ইসরাইলি নির্বাচন ২০২৬, ফিলিস্তিনে ইসরাইলি দখলদারিত্ব, পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরাইলি বসতি, গাজায় ইসরাইলি হামলা, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, গাদি আইজেনকোট
ইসরাইলের নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট। সংগৃহীত

অতীতে অনেক ফিলিস্তিনি ও আরব নাগরিক ইসরাইলের নির্বাচন গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করতেন। তবে তার অর্থ এই নয় যে তারা কোনো জায়নবাদী নেতা শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন, দখলদারিত্বের অবসান ঘটাবেন কিংবা অবৈধ বসতি সরিয়ে নেবেন—এমন কোনো অলীক স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। বরং তাদের ভয় ছিল, কিছু ইসরাইলি নেতা হয়তো অন্যদের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক ও উগ্র হতে পারেন। তাই তারা তুলনামূলক কম ক্ষতিকর পক্ষকে ক্ষমতায় দেখতে চাইতেন।

Advertisement

তবে সময়ের সাথে সাথে ফিলিস্তিনিদের সেই ধারণায় বড় পরিবর্তন এসেছে। অভিজ্ঞতা থেকে তারা আজ উপলব্ধি করেছেন যে সব ইসরাইলি নেতার আসল রূপ একই। এটি কোনো নিরাশাবাদ নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে অর্জিত বাস্তব অভিজ্ঞতা।

উদাহরণস্বরূপ, অসলো শান্তি চুক্তির সময় তখনকার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী আইজাক রাবিনের মেয়াদে অবৈধ ইহুদি বসতি বিস্তারের বিষয়টি বিবেচনা করা যাক।

ফিলিস্তিনি সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিক্স (পিসিবিএস)-এর সংগৃহীত ইসরাইলি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে পূর্ব জেরুসালেম ছাড়া পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা ১১১ হাজার ৬৭৩ থেকে বেড়ে ১৪০ হাজার ২৩৫ জনে দাঁড়ায়—যা প্রায় ২৫ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি।

একই ধারা অব্যাহত ছিল লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের শাসনামলেও।

ক্ষমতায় আসার প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই বারাক সরকার ৩ হাজার ১৯৬টি বসতি স্থাপনের দরপত্র আহবান করে, যা তার ডানপন্থী পূর্বসূরি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বার্ষিক গড় সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

পরে ২০২১ সালের জুনে নাফতালি বেনেট যখন আরব দল ‘রাম‘-কে সাথে নিয়ে জোট সরকার গঠন করেন, তখনও অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ একচুলও কমেনি।

ইসরাইলি বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘পিস নাউ‘—এর তথ্য অনুযায়ী, বেনেট-লাপিত সরকারের প্রথম বছরেই ৭ হাজার ২৯২টি নতুন বাসস্থান অনুমোদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, যা আগের নেতানিয়াহু সরকারের বার্ষিক গড়ের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি।

এই অবৈধ বসতিগুলোই প্রকৃতপক্ষে দখলদারিত্বের মূল চালিকাশক্তি। বসতি গড়তে ফিলিস্তিনি জমি দখল করতে হয়; নিরাপত্তায় বিপুল সৈন্য মোতায়েন করতে হয়; আর তাদের পানি, রাস্তা ও অবকাঠামো জোগাতে গিয়ে কেড়ে নেয়া হয় ফিলিস্তিনিদের মৌলিক সম্পদ। এই পুরো প্রক্রিয়াই ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে ইসরাইলি সহিংসতার মাত্রাকে বাড়িয়ে তোলে।

পিসিবিএস-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ পশ্চিম তীরে ৩৫০টি আউটপোস্টসহ মোট ৬৪৫টি ইসরাইলি বসতি ও সামরিক ঘাটি গড়ে উঠেছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ‘কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশন‘—এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্টের মধ্যে ‘সরকারি জমি‘ ঘোষণার অজুহাতে প্রায় ২৯ হাজার ৩৩৫ দুনাম ফিলিস্তিনি জমি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে—যা অসলো চুক্তির পর ভূমি দখলের অন্যতম বৃহত্তম ঘটনা। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে আরো ১৮০০০-এর বেশি নতুন বসতি স্থাপনের অনুমোদন বা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

জমির দখলের পাশাপাশি পুরো পশ্চিম তীরজুড়ে চলছে ভয়াবহ সহিংসতা।

জাতিসঙ্ঘ ২০০৫ সালে ফিলিস্তিনি হতাহতের হিসাব রাখা শুরু করার পর ২০২৩ সালটি ছিল পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর।

