ইকতেদার আহমেদ
ইকতেদার আহমেদ। নয়া দিগন্ত

যেকোনো দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। প্রতিটি রাষ্ট্রই কৃষি উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কৃষি উন্নয়ন প্রকারান্তরে কৃষকের উন্নয়নের পথ সুগম করে। কৃষিভূমির প্রতিটি ইঞ্চি উন্নত বীজ ও সার ব্যবহারের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যে নিবিড় চাষাবাদ করা হয় এটিকে কৃষিবিপ্লব বলা হয়। 
বাংলাদেশের সংবিধানে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিবিপ্লব রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে সংবিধানে উল্লেখ করা হয়েছে— নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিকীকরণের ব্যবস্থা, কুটিরশিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল পরিবর্তন সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সামগ্রিক জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ গ্রামে ও ৩০ শতাংশ শহরে বসবাস করে। প্রায় আড়াই যুগ আগে এ হারটি ছিল যথাক্রমে গ্রামে ৮০ ও শহরে ২০ শতাংশ। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভাজনের মধ্য দিয়ে যখন ভারত ও পাকিস্তান নামক দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তখন আমাদের বর্তমান বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে শিল্প-কারখানা বলতে কিছুই ছিল না। গ্রামাঞ্চল দূরের কথা, শহরাঞ্চলেও বিদ্যুতের ব্যবস্থা ছিল না। শহরের প্রধান সড়ক ব্যতীত অপরাপর সড়ক ছিল ইট বিছানো অথবা কাঁচা। শহরে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার সংখ্যা ছিল অতিনগণ্য।
পাকিস্তানের শাসনামলের ২৩ বছরে সব শহরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা গেলেও গ্রামীণ জনপদের প্রায় শতভাগই ছিল বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে। স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা দু-চার-দশ গ্রামে একটি খুঁজে পাওয়াও দুরূহ ছিল। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে এবং গ্রাম থেকে শহরে আসার রাস্তাও সেভাবে ছিল না। স্কুল বলতে দু-চার-পাঁচ গ্রামের মধ্যে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। 
বাংলাদেশ অভ্যুদয় পরবর্তী দ্রুত অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। এখন গ্রামের পথঘাট অনেক উন্নত। এমন অনেক গ্রাম রয়েছে যেগুলো পাকা রাস্তার মাধ্যমে শহরের সাথে সংযুক্ত। বর্তমানে গ্রামের প্রায় শতভাগ বাড়িতে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার ব্যবস্থা আছে। বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। প্রত্যন্ত যেসব গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎসুবিধা দেয়া যায়নি, সেসব গ্রামের অধিবাসী সৌর বিদ্যুতের বদৌলতে বৈদ্যুতিক বাতি, বৈদ্যুতিক পাখা, টিভি, ফ্রিজ প্রভৃতি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে বায়োগ্যাসের মাধ্যমে রান্নার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প তিন দশকের বেশি সময় আগে যাত্রা শুরু করলেও তেমন অগ্রগতি হয়নি। অথচ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ছয় থেকে আট সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিবারের প্রতিদিন যে গৃহস্থালি বর্জ্য হয় তা গোবরের সাথে মিশ্রণ করে প্রক্রিয়াজাত করলে একটি পরিবারের ন্যূনতম জ্বালানি ও বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এ ধরনের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং বিভিন্ন এনজিও এগিয়ে এলেও গ্রামের মানুষের আগ্রহ আশাপ্রদ নয়। এমনকি প্ল্যান্ট স্থাপন বিষয়ে ভর্র্তুকি দেয়ার কথা বলা হলেও দেখা গেছে, তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে গ্রামের মানুষের মধ্যে তেমন একটা উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারেনি। এ কথাটি অনস্বীকার্য যে, যদিও আমরা গরুর গোবর সার ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি; কিন্তু গৃহস্থালি আবর্জনা স্রেফ বর্জ্য বিধায় এর অথনৈতিক মূল্য নিয়ে শুধু গ্রাম কেন, শহরাঞ্চলের মানুষও খুব একটা চিন্তাভাবনা করে না। 
