কমলাপুর-টঙ্গী হত্যাকাণ্ডে জিয়াউলের সম্পৃক্ততার সত্যতা পাওয়া গেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

কমলাপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রেললাইনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সাথে মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততার সত্যতা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলাম। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় এবং ঘটনার সুনির্দিষ্ট তারিখ ও স্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আসামিপক্ষের আইনজীবী সাহিদুর রহমানের জেরায় এ তথ্য জানান তদন্ত কর্মকর্তা। ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর  একক বেঞ্চে এ জেরা অনুষ্ঠিত হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে কারাগার থেকে ভার্চ্যুয়ালি হাজির হন আসামি জিয়াউল আহসান।
জেরার একপর্যায়ে ‘দুর্নীতি : ইতিহাসের ভয়ঙ্কর অধ্যায়’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল দি সিটিজেনস ভয়েজ নামের একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, তিনি প্রতিবেদনটি তদন্ত করেছেন। এর সত্যতাও পেয়েছেন। আইনজীবী সাহিদুর রহমান জানতে চান, ওই প্রতিবেদন থেকে কী ধরনের সত্যতা পেয়েছেন।
জবাবে মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, কমলাপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রেললাইনে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটত এবং লাশ পাওয়া যেত, সেসব মৃত্যুর সাথে জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততার কিছুটা সত্যতা পেয়েছেন। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা। তিনি জানান, রেললাইনে ট্রেনে কাটা দ্বিখণ্ডিত ও ত্রিখণ্ডিত লাশ উদ্ধারের ঘটনাগুলো তদন্ত করতে তিনি জিআরপি থানায় যাননি। কোন তারিখে কোথায় কোথায় লাশ পাওয়া গিয়েছিল, তা-ও তার জানা নেই। যেসব ভুক্তভোগীকে জিয়াউল আহসান রেললাইনে নিয়ে গিয়ে দ্বিখণ্ডিত বা ত্রিখণ্ডিত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের নামও বলতে পারবেন না বলে জানান তিনি।
জিয়াউল আহসানের সাথে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক সামরিক উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিকির বৈঠকের বিষয়েও প্রশ্ন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, কোন তারিখে এসব বৈঠক হয়েছিল, তা তদন্তে বের করতে পারেননি।
সোর্স এবং রানার ইমরুল কায়েসের কাছ থেকে বৈঠকের বিষয়ে জানতে পেরেছেন তিনি। তবে এসব বৈঠকের কোনো টেলিফোন রেকর্ড বা ভিডিও সংগ্রহ করেননি। এমনকি ভিডিও বা টেলিফোন রেকর্ড সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট কোনো দফতরে চিঠিও দেননি বলে স্বীকার করেন তিনি।
জিয়াউল আহসানকে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কেও তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করেন সাহিদুর রহমান। ‘আতঙ্কের নাম জিয়াউল’ শিরোনামে প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবেদকের নাম ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে তদন্ত করেননি বলে জানান রফিকুল ইসলাম। ‘যেসব অভিযোগ উঠে এসেছে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে’ শিরোনামে দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কেও তদন্ত করেননি তিনি।
এ ছাড়া ৪৩ জন বিডিআর সদস্যকে হত্যার সাথে জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবেদকের নাম ও বিষয়বস্তু সম্পর্কেও তদন্ত করেননি বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। এসব প্রতিবেদন অসত্য কি না, তা-ও তিনি জানেন না বলে জেরায় উল্লেখ করেন। দি সিটিজেনস ভয়েজের ‘দুর্নীতি: ইতিহাসের ভয়ঙ্কর অধ্যায়’ প্রতিবেদন সম্পর্কে তদন্ত করলেও প্রতিবেদকের নাম জানতে পারেননি তিনি। পত্রিকাটির কার্যালয় কোথায়, সেটিও বের করতে পারেননি।
যে আইডি থেকে প্রতিবেদনটি ডাউনলোড করেছিলেন, সেটি কে পরিচালনা করেন, তা-ও তদন্ত করে জানতে পারেননি বলে জানান রফিকুল ইসলাম। ‘বিজনেস স্ট্যানডার্ড’, প্রতিদিনের বাংলাদেশ ও দি সিটিজেনস ভয়েজ বিটিআরসি বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে নিবন্ধিত কি না, সে বিষয়েও জেরায় প্রশ্ন ওঠে।
