রাজনৈতিক ঐক্য ভাঙছে না, দাবি দুই দলেরই

 হারুন ইসলাম 

Advertisement

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে যে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী দেয়া এবং নির্বাচনী সমঝোতা নিয়ে দল দু’টির মধ্যে মতবিরোধের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এনসিপি ঢাকার দুই সিটিতে নিজেদের প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। অন্য দিকে জামায়াতও গুরুত্বপূর্ণ এই দুই সিটিতে ছাড় দিতে রাজি নয়। ফলে দুই দলের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে।
গত কয়েক দিনে  দুই দলের নেতাদের বক্তব্য, পৃথক রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং জোটের কর্মসূচিতে শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে দুই দলের নেতারাই বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি থাকলেও জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক ঐক্য ভেঙে যাচ্ছে না।
এনসিপি সূত্র জানিয়েছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী দেয়া নিয়ে দুই দলের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা হয়েছিল। এনসিপির প্রত্যাশা ছিল, জামায়াত ঢাকার দুই সিটিতে তাদের প্রার্থীদের সমর্থন দেবে। তবে জামায়াত ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লা সিটিতে সমঝোতার বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও ঢাকার দুই সিটিতে ছাড় দিতে চায়নি। এ নিয়ে দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়।
এনসিপি ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দলের মুখপাত্র নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে সামনে এনেছে। অন্যদিকে জামায়াত ঢাকা দক্ষিণে ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েম এবং ঢাকা উত্তরে দলটির মহানগর পর্যায়ের নেতা সেলিম উদ্দিনকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুত করছে। ফলে রাজধানীর দুই সিটিতেই দুই দলের প্রার্থীরা মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। 
এনসিপি নেতারা এর আগে বলেছিলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন তাদের জন্য সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থন যাচাইয়ের বড় সুযোগ। বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচনে অংশ নিয়ে রাজধানীতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে চায় দলটি। একই সাথে ভবিষ্যতের জাতীয় নির্বাচনের জন্য ওয়ার্ড পর্যায়ে সংগঠন, ভোটার ও কর্মী-সমর্থকদের সাথে যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা শুরু থেকেই এককভাবে অংশ নেয়ার কথা বলে আসছেন। ঢাকায় দলের গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয়াই তাদের সিদ্ধান্ত। তবে জামায়াতের সাথে দূরত্ব তৈরির বিষয়টি তিনি নাকচ করেন।  নির্বাচনকে তারা সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করার সুযোগ হিসেবে দেখতে চান। 
একই অবস্থানের কথা জানিয়েছেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সাথে এনসিপির জোট হয়েছিল। বর্তমানে সংসদেও বিরোধীদলীয় জোট হিসেবে তারা একসাথে কাজ করছে। সেই জোট চলমান থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দুই দল আলাদাভাবে লড়াই করবে।
ঢাকার দুই সিটির প্রার্থীদের বিষয়ে সারজিস বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আসিফ মাহমুদকে মেয়র প্রার্থী করা হয়েছে। তারা কোনো সমঝোতা বা ছাড় দেয়ার জন্য নয়, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে লড়বেন।
এদিকে, গত শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে চার দফা দাবিতে গণবিক্ষোভ সমাবেশ করে এনসিপি। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেনসহ শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে নিজেদের উদ্যোগে বড় কর্মসূচি আয়োজনকে দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর পরদিন শনিবার জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চেও এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি আলোচনায় আসে। লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন ছিলেন না। তবে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সারজিস আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এবং সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদসহ কয়েকজন নেতা কর্মসূচিতে অংশ নেন।
এনসিপির নেতারা বলছেন, জোটের কর্মসূচিতে তাদের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। দলের যুগ্ম সদস্যসচিব সারোয়ার তুষারও জামায়াতের সাথে দূরত্ব তৈরির খবরকে নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তকে জোট থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অন্যদিকে জামায়াতও এনসিপির সাথে রাজনৈতিক ঐক্য বজায় রাখার কথা বলছে। 
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আলাদা প্রস্তুতি থাকলেও রাজনৈতিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে দলগুলো একসাথে থাকবে।
দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ এখনো ঘোষণা হয়নি। তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জোটের মধ্যেও নিজ নিজ দল থেকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে একসাথে থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে দলগুলোর নিজস্ব সাংগঠনিক ও নির্বাচনী স্বার্থ সামনে চলে আসে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনে প্রার্থী দেয়া নিয়ে দুই দলের অবস্থান আলাদা হওয়ায় সমঝোতা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা বাড়ছে। আপাতত দুই দলই আলাদাভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের জোট ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচিতে এই বিরোধ কতটা প্রভাব ফেলে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনা ও নির্বাচনী সমঝোতার ওপর।