
এএফপি
গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক বছর পূর্ণ হলেও ফিলিস্তিনিদের দেয়া প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী সব ইসরাইলি বন্দিকে এরই মধ্যে মুক্ত করা হলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। অন্য দিকে ইসরাইলি বাহিনীর একের পর এক হামলা অব্যাহত রয়েছে, সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়া থমকে গিয়ে উল্টো কিছু এলাকা পুনর্দখল করা হয়েছে এবং বেসামরিক শাসনব্যবস্থা ও পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠন কার্যক্রম এখনো শুরু করা যায়নি।
বর্তমানে গাজার প্রায় ২১ লাখ বাসিন্দার অধিকাংশ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন, যাদের অনেকেই দিন কাটাচ্ছেন তাঁবুতে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে অথবা ধ্বংসস্তূপের নিচে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মতে, এসব ধারাবাহিক হামলা ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরাইলের চালানো গণহত্যারই ধারাবাহিকতা। মিশর, কাতার, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যার মূল শর্ত ছিল পর্যায়ক্রমিক সেনা প্রত্যাহার, ত্রাণ সহায়তা বৃদ্ধি, নতুন শাসনব্যবস্থা প্রণয়ন এবং পুনর্গঠন কাজ শুরু করা।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর হামাস তাদের হাতে থাকা জীবিত অবশিষ্ট ২০ জন ইসরাইলি বন্দিকে মুক্তি দেয় এবং বিনিময়ে ইসরাইল এক হাজার ৯৬৮ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে ছেড়ে দেয়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ইসরাইলি সেনাবাহিনী শেষ মরদেহটি উদ্ধারের ঘোষণা দেয়ার আগ পর্যন্ত লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, গত এক বছরে ইসরাইলি বাহিনীর চুক্তি লঙ্ঘনের কারণে এক হাজার ৪৭০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং পাঁচ হাজার ১৮০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। আগস্টে মিশর, কাতার ও তুরস্ক জানায়, ক্রমাগত ইসরাইলি হামলা চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করছে এবং চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে গাজার প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকা ইসরাইলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। জাতিসঙ্ঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয়ের (ওসিএইচএ) তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির পর শুরুতে তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ পর্যন্ত আংশিক সেনা প্রত্যাহার করা হয়, যার ফলে উপত্যকার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়।
পরবর্তীতে সেনা প্রত্যাহারের সেই প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে এবং উল্টো পরিস্থিতি তৈরি হয়। ওসিএইচএ জানায়, জুনের শেষ নাগাদ ইসরাইলি বাহিনী হলুদ রেখা অতিক্রম করে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়। এর ফলে গাজার ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ এলাকা সরাসরি ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ বা কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় চলে যায়। আগস্ট নাগাদ জাতিসঙ্ঘ জানায়, উপত্যকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় ফিলিস্তিনিদের প্রবেশাধিকার বন্ধ রয়েছে কিংবা তারা তীব্র বিধিনিষেধের সম্মুখীন হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির ১৫ দফা রূপরেখায় হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর অস্ত্র সংক্রান্ত বিধিনিষেধের সাথে অতিরিক্ত ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন, শাসনভার হস্তান্তর এবং পুনর্গঠনের বিষয়টি যুক্ত ছিল। ৩ আগস্ট মিশর, কাতার ও তুরস্ক জানায়, অস্ত্র সম্পর্কিত বিধানসহ পুরো রূপরেখা মেনে নিয়েছে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী। তবে একই মাসের শেষ দিকে তুরস্ক, মিশর, কাতার ও সৌদি আরবসহ আটটি দেশ জানায়, ইসরাইল এই রূপরেখা প্রত্যাখ্যান করেছে, যা সামগ্রিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বেসামরিক কাজকর্ম পরিচালনার জন্য আলি শাথের নেতৃত্বে জানুয়ারিতে টেকনোক্র্যাটভিত্তিক ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ গঠন করা হয়। তবে প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তর এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং গাজায় মোতায়েন করার কথা থাকা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীও এখনো সেখানে পৌঁছায়নি। ত্রাণসহায়তা বাড়ানোর বিধান থাকা সত্ত্বেও মে মাসে জিকিম ক্রসিং বন্ধ হওয়ার পর কেরেম শালোমই পণ্য পরিবহনের একমাত্র সচল পথ হিসেবে রয়ে গেছে বলে সেপ্টেম্বরে জানায় ওসিএইচএ। একই সাথে আশ্রয় ও নির্মাণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ওপর ইসরাইলের কঠোর বিধিনিষেধ বজায় রয়েছে।
জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গাজার পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের জন্য ১০ বছরে সাত হাজার ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে, যার মধ্যে প্রথম ১৮ মাসেই প্রয়োজন দুই হাজার ৬৩০ কোটি ডলার। তাদের মূল্যায়নে দেখা গেছে, ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং তিন লাখ ৭১ হাজার ৮৮৮টি ঘরবাড়ি আংশিক বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ওসিএইচএ সেপ্টেম্বরে জানায়, ইসরাইলি বিধিনিষেধের কারণে হাজার হাজার তাঁবু এবং নির্মাণ সামগ্রীসহ জরুরি আশ্রয়ের মালামাল পৌঁছানো এখনো আটকে রয়েছে। যুদ্ধবিরতির এক বছর পর বন্দি ইস্যুটির সমাধান হলেও বাস্তুচ্যুত গাজাবাসীর জন্য যুদ্ধ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রতিশ্রুত দিনটি এখনো অধরাই রয়ে গেছে। ফিলিস্তিনিদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, পাশাপাশি উপত্যকাটির প্রায় ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