সর্বশেষ ছাত্র আন্দোলনের সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং কয়েকজন মন্ত্রীর ফোনালাপের রেকর্ড গণভবন থেকে উদ্ধারের বিষয়েও প্রশ্ন করা হয় তদন্ত কর্মকর্তাকে। এসব ফোনালাপে আন্দোলন দমনে ইন্টারনেট বন্ধসহ বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আলোচনার তথ্য উঠে আসার বিষয়ে তিনি তদন্ত করেননি বলে জানান। তবে এ বিষয়ে পৃথক তদন্ত চলমান রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ইলিয়াস আলী কোন ফ্লাইটে ঢাকায় এসেছিলেন, সে বিষয়েও তদন্ত করেননি বলে জানান রফিকুল ইসলাম।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে সংঘটিত লগি-বৈঠার তাণ্ডবের ঘটনায় কোনো সাক্ষ্য বা ভিডিও ফুটেজ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেননি বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এ বিষয়ে পৃথক তদন্ত চলমান রয়েছে। তবে ওই ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা তিনি নন। জেরায় তিনি আরো জানান, ২০০৬ সালে তিনি পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) কর্মরত ছিলেন। সে সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি সরকার।
সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার বিষয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কোনো আদেশ দিয়েছিলেন কি না, তা তার জানা নেই। এ-সংক্রান্ত কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল কি না, সেটিও জানেন না বলে জানান তিনি।
২০০৬ সালে জিয়াউল আহসান কোথায় কর্মরত ছিলেন, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা। এ ছাড়া বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলামকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে বাগেরহাটের শরণখোলা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন হাওলাদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এ মামলা করা হয়েছে। মামলার একমাত্র আসামি মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসান।
এ মামলায় ১৫তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলাম। তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবী সাহিদুর রহমান ষষ্ঠ দিনের মতো তাকে জেরা করেন। জেরা শেষে পরবর্তী জেরার জন্য আজ (সোমবার) দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
ফুয়াদকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ
এদিকে আদালত অবমাননার অভিযোগে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদকে ৪ নভেম্বর হাজির হতে বলেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-১ এই আদেশ দেন। পরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম সাংবাদিকদের বলেন, আসাদুজ্জামান ফুয়াদের বিরুদ্ধে রোববার ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে একটি নোটিশ জারি করা হয়েছে। স্বপ্রণোদিত হয়ে ট্রাইব্যুনাল এই নোটিশ দিয়েছেন।
তামীম বলেন, আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবি পার্টির একটি অনুষ্ঠানে ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নানা ধরনের অবমাননাকর কথা বলেছেন। এসব কথা ট্রাইব্যুনালের নজরে এসেছে। ৪ নভেম্বর সশরীর হাজির হয়ে তাকে তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
উল্লেখ্য, এবি পার্টির একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সময় ব্যারিস্টার ফুয়াদ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। ওই বক্তব্যের একটি অংশে তিনি বলেন, ‘এখানে বস্তায় বস্তায় লেনদেন হচ্ছে।’ 
শাপলা চত্বর মামলার শুনানি পিছিয়েছে
এদিকে, শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞের মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি পিছিয়ে আগামী ১২ নভেম্বর নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। সকালে জিয়াউল আহসানকে ভার্চ্যুয়ালি হাজির করা হয়। তাকে ট্রাইব্যুনালে সশরীরে হাজির না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে শুনানির তারিখ পিছিয়ে ১২ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়।
এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন ধার্য ছিল গতকাল।