উন্নত দেশগুলোতে গৃহস্থালির বর্জ্যরে মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরবর্তী যা অবশিষ্ট থাকে তা কৃষিজমিতে জৈবসার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশেও এটা সম্ভব। রাসায়নিক সারের মধ্যে ইউরিয়া আমাদের দেশে উৎপন্ন হলেও তা দিয়ে বার্ষিক চাহিদা মেটে না। টিএসপি সারের একটি কারখানা থাকলেও এর কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনতে হয়। এখনো আমাদের দেশের অভ্যন্তরে পটাশ সার উৎপাদনের কোনো কারখানা গড়ে উঠেনি। 
অধুনা বিশ্বে জৈবসার দিয়ে যে ফসল উৎপন্ন হয়, এর মূল্য রাসায়নিক সারের মাধ্যমে উৎপন্ন ফসলের দুই-তিন গুণ বেশি। এতে সহজেই অনুমান করা যায়, জৈবসার সহজলভ্য করে এর ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করা গেলে কৃষকের ভাগ্যের উন্নয়ন হবে।
বাংলাদেশের কৃষকরা এক বছর যে ফসল উৎপাদন করে লাভবান হন, পরবর্তী বছর একই ফসল উৎপাদনে উদ্যোগী হন। এভাবে একজনকে লাভবান হতে দেখে অপরাপর অনেক কৃষক একই ফসল উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এতে দেখা যায় ফসলের বাড়তি উৎপাদনের কারণে মূল্য পড়ে গিয়ে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেকোনো ফসলের উৎপাদন, বিপণন ও চাহিদা বিষয়ে কৃষকের পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকলে তাদের ক্ষতির সম্ভাবনা ক্ষীণ। এমন অনেক মসলাজাতীয় ফসল রয়েছে যেগুলোর উৎপাদন আমাদের দেশে কম অথবা আমাদের দেশে একেবারেই উৎপন্ন হয় না। বলা যায় এলাচি, দারুচিনি, গোলমরিচ, জিরা, জাফরান, জায়ফল, জয়ত্রি, পোস্তাদানা প্রভৃতি। এসব মসলাজাতীয় ফসল আমাদের পাশের রাষ্ট্র ভারত এবং সার্কভুক্ত রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় প্রচুর উৎপন্ন হয়। বর্তমানে মাটির পরিচর্যার মাধ্যমে পৃথিবীর এক অঞ্চলের ফসল অন্য অঞ্চলে উৎপন্ন হয়। উপরোক্ত ফসলগুলো অর্থকরী ফসল হওয়ায় আমাদের কৃষকরা এসব ফসলের গাছ নিজ বাড়ির আঙিনায় লাগালে এর মাধ্যমে তাদের যে আয় হবে, তা তাদের সচ্ছল জীবনযাপনের সহায়ক হবে। সুতরাং আমাদের সরকার ও কৃষি বিভাগের উচিত কৃষকদের সে লক্ষ্যে উৎসাহী করে তোলা। 
আমাদের দেশে যেসব অঞ্চলে আম, লিচু, কমলা, মাল্টা, বাউকুল, আপেলকুল, আমড়া, বেল, কদবেল, কাজি পেয়ারা, আঙ্গুর, পেঁপে প্রভৃতি উৎপন্ন হয়, সেসব অঞ্চলের কৃষকরা বাড়ির আঙিনায় পুকুর ও রাস্তার ধারে আবার কৃষিজমিতে এসব গাছ লাগিয়ে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন। এ সফলতা তাদের বাড়তি আয়ের পথ করে দিয়েছে। 
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সহায়ক প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন— উচ্চ ফলনশীল বীজ ও বিভিন্ন সারের আনুপাতিক ব্যবহারের কারণে আমাদের দেশে উৎপন্ন হয় এমন সব ফসলের উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে। এমন অনেক মৌসুমি ফসল আছে যেগুলো বৈজ্ঞানিক পন্থায় চাষ করে সারা বছর উৎপন্ন করা সম্ভব। তা ছাড়া অতীতে যে ভূমিতে বছরে এক ফসল হতো, এখন একই ভূমিতে দুই বা তিন ফসল হচ্ছে। আবার একই ভূমিতে একটি ফসলের ফাঁকে ফাঁকে আরেক ফসলের চাষ হচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় ধান ও মাছের চাষ একই ভূমিতে একসাথে করা হচ্ছে। এ ধরনের উদ্ভাবনী পদ্ধতি প্রতিটি ফসল ও মাছ উৎপাদন বাড়াচ্ছে। কিন্তু কৃষক পর্যায়ে পাইকারি বিক্রয়মূল্য এবং ভোক্তাপর্যায়ে খুচরা বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ব্যাপক ফারাক থেকে যাচ্ছে। এতে বাড়তি উৎপাদন ও বাড়তি মূল্য কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারছে না। বর্তমানে আমাদের বেশকিছু কৃষিপণ্য রফতানি হয়। 
বাংলাদেশ অভ্যুদয়-পরবর্তী গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিবিপ্লব বিষয়ে সংবিধানের নির্দেশনার আলোকে প্রতিটি সরকারই সে লক্ষ্যে বার্ষিক রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট প্রণয়নকালে যথাযথ বরাদ্দ প্রদানে সচেষ্ট থেকেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ জনপ্রতিনিধি ও সরকারি ব্যক্তিদের দ্বারা লুণ্ঠিত হওয়ায় কৃষকের ভাগ্যোন্নয়ন হচ্ছে না। আর এ কারণেই আমাদের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিবিপ্লব দীর্ঘদিন ধরে একটি আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। 
গ্রামে কৃষির পাশাপাশি কুটিরশিল্পের বিকাশ করা গেলে গ্রামের মানুষ শহরমুখী হবে না। এযাবৎকাল পর্যন্ত এই পথে আমাদের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। 

Advertisement

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
iktederahmed@yahoo.com