জসিম উদ্দিন
জসিম উদ্দিন। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের অনেক শত্রু রয়েছে। একদল রয়েছে স্থায়ী শত্রু। আরেক দল শত্রু প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। এরা আসে রাজনৈতিক পর্যায় থেকে। পোশাক শিল্পের শ্রমিকরাও জেনে না জেনে এর শত্রু বনে যান। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের শত্রুদের ব্যবহার করার জন্য স্থায়ী শত্রুরা ওঁৎ পেতে থাকে। পোশাকের বাজার ধসিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করার সুযোগের অপেক্ষায় থাকে তারা। শ্রমিক অসন্তোষের মূল কারণ মজুরিকেন্দ্রিক। সময়মতো বেতন না পাওয়া, ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত না হওয়া ইত্যাদি। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, রাষ্ট্র যথেষ্ট সময় পেলেও শ্রমিকের বঞ্চনা নিরসনে টেকসই সমাধান দিতে পারেনি। অস্থিরতা তৈরির উৎস জেনেও সেগুলোর সময়মতো সমাধান করেনি।
বরাবরের মতো এবারো ঠিক সেই সময়ই শিল্পাঞ্চলে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে যখন কারখানাগুলোতে রফতানি আদেশের মৌসুম। ইউরোপ ও আমেরিকায় পোশাকের মূল চাহিদা শীত মৌসুমে। এর কেন্দ্রে খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উৎসব-ক্রিসমাস। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্ডার ও পণ্যের সরবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। বাংলাদেশে পোশাকশিল্প ঘিরে নাশকতা এই মৌসুমেই দেখা যায়। বিগত কয়েক দশকে শ্রমিক আন্দোলনের তীব্রতা এই সময়কে ঘিরে হয়েছে। তবে নাশকতা ও নৈরাজ্য করার মাধ্যমে পোশাক শিল্পে ধস নামানোর অপচেষ্টা থাকলেও শ্রমিকদের দাবিও ন্যায্য। ২০২৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে উপযুক্ত মজুরির দাবিতে তীব্র আন্দোলনের মধ্যে সরকার ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকায় নির্ধারণ করে। তখনই সেটি যথেষ্ট ছিল না। ইতোমধ্যে যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে তাতে ওই মজুরি দিয়ে এখন কিছুই হয় না।
এবার সরকার শ্রমিকদের দাবির প্রতি ত্বরিত সাড়া দিয়ে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। দেখা গেল তারপরই ভাঙচুর জ্বালাও-পোড়াও আরো বেড়ে গেল। শিল্পাঞ্চলে পরিকল্পিত উপায়ে নাশকতার নানা চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। আন্দোলনের শুরুর দিকেই পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। একজন বিচারককে চেয়ারম্যান করে বোর্ড গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তাতে মালিক পক্ষ-শ্রমিক পক্ষ এবং স্বতন্ত্র বা নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ছয় সদস্য রাখা হয়। ২০২৩ সালের মজুরি বোর্ড গঠনের পর প্রথম সভা করতে ৪৫ দিন লেগেছে। ন্যূনতম মজুরি ঠিক করতে সময় লেগেছিল সাত মাসের মতো। সে জন্য সম্ভবত  শ্রমিকরা আস্থা পাচ্ছেন না। দেখা গেল রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে সড়ক অবরোধ, পুলিশের সাথে সংঘর্ষ জড়িয়ে পড়া, যানবাহন ভাঙচুর ও আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার বহু ঘটনা ঘটেছে। পরের দিন আন্দোলনের বিস্তৃতি ঘটানো হয়, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি আরো বাড়ে। বিজিবি-পুলিশ-সাংবাদিকসহ ১২ জন আহত হন। আশুলিয়াতে ২৬৪ পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে। মঙ্গলবার পর্যন্ত মোট ৬৭৯টি কারখানা বন্ধ হয়। আশঙ্কা করা হচ্ছে, পোশাক জাহাজীকরণ বিলম্বিত হবে। এর ফলে ক্রয়াদেশ রক্ষা কঠিন হবে।
শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার করার দাবি জানাচ্ছেন। বাজারে অগ্নিমূল্যের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের উচ্চহারে বেতন বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের এ দাবি বাড়াবাড়ি কিছু নয়। সারা দিন খাটুনি দিয়ে যতটুকু অর্থ তারা এখন উপার্জন করেন, তা দিয়ে ঘরভাড়া দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা পরিবারের ভরণপোষণ জোগাড় করা যায় না। বৃদ্ধ মা-বাবা যদি কারো থাকে তাদের সামান্য অর্থ পাঠাতে ঘাম ছুটে যায়। পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে অনেকে ওভারটাইম করে দিনের প্রায় সবটুকু সময় কারখানার ভেতরে কাটিয়ে দেন। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতির যে পূর্বাভাষ দেয়া হচ্ছে, তাতে শ্রমিকদের সামনের দিনে টিকে থাকা আরো কঠিন হবে। আন্দোলনের উচ্চ নৈতিক ভিত্তি তাই অস্বীকার করার উপায় নেই।
 শ্রমিকরা যখন ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনে নামছেন তখন পোশাক কারখানায় হামলা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ করে উপার্জনের অবলম্বন প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হচ্ছে। শ্রমিক আন্দোলনে সবসময় সম্পত্তি বিনাশের এই সাধারণ প্রবণতা দেখা যায়। এবারের আন্দোলনের সময় ২০টির বেশি কারখানায় সুপরিকল্পিত হামলা হয়েছে। সম্পত্তি ধ্বংসের আশঙ্কায় মালিকরা সোমবার পর্যন্ত ২০ শতাংশ পোশাক কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। দাবি-দাওয়া আদায়ে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি আছে। সরকার যেখানে তাদের দাবির প্রতি সাড়া দিচ্ছে, এরপরও নাশকতা চালানোর পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়। 
গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ইন্ধন দিচ্ছে। আত্মগোপনে থাকা তাদের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বিভিন্ন জায়গা থেকে জনবল সরবরাহ করে নাশকতা করছে। এই সুযোগে তারা দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে চায়। সাবেক এমপি মন্ত্রিরাও জড়িত থাকার প্রমাণ সরকারের কাছে আছে। আওয়ামী লীগ সরকারে না থাকলে সবসময় ধ্বংসাত্মক পথে হেঁটেছে। ৫ আগস্ট পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে টানা তারা এই অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। দাবি-দাওয়ার আন্দোলনে ঢুকে সম্পত্তির বিনাশ ও অস্থিরতা করাই তদের একমাত্র লক্ষ্য। ড. ইউনূসের অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় দুই হাজার ৭০০ আন্দোলন হয়েছে। ছাত্র শিক্ষক ডাক্তার আনছার এভাবে সমাজের কোনো গ্রুপ কিংবা পেশাজীবীদের যেকোনো আন্দোলনকে আশ্রয় করে নাশকতা তৈরি করার অপচেষ্টা তারা চালিয়েছে। তাদের দলে নেতাকর্মীরা এসব আন্দোলন থেকে আটক হয়েছে। চলমান শ্রমিক আন্দোলনেও তাদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। ছদ্মবেশে নাশকতার সময় মঙ্গলবার নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনটির ৩৩ সদস্য গ্রেফতার হয়েছেন। শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে এ পর্যন্ত দলটির ৬৮ জন স্পটে আটক হয়েছেন।  
পোশাক কারখানা মালিক হয়েও আওয়ামী লীগের লোকেরা আন্দোলনের নামে নাশকতা করতে চাইছে। এমনকি নিজের কারখানার ক্ষতি করেও তারা এটি করতে বেপরোয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দলটির চরিত্র হলো যখন তারা বিরোধী অবস্থানে থাকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা। জন্ম থেকে তারা এমন সন্ত্রাসে অভ্যস্ত। এ কারণে একে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন বলার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। তবে এবার একটি ভিন্ন কারণও যুক্ত হয়েছে। সেটি হলো পালিয়ে যাওয়া দলটির হাতে রয়েছে বিপুল অর্থ। ক্ষমতার সাড়ে ১৫ বছরে তারা সেটি পাচার করেছে। গার্মেন্ট শিল্প ধ্বংস হয়ে গেলে দলীয় ফান্ড থেকে অর্থ পাওয়ার তাদের সুযোগ রয়েছে। ডিসেম্বর মাস ঘিরে তারা বড় ধরনের ছক কষছে। তার বহু আলামত ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। তাই শুধু পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন নয়, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
