চীনা প্রস্তাবে ফি বাড়ছে ৩৫%


 দৈনিক ৩.৪২ লাখ ডলারের চীনা প্রস্তাব, বিদ্যমান টার্মিনালের  চেয়ে ফি ৩৫% বেশি

Advertisement

গ্যাস সঙ্কট মোকাবেলায় কক্সবাজারের মহেশখালীতে তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের উদ্যোগ চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে। সরকার থেকে সরকার (জি টু জি) পদ্ধতিতে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন (সিএনইই) ‘কুতুবদিয়া’ এফএসআরইউ স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন করতে যাচ্ছে সরকার। এটি হবে বিদ্যামান দু’টি এফএসআরইউ ফি’র চেয়ে ৩৫ ভাগ বেশি। ১৫ বছর বা ২০ বছর মেয়াদের দু’টি বিকল্প রাখা হয়েছে। প্রথমটির জন্য ব্যয় হবে ১২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। 
অন্যটির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র এ তথ্য জানিয়েছেন।   
দর বৃদ্ধির বিষয়ে জ¦ালানি বিভাগ মনে করে, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে অনিশ্চয়তা, এফএসআরইউর বৈশ্বিক চাহিদা ও নির্মাণ উপকরণের মূল্য বেড়েছে। তাই এই এফএসআরইউ দরও বেড়ে গেছে। 
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে গ্যাসের প্রকৃত দৈনিক চাহিদা প্রায় ৫৩০ কোটি  ঘনফুট, এর বিপরীতে অনুমোদিত চাহিদা রয়েছে ৩৮০ কোটি  ঘনফুট। অথচ দেশীয় খাত থেকে  উৎপাদন হয় প্রায় ১৬০ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি সরবরাহ প্রায় ১০০ কোটি  ঘনফুট। অনুমোদিত চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি দৈনিক প্রায় ১২০  কোটি  ঘনফুট। দেশীয় উৎপাদন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩ কোটি ৪০ হাজার ঘনফুট হারে কমছে।
এই বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেছেন, চাহিদামাফিক গ্যাস সরবরাহ না করায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্প খাতে। ডিমান্ড নোটের অর্থ পরিশোধের পরও ৫৭৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে গ্যাস সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না। আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানো ছাড়া আমাদের কোনো গতি নেই। 
সূত্র জানায়, বর্তমানে মহেশখালীতে ৬০ কোটি ও ৫০ কোটি ঘনফুট ক্ষমতার দু’টি এফএসআরইউ আছে। এর একটি হচ্ছে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলেটরের, এবং অন্যটি দেশীয় কোম্পানি সামিটের। এগুলোর সম্মিলিত ব্যবহারযোগ্য ক্ষমতা ৯৩ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট, ফলে এর চেয়ে বেশি গ্যাস গ্রিডে দেয়া সম্ভব নয়। জ্বালানি বিভাগের যুক্তি, সব এলএনজি এই দুই টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল। রক্ষণাবেক্ষণ, দুর্ঘটনা বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় একটি বন্ধ থাকলেই গ্রিডে সরবরাহ কমে যায়। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও শিল্পের জন্য এটি বড় ঝুঁকি। নতুন এফএসআরইউ রিগ্যাসিফিকেশন ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিকল্প সক্ষমতা তৈরি করবে এবং ভবিষ্যতে বাড়তি এলএনজি আমদানির সুযোগ দেবে।
প্রস্তাব ও টাকার অঙ্ক
জানা গেছে, ২১টি প্রস্তাবের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাইয়ে পাঁচটি জি টু জি প্রস্তাব যোগ্য বিবেচিত হয়। এর মধ্যে সিএনইইর প্রস্তাবটিকে ‘অধিকতর উপযোগী’ বলা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছে জ্বালানি বিভাগ। এগুলো হলো- ধারণক্ষমতা, নির্মাণকাল ও নির্মাণের বছর। 
সংস্থাটি চীনের জেনারটেক গ্রুপের অধীন। গত ২০ আগস্ট তারা পাঁচটি অপশনে প্রাথমিক বাণিজ্যিক প্রস্তাব দেয়। ২০০৮ সালে নির্মিত এক লাখ ৬৫ হাজার ঘনমিটারের জাহাজের জন্য দৈনিক ফি ছিল তিন লাখ ২৬ হাজার থেকে তিন লাখ ৩৬ হাজার ডলার। ২০১৬ সালে নির্মিত এক লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটারের জাহাজের জন্য তা ছিল তিন লাখ ৩০ হাজার থেকে তিন লাখ ৪২ হাজার ১৭৮ ডলার।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দরকষাকষির কমিটি ২০১৬ সালে নির্মিত এক লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটারের এফএসআরইউ এবং ১৫ বছরের চুক্তির সুপারিশ করে। কমিটির মতে, ভবিষ্যৎ এলএনজি চাহিদা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি মিশ্রণের পরিবর্তন বিবেচনায় এতে নমনীয়তা বেশি থাকবে। প্রয়োজনে সরকার মেয়াদ পুনর্বিবেচনা করতে পারবে। চুক্তি হবে বিওও (নির্মাণ, মালিকানা ও পরিচালনা) পদ্ধতিতে। ২০ বছরের বিকল্পে দৈনিক ফি ১৩ হাজার ডলার কম। কিন্তু মেয়াদ বেশি হওয়ায় মোট বর্তমান মূল্য প্রায় ৬৮ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৮৩৬ কোটি টাকা) বেশি।
