
চট্টগ্রাম ব্যুরো
ফেব্রুয়ারিতে ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলার পর থেকেই বাংলাদেশে জ্বালানি তেল ও এলএনজির জোগান নিয়ে একদিকে অনিশ্চয়তা যেমনি সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি বেছে নিতে হচ্ছে ব্যয়বহুল পথ। এর উপর নতুন করে বাব আল মান্দেব প্রণালী বন্ধ হওয়ায় জ্বালানি তেল আমদানিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার আভাস মিলছে। তবে সরকার পরিশোধিত এবং অপরিশোধিত উভয় ধরনের জ্বালানি তেল আমদানিতে বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে। এরই মধ্যে বাব আল মান্দেবে অনিশ্চয়তার প্রেক্ষিতে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে চার দেশের ক্রুড পরিশোধন উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া দেশগুলোর সাথে সরকারের আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা রাষ্ট্রের সব পদক্ষেপে ভূ-কৌশলগত ঝুঁকিকে মাথায় রেখেই অগ্রসর হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
ইস্টার্ন রিফাইনারির একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গত ১২ সেপ্টেম্বর সৌদী আরবের ইয়ানবু থেকে প্রায় ৫০ দিন সময় নিয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছেছে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল বোঝাই এমটি নিনেমিয়া। বর্তমানে জাহাজটির ক্রুড অয়েল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে খালাস হচ্ছে। অপর একটি জাহাজের শিডিউল থাকলেও সেটি কোন পথে আসবে তা নির্ধারণ হয়নি। ৬ অক্টোবর একটি জাহাজের শিডিউল রয়েছে উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, আগামী মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত হয়তো বর্তমান মজুদ দিয়ে চলবে। তবে বাব আল মান্দেব এড়িয়ে জাহাজ আনতে হলে দীর্ঘ সময় লাগবে। সূত্র বলছে, যেহেতু বাংলাদেশ এরই মধ্যে সৌদী সামরিক জোটে যোগ দিয়েছে, তাই বাব আল মান্দেব দিয়ে বাংলাদেশে ক্রুড আসার আপাতত সম্ভাবনা নেই। তা ছাড়া এরই মধ্যে সৌদী আরবের ইস্টার্ন পাইপ লাইন হুতি হামলায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং হামলার মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে কাতারের এলএনজির ন্যায় সৌদী ক্রুডেরও অনিশ্চয়তার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না খাত সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে অবশ্য আরব আমিরাত থেকে শিডিউল অনুযায়ী জাহাজ আসলে হয়তো আপাতত সমস্যা হবে না, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
দেশের মজুদ পরিস্থিতি : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, একদিকে হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ থাকা, অন্য দিকে বাব আল মান্দেব প্রণালীতে সৌদী জাহাজের উপর ইয়েমেনের হুথিদের অবরোধ আরোপের প্রেক্ষিতে দেশের জ্বালানি খাতে প্রচ্ছন্ন উদ্বেগ শুরু হয়েছে। যদিও বিপিসি বলছে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মজুদ নিশ্চিত করা আছে। আরো কিছু আমদানির ক্রয় আদেশও নিশ্চিত হয়েছে বলে বিপিসি চেয়ারম্যান দাবি করেছেন। হরমুজে অচলাবস্থার পর বাব আল মান্দেব দিয়েই সৌদী আরব থেকে ক্রুড অয়েল আমদানি করা হচ্ছিল। কিন্তু বাব আল মান্দেবেও অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে প্রায় এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী মাদার ট্যাংকার ‘এমটি নিনিমিয়া’ সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর, জিব্রাল্টার প্রণালী এবং উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে বিকল্প পথে গত ১২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। এতে প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার বাড়তি ব্যয় গুনতে হয়েছে, পাশাপাশি নিয়মিত পথে আসতে ১২-১৩ দিনের স্থলে ঘুর পথে চট্টগ্রামে পৌঁছাতে বাড়তি সময় লেগেছে আরো ৩০ দিন। এমনি পরিস্থিতিতে আগামী ৬ অক্টোবরে একটি জাহাজের শিডিউল থাকলেও এখন পর্যন্ত রুট নির্ধারণ করতে পারেনি বিপিসি ও বিএসসি।
বিকল্প উৎসের সন্ধানে বিপিসি : এ দিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সময়মতো প্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা না কাটায় বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত উভয় ধরনের জ্বালানিতেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে বিপিসি। এরই অংশ হিসেবে ইতঃমধ্যে বিভিন্ন দেশের অপরিশোধিত তেল পরীক্ষার পর নাইজেরিয়ার ‘বন্নি লাইট ক্রুড’, মালয়েশিয়ার ‘মালয়েশিয়ান ব্লেন্ড লাইট ক্রুড’, নরওয়ের ‘আলভহিম ব্লেন্ড লাইট ক্রুড’ এবং আলজেরিয়ার ‘সাহারা ব্লেন্ড ক্রুড’ ইস্টার্ণ রিফাইনারিতে পরিশোধন উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যদিও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই রিফাইনারিটি প্রতিষ্ঠার পর হতেই সৌদি আরবের এরাবিয়ান লাইট ক্রুড এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মারবান ক্রুড পরিশোধন করে আসছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল শোধন করে আসছে। এর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়ার ক্রুড অয়েল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ব্যবহারোপযোগী নয় বলে চিহ্নিত হয়েছিল।
ঝুঁকি বিবেচনায় অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ : দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার সাথে ভূ-রাজনীতির সম্পর্ক প্রবলভাবে জড়িত। ফলে ভূ-কৌশলগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই দেশের নীতি নির্ধারকদের যেকোনো পদক্ষেপ নিতে হবে বলে জানিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. আব্দুল্লাহ আল ইউসুফ নয়া দিগন্তকে বলেন, হরমুজ এবং বাব আল মান্দেব-উভয় প্রণালীর সাথেই আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার সংযোগ রয়েছে। এতদিন বাব আল মান্দেব খোলা থাকলেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ আসতে না পারার খেসারত আমাদের দিতে হয়েছে। সৌদী আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে আমরা যোগ দিয়েছি। কিন্তু হুতিরা এখন সৌদী জাহাজ এবং সৌদী তেলবাহী জাহাজের উপর অবরোধ দিয়েছে। ফলে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আবারো অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হচ্ছে। কাজেই মক্কা প্যাক্টের বিষয়ে আমাদের সব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই অগ্রসর হওয়া উচিত। আমরা যদি মক্কা প্যাক্টে শামিল হই তখন সৌদী আরব হুতিদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য আমাদের সৈন্য চাইবে, তখন আমরা বড় ধরনের বেকায়দায় পড়ব। কাজেই সব ধরনের ঝুঁকি মাথায় রেখেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ হাসনাত নয়া দিগন্তকে বলেন, সৌদী আরব থেকে বিকল্প রুট ব্যবহার করে একটি জাহাজ এসেছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিকল্প রুটের সম্ভাব্য বিষয় এবং বাড়তি সময়ের বিষয়টি এডজাস্ট করেই রিফাইনারি চালু রাখার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। রিফাইনারির বর্তমানে কাঁচামাল মজুদ কত দিনের রয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি বিষয়টি অত্যন্ত সেনসিটিভ উল্লেখ করে আর কিছু বলতে চাননি। ইমিডিয়েট কোনো সঙ্কট নেই জানিয়ে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি যদি দীর্ঘায়িত হয় তখন সেটার সাথে এডজাস্ট করেই আমাদের চলতে হবে। কারণ এ ধরনের পরিস্থিতির উপর তো আমাদের হাত নেই।