সবশেষ অর্থবছরে বাংলাদেশ তৈরী পোশাক রফতানি করে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। হিসাব মতে দ্বিতীয় কোনো রফতানি খাত দেশের নেই। কাগজে-কলমে চামড়া খাত দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও তা থেকে দেড় বিলিয়ন ডলারের কম আয় আসে। সর্বশেষ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে ১২৩ কোটি ডলারের সামান্য বেশি অর্থ আয় হয়েছে। পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনকে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র, তৃতীয়পক্ষের ইন্ধন ইত্যাদি বলে দমন কিংবা এই সমস্যা সমাধানে অবহেলা করা আত্মঘাতী হবে; বরং এই খাতকে টেকসই করার জন্য শ্রমিকদের উপযুক্ত বেতনের নিশ্চয়তার পাশাপাশি অন্যান্য ঝুঁকি মোকাবেলার স্থায়ী পথে হাঁটতে হবে। এ কাজে সরকারকে নেতৃত্ব দিতে হবে।

Advertisement

আন্দোলনে পুলিশের আচরণ
আন্দোলন দমাতে গিয়ে পুলিশের নির্দয় আচরণ কোনোভাবে কাম্য নয়। নাশকতাকারীরা আছে তাই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ গ্রহণযোগ্য হবে না। মনে রাখতে হবে, এই শ্রমজীবী নারী ও পুরুষরা দেশের অর্থনীতির প্রাণ। প্রায় ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে ধরে রেখেছে নিম্নবিত্ত এই শ্রমিকরা। ফ্যাসিবাদী জামানায় পুলিশ আন্দোলন দমাতে সরাসরি গুলি করেছে। শ্রমিকরাও বিচার বহির্ভূত হত্যা ও গুমের শিকার হয়েছেন। জুলাই বিপ্লবে তারাও রাজপথে রক্ত ঝরিয়েছেন, প্রাণ দিয়েছেন।
এবারো আন্দোলন দমাতে গিয়ে পুলিশ কিছু নির্দয় আচরণ করেছে। ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান ডিসেন্ট আন্দোলন চলাকালে পুলিশের তিনটি নির্দয় আচরণ তুলে ধরে। মিরপুর ১১ নম্বরে এক শিশুকে চড় মারেন এক পুলিশ সদস্য। আরেকজন তার কোমর ধরে শূন্যে তুলে পিচঢালা রাস্তায় আছাড় মারেন। পল্লবীতে এক শিক্ষার্থীকে লাঞ্ছিত-অপমাণিত করার পর পেটানো হয়। তার পরনে স্কুলের পোশাক ছিল। এ সময় পুলিশ স্টুডেন্ট বলে চিহ্নিত করে। ছাত্র হলেই পেটানোর সংস্কৃতি হাসিনার আমলে চালু হয়। ছাত্ররাই ফ্যাসিবাদকে হটিয়েছে। সে কারণে তারা নিশানা হয়েছে। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী একই আচরণ হতাশার। 
কাছাকাছি এলাকায় এক ব্যক্তিকে এলোপাতাড়ি পেটানো হয়। তার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। তিনি ছিলেন একজন পথচারী। তিনিও কোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন। ডিসেন্ট সোমবারের তিনটি ঘটনা তুলে ধরে। পরদিন মঙ্গলবার আন্দোলন চলাকালেও পুলিশ আরো কয়েকটি নির্দয় আচরণ করেছে। সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে পুলিশের এই আচরণ আমাদের হাসিনার পুলিশের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তারা মানবাধিকারের কোনো ধার ধারত না। 
হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরে পুলিশের মধ্যে নিষ্ঠুরতা ঠুকিয়ে দেয়া হয়। বিরোধীদের দমন করার সব ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়ন যারা করেছে তাদের পুরস্কার দিয়েছে। দুই শতাধিক বহির্ভূত হত্যা করে টেকনাফের বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার পুরস্কার বাগিয়েছে। হারুন বিপ্লব মনির এই খুনিরা সবাই পুরস্কার পাওয়া। জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং পুরনো নির্দয় আচরণ চলতে পারে না। বাহিনীটিকে তার পেশাদার অবস্থানে ফিরে আসতে হবে। 
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
jjshim146@yahoo.com