অন্য এফএসআরইউর সাথে তুলনা
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, এক্সিলারেটের এফএসআরইউর জন্য দৈনিক ফি দুই লাখ ৫৪ হাজার ডলার (২০১৮-২০৩৩ মেয়াদ), সামিটের  জন্য দুই লাখ ৫১ হাজার ৮০৫ ডলার (২০১৯-২০৩৪ মেয়াদ)। আর ২০২৫ সালের নভেম্বরের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় কুতুবদিয়ার জন্য ফি ধরা হয়েছিল দুই লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলার।
প্রস্তাবিত তিন লাখ ৪২ হাজার ডলারের ফি এক্সিলারেটের চেয়ে প্রায় ৮৮ হাজার ডলার (প্রায় ৩৫%), সামিটের চেয়ে প্রায় ৯০ হাজার ডলার (প্রায় ৩৬%) এবং সমীক্ষার হিসাবের চেয়ে প্রায় এক লাখ দুই হাজার ডলার (প্রায় ৪৩%) বেশি। ১৫ বছরের বিকল্পে বছরে ফি দাঁড়ায় প্রায় ১২.৫ কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রায় এক হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। ২০ বছরের বিকল্পে তা প্রায় এক হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। মেয়াদজুড়ে অনির্ধারিত (ডিসকাউন্ট ছাড়া) মোট ফি ১৫ বছরে প্রায় ২৩ হাজার ৩০ কোটি এবং ২০ বছরে প্রায় ২৯ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা।
ফি বেশি হওয়ার কারণ বলতে জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে অনিশ্চয়তা, এফএসআরইউর বৈশ্বিক চাহিদা ও নির্মাণ উপকরণের মূল্য বেড়েছে। তা ছাড়া চুক্তির ১৮-২৪ মাসের মধ্যে টার্মিনাল চালু করতে হবে। প্রস্তাবিত জাহাজের ধারণক্ষমতা বেশি (বিদ্যমান এক লাখ ৩৮ হাজার, অন্য জি টু জি প্রস্তাবে এক লাখ ৭০ হাজার ঘনমিটার), জাহাজটি তুলনামূলক নতুন (অন্য প্রস্তাবিতগুলো ২০১০ ও ২০১২ সালে নির্মিত) এবং বড় এলএনজি কার্গো নেয়া যাবে। এতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি আমদানি ব্যয় প্রায় ০.০৫০.১০ ডলার কমতে পারে। রক্ষণাবেক্ষণজনিত বন্ধ থাকার সময় কমার কথাও বলা হয়েছে।
ঝুঁকি আছে কয়েক জায়গায়
এই এফএসআরইউ বিষয়ে বেশ কয়েকটি ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্র জানায়, প্রথমত এই এফএসআরইউ ব্যয় বেশি। বিদ্যমান দুই টার্মিনালের তুলনায় এই ঊর্ধ্বমুখী ফি। এখানে প্রস্তাবিত ফি এখনো অনেক বেশি।
দ্বিতীয়ত, করের অনিশ্চয়তা। আর্থিক মডেলে কর অব্যাহতি ধরা হয়েছে এবং এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মতামত চাওয়া হয়েছে। অব্যাহতি না মিললে প্রকৃত কর ‘পাস-থ্রু’ হিসেবে সরকারকে অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হতে পারে, যা ব্যয় আরো বাড়াবে।
তৃতীয়ত, সময়সূচি। সিএনইই চালুর তারিখ ধরেছে ২০২৮ সালের এপ্রিল। তবে বর্ষায় সংযোগ স্থাপনে বিলম্বের ঝুঁকি বিবেচনায় নভেম্বর ২০২৮ সর্বশেষ সময় ধরা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কার্যসম্পাদন জামানত দাখিলের সময় ২৮ দিন থেকে বাড়িয়ে ৬০ দিন করার অনুরোধ করেছে।
চতুর্থত, প্রক্রিয়াগত দিক। চীনের সাথে জ্বালানি সহযোগিতার সমঝোতাস্মারক এখনো স্বাক্ষরিত হয়নি। এর বদলে চীনা দূতাবাস থেকে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে প্রত্যয়ন পত্র পাওয়া গেছে। বাস্তবায়ন চুক্তি (আইএ) ও টার্মিনাল ব্যবহার চুক্তির (টিইউএ) খসড়ায় লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং বাকি। তবে অর্থ বিভাগসহ পাঁচটি মন্ত্রণালয়/বিভাগ অনাপত্তি দিয়েছে।
পঞ্চমত, প্রতিযোগিতা। উন্মুক্ত দরপত্রে চুক্তি করতে ছয়-সাত মাস লাগত, আর জি টু জি পদ্ধতিতে দুই-তিন মাস। সময় বাঁচলেও এই পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতামূলক দরের সুযোগ সীমিত। তবে এখন প্রমাণ করতে হবে, বিদ্যমান দুই এফএসআরইউর তুলনায় বাড়তি ব্যয় যুক্তিসঙ্গত।
যদিও নতুন এফএসআরইউ যুক্ত হলে আকস্মিক সরবরাহ বিঘেœর ঝুঁকি কমবে, তবুও দেশের পুরো জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভাসমান টার্মিনালগুলোর ওপর নির্ভরশীল থাকায় ঘূর্ণিঝড়, প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা বড় কোনো কারিগরি ত্রুটির ক্ষেত্রে বড় ধরনের জ্বালানি সঙ্কটের অন্তর্নিহিত ঝুঁকি থেকেই যায়।
জানা গেছে, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির পরবর্তী বৈঠকে এই প্রস্তাবটি অনুমোদনের  জন্য উত্থাপন করা হতে পারে।