ইসির সাংবিধানিক স্বাধীনতা কোথায়
জামায়াতে ইসলামীর জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ছবি: নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক 

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত যদি সরকারের পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা কার্যত কোথায় থাকে? জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান যদি সরকারের রাজনৈতিক  ইচ্ছার কাছে জবাবদিহি করে, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। 
গতকাল বুধবার রাজধানীর মগবাজার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. হামিদুর রহমান আযাদ, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জম হোসাইন হেলাল, নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি প্রমুখ। 
গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও দৃঢ় প্রতিবাদের সাথে বলতে চাই- নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক ক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যদি সরকারের আপত্তি ও রাজনৈতিক চাপের মুখে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়, তাহলে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও জনগণের ভোটাধিকার নিঃসন্দেহে হুমকির মুখে পড়ে। 
তিনি আরো বলেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে সম্পন্ন করার একটি প্রাথমিক রূপরেখা ঘোষণা করে। প্রথম ধাপের নির্বাচন ১২ নভেম্বর এবং শেষ ধাপের নির্বাচন আগামী ২৭ মে করার পরিকল্পনা জানানো হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সরকারের স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম প্রকাশ্যে ওই সময়সূচি নিয়ে আপত্তি জানান। এর পরই নির্বাচন কমিশন তার ঘোষিত রূপরেখাকে ‘পুরোপুরি প্রাথমিক’ বলে পুনঃব্যাখ্যা করে এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনার কথা জানায়। 
তিনি বলেন, এখানেই জনগণের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক প্রশ্নটি এসে দাঁড়িয়েছে। একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান তার নির্বাচনী রূপরেখা প্রকাশ করার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরকারের আপত্তির মুখে কেন অবস্থান পরিবর্তন করল? আরো বড় প্রশ্ন হলো- সরকারের নিয়ন্ত্রণ, চাপ ও প্রভাবের কাছে যদি নির্বাচন কমিশন এভাবে নমনীয় হয়ে পড়ে, তাহলে সেই কমিশনের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আদৌ সম্ভব কি না? 
জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, আমরা সরকারের সাথে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক সহযোগিতার বিরোধিতা করছি না। কিন্তু সহযোগিতা আর হস্তক্ষেপ এক বিষয় নয়। সাংবিধানিক সহযোগিতার নামে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো ইসি সচিব আখতার আহমেদ প্রকাশ্যে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন এবং তার বক্তব্যের বিপরীতে কোনো মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। এতে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে জনগণের উদ্বেগ আরো গভীর হয়েছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সরকারের মন রক্ষা করা নয়; সংবিধান রক্ষা করা। আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার- ১. সরকার নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবে- এটিই সাংবিধানিক প্রত্যাশা। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে- এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ২. সহযোগিতার নামে নিয়ন্ত্রণ, সমন্বয়ের নামে চাপ এবং প্রশাসনিক যুক্তির আড়ালে নির্বাচন বিলম্বিত করার অপচেষ্টা জনগণ মেনে নেবে না। 
নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকারের চাপের দিকে নয়, সংবিধানের দিকে তাকান। কোনো রাজনৈতিক পক্ষের স্বার্থের দিকে নয়, জনগণের ভোটাধিকারের দিকে তাকান। ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্ট করার দিকে নয়, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার দিকে তাকান। 
তিনি সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে কোনো টালবাহানা চলবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার কোনো কৌশল জনগণ মেনে নেবে না। অনির্বাচিত প্রশাসকদের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের অধিকার হরণ করা যাবে না। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতায় হস্তপেক্ষ করে গণতন্ত্রকে দুর্বল করার কোনো অপচেষ্টা সফল হতে দেয়া হবে না।  
গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক মর্যাদা রক্ষার জন্য সোচ্চার থাকবে। জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করা এবং অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার সংগ্রামে আমরা জনগণের পাশে থাকব। 
তিনি বলেন, আমরা চাই- অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন। জনগণ তাদের প্রতিনিধি নিজের ভোটে নির্বাচিত করবে- এই অধিকার কোনো সরকার, কোনো মন্ত্রণালয় বা কোনো প্রশাসনিক অজুহাতে কেড়ে নেয়া যাবে না। এই অধিকার নিশ্চিত করতেই হবে।