
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন জরিপে যে আগাম আভাস পাওয়া যাচ্ছিল, নির্বাচনী ফলাফলে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ উভয় কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির হাতছাড়া হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এই অভাবনীয় বিজয় ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরকে রাজনৈতিকভাবে কঠিন করে তুলতে পারে।
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, শুল্কনীতি এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে জন-অসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কতটা বিপর্যস্ত করেছে, মার্কিন ভোটারদের ভোট দেয়ার প্রবণতায় সম্ভবত তারই প্রতিফলন ঘটেছে। নির্বাচনের পর পলিটিকোর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, দেশের মঙ্গলের জন্য তার প্রশাসন ডেমোক্র্যাটদের সাথে কাজ করবে। তিনি আরো বলেছেন, আগামী দুই বছর শুধু ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে কাটাতে চান না। খুব ভালো কথা।
‘‘নির্বাচনী ফলাফল কি আদৌ ঘরে-বাইরে শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে, নাকি আগামী দুই বছর প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের ক্ষমতার দ্বন্দ্বেই কেটে যাবে? উত্তর নির্ভর করছে শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর নয়, তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দায়িত্ববোধ এবং বৃহত্তর মানবিক স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারের ওপর’’
পরাজয়ের পর তার এই নমনীয় অবস্থান গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য ইতিবাচক। তবে তিনি একই সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন, ব্যালটে তার নিজের নাম থাকলে রিপাবলিকানরা সহজেই জয়ী হতেন। তার আত্মবিশ্বাসের প্রশংসা করতে হয়। কিন্তু নির্বাচনী ফলাফল যে তার প্রশাসনের প্রতি জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আগ্রহ ও আশাবাদ তৈরি হয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, মার্কিন জনগণ দারিদ্র্য সৃষ্টিকারী নীতি, বিদ্বেষ, লিঙ্গবৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকার এবং অভিজাত শ্রেণীর বিশেষ সুযোগ-সুবিধার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও নির্বাচনী ফলাফলকে একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, আমেরিকান জনগণ বিভক্তির পরিবর্তে ঐক্য প্রতিষ্ঠাকারী রাজনীতি এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে। নির্বাচনী প্রচারে ওবামার সক্রিয় অংশগ্রহণ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এবারের নির্বাচনে একটি ঐতিহাসিক ঘটনাও ঘটেছে। মিশিগান থেকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ (অনফঁষ ঊষ-ঝধুবফ) সিনেট নির্বাচনে জয়লাভ করে যুক্তরাষ্ট্রের ২৩৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। মিসরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান ৪২ বছর বয়সী এই রাজনীতিক একজন সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তিনি গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচক এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার। তার বিজয় মার্কিন রাজনীতিতে বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের তাৎপর্যকে নতুন করে সামনে এনেছে।
অভিবাসীদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সোচ্চার সোমালীয় বংশোদ্ভূত ইলহান ওমর এবং ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রশিদা তালিবও মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও ফিলিস্তিনের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা মার্কিন রাজনীতিতে অভিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
এদিকে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ নেতা হাকিম জেফ্রিসের স্পিকার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি স্পিকার পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন। আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তিনি মার্কিন ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার গৌরব অর্জন করতে পারেন।
এসব ঘটনা মার্কিন গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত শক্তির পরিচয় বহন করে। দেশটির সংবিধান নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করেছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা যাতে এককেন্দ্রিক ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষ আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ব্যাখ্যা ও বিচারিক পর্যালোচনার মাধ্যমে সাংবিধানিক কাঠামো রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অটুট রাখার এই ব্যবস্থা মার্কিন রাষ্ট্রচিন্তার পরিপক্বতা এবং ফাউন্ডিং ফাদার্সদের অসাধারণ দূরদর্শিতার পরিচায়ক। তবে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার অর্থ রাজনৈতিক বিরোধের অবসান নয়। বরং মতপার্থক্যের মধ্যেও সাংবিধানিক নিয়ম মেনে রাষ্ট্র পরিচালনা করাই গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা।
এখন বড় প্রশ্ন, এই নির্বাচনী ফলাফল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক আইন, নীতিমালা ও জাতিসঙ্ঘের কার্যকারিতা পুনরুদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্র কি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে? মধ্যপ্রাচ্য তথা পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ওয়াশিংটন কতটা উদ্যোগী হবে? ইরান যুদ্ধের অবসান, গাজায় মানবিক বিপর্যয় বন্ধ এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্কটের ন্যায়সঙ্গত সমাধানে নতুন কংগ্রেস কি প্রশাসনের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে?
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি অবশ্য মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী নন। তার বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতার কাঠামোতে পরিবর্তন এলেই ইরানের প্রতি ওয়াশিংটনের বৈরী নীতির পরিবর্তন হবে এমন ধারণা ভুল। তার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তেহরান মনে করে, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা দলীয় ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের বিজয় ইরান সঙ্কটের তাৎক্ষণিক সমাধান নিশ্চিত করবে, এমন আশা করার কারণ নেই।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান এবং ন্যাটো ও রাশিয়ার মধ্যে ক্রমবর্ধমান সঙ্ঘাতের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে চীনের সাথে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত করে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব কি না, সেটিও দেখার বিষয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের আধিপত্য বজায় রাখার প্রশ্নও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
তবে মনে রাখতে হবে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও প্রেসিডেন্টের হাতে পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক বিষয়ে উল্লেখযোগ্য নির্বাহী ক্ষমতা থেকে যায়। নতুন কংগ্রেস চাইলেই রাতারাতি ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে কিংবা আন্তর্জাতিক সঙ্কটগুলোর সমাধান করতে পারবে না। আইন প্রণয়ন, বাজেট নিয়ন্ত্রণ, তদন্ত ও রাজনৈতিক জবাবদিহির মাধ্যমে তারা প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারবে। কিন্তু তার জন্য দুই দলের মধ্যে ন্যূনতম সহযোগিতা অপরিহার্য।
আমরা দূর থেকে শুভবুদ্ধির বিজয় দেখতে চাই। মার্কিন জনগণের এই রায় যদি কেবল ক্ষমতার পালাবদলে সীমাবদ্ধ না থেকে শান্তি, সহনশীলতা, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, তাহলেই তার প্রকৃত সার্থকতা প্রতিষ্ঠিত হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়, নির্বাচনী ফলাফল কি আদৌ ঘরে-বাইরে শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে, নাকি আগামী দুই বছর প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের ক্ষমতার দ্বন্দ্বেই কেটে যাবে? উত্তর নির্ভর করছে শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর নয়, তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দায়িত্ববোধ এবং বৃহত্তর মানবিক স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারের ওপর।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, দ্য নিউ ন্যাশনের উপদেষ্টা সম্পাদক
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








