জন্য ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ, নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর অবস্থানের পক্ষে কংগ্রেসে আইন অনুমোদন পাবে তারা।

Advertisement