কেবল ২০২৫ সালেই ইসরাইলি বাহিনী ও উগ্র বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি ও তাদের সম্পত্তির ওপর ২৩ হাজার ৮২৭টি হামলা চালিয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের হামলার হার আগের বছরের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সাধারণত, ইসরাইলি দখলদার সেনাবাহিনী এবং সশস্ত্র উগ্র ইহুদিদের এই সহিংসতাকে গাজায় চলমান গণহত্যা বা সংঘাতের অংশ হিসেবে দেখা হয়। তবে পশ্চিম তীরে এই সহিংসতার মূল উদ্দেশ্য কেবল সম্মিলিত শাস্তি দেয়া নয়; বরং এর নেপথ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের খামার ও কৃষিজমি বাজেয়াপ্ত করা, সীমানা বাড়ানো, বসতির বিস্তার ঘটানো এবং উপনিবেশবিরোধী যেকোনো অহিংস প্রতিরোধকে গুঁড়িয়ে দেয়া।

অতএব, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে অংশ নেয়া যেকোনো ইসরাইলি প্রার্থী যখন বসতি সম্প্রসারণকে সমর্থন করেন, তখন এর পরিণতি—উচ্ছেদ, সামরিক দখলদারিত্ব ও সহিংসতা—সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি ওয়াকিফহাল থাকেন।

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের সাথে তুলনামূলক ‘নরমপন্থী‘ হিসেবে পরিচিত রাজনীতিবিদদের পার্থক্য কেবল ভাষা, কৌশল ও সময়ের; নীতিগত কোনো পার্থক্য তাদের মধ্যে নেই।

উদাহরণস্বরূপ, ইসরাইলের সাবেক সেনাপ্রধান ও ‘য়াশার‘ পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে কিছুটা ‘উদারপন্থী‘ ভাবমূর্তি রাখলেও, তিনি খোলাখুলিভাবেই পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণকে সমর্থন করেন।

তাহলে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান কী?

ইসরাইলের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্য থেকে কে গাজার গণহত্যা বন্ধ করা, অবরোধ তুলে নেয়া, নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, সেনাবাহিনীকে সংযত রাখা কিংবা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের তদন্ত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন? উত্তর হলো—একজনও না।

গত তিন বছর ধরে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলো সরকার, সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিরোধী দলের মধ্যে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র মতভেদের খবর প্রচার করে আসছে।

অথচ, আইজেনকোট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাঠামোর মাধ্যমেই হোক কিংবা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই হোক—ক্ষমতায় আসার ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার করেছেন।

অন্যদিকে, ‘ইয়েশ আতিদ‘ প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ গাজাকে ১৫ বছরের জন্য মিশরের প্রশাসনে ন্যস্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে ইসরাইলের অপকর্মের দায়ভার পরোক্ষভাবে আরব দেশগুলোর ওপর চাপানো যায়।

আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ফিলিস্তিনি দলগুলোকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।

সুতরাং, তাদের মধ্যকার বিরোধ গাজা বা ফিলিস্তিন নীতি বদলানো নিয়ে নয়; বরং একই লক্ষ্য কিভাবে অর্জন করা যায় সেই কৌশল নিয়ে।

ইসরাইলি রাজনীতির অন্যান্য বড় বিরোধ মূলত তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সমাজকেন্দ্রিক—যেমন আল্ট্রা-অর্থোডক্স ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ, বিচার বিভাগীয় সংস্কার এবং ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার জবাবদিহিতা।

কিন্তু এসব অভ্যন্তরীণ বিবাদকে ফিলিস্তিনিদের বাঁচা-মরার প্রশ্নের সাথে গুলিয়ে ফেললে চলবে না।

নেতানিয়াহু যদি ফের ডানপন্থী জোট গঠন করতে সফল হন, তবে দখলদারিত্ব, বসতি বৃদ্ধি এবং সামরিক আগ্রাসনের নীতি নতুন গতিতে চলতে থাকবে।

আর যদি কোনো বিস্তৃত বা উদারপন্থী জোটও ক্ষমতায় আসে, তারা হয়তো বিচার বিভাগ বা সেনা নিয়োগের মতো অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছাবে; কিন্তু ফিলিস্তিনের ওপর চরম নির্যাতন ও দখলদারিত্বের প্রশ্নে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে না।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মধ্য-বামপন্থী বা উদারপন্থী দল সরকার গঠন করলে তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের একটি ‘সংস্কারক ও শান্তিকামী’ দেশ হিসেবে তুলে ধরে গাজা গণহত্যার কালঙ্ক মুছে ফেলার চেষ্টা করবে—অথচ ভূমিতে আসল ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তনই হবে না।

অতএব, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চরম সতর্ক থাকতে হবে। কোনো নতুন ইসরাইলি সরকারকে নিজেদের ‘শান্তিদূত‘ হিসেবে উপস্থাপন করার বা নতুন রূপের বিভ্রম তৈরি করার সুযোগ দেয়া যাবে না, যখন তারা নেপথ্যে অবৈধ বসতি, দখলদারিত্ব, যুদ্ধ ও ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যার পেছনেই ইন্ধন জুগিয়ে চলেছে। সূত্র : মিডল ইস্ট মনিটর