
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সকে আগামী ২৯ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
একই সাথে ওইদিন নথিপত্রসহ টাস্কফোর্সের প্রধান এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহাকে হাইকোর্টে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে। বিচারপতি শিকদার মো: মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত একটি হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ আজ মঙ্গলবার এই আদেশ দেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল। সাগর-রুনি পরিবারের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
আজকের আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেন, টাস্কফোর্সের দেয়া ২৭ পৃষ্ঠার অগ্রগতি প্রতিবেদন মঙ্গলবার রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে উপস্থাপন করে। তবে ২০১২ সালে দায়িত্বে থাকা তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সে সময় কী আলামত সংগ্রহ করা হয়েছিল, তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বর্তমান সরকার কাউকে রক্ষা করা বা তথ্য গোপন করতে চায় না। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই লক্ষ্য।
এদিকে, হাইকোর্টে জমা দেয়া টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলাটি তদন্তকালে পূর্ববর্তী তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ মোট ১৬৭ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন। এছাড়া বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তার সময় মোট ৯০ জন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ জনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহের কারণে একজনকে হত্যার পর অপরজন আত্মহত্যা করার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা যায়, দু’জনকে হত্যা করা হয়েছে। পেশাগত কারণে এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে এ ধরনের কোনো তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সাগরের কর্মস্থল মাছরাঙা টিভির সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে আলোচনা করে পেশাগত দিক থেকে তার সাথে কোনো ধরনের শত্রুতা বা বিরোধের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার প্লান্ট ২০১৫ সালে কার্যক্রম শুরু করে, যার নির্মাণকাজ ২০১৩ সালে শুরু হয়। তাদের মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে নির্মাণকাজ ও কার্যক্রম শুরু হওয়ায় সামিট গ্রুপের সাথে তাদের হত্যার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। অর্থ ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে কি-না, তদন্তকালে এই ধরনের কোনো তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। তাদের কোনো ধারকর্জ বা ব্যবসায়িক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায় নাই।
মামলার পূর্ববর্তী তদন্ত কর্মকর্তাগণ শেরেবাংলানগর, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি এবং কলাবাগান থানার ১৩০টি চুরি, ডাকাতি মামলায় গ্রেফতারকৃত ১৪৫ জন আসামির বিরুদ্ধে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যাপক তদন্ত করেছে। বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তার সময় ৪২ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম ঠিকানা পিসিপিআর যাচাই বাছাই করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থা ও বিটিআরসিসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা গ্রহণ করা হয়। এসব সন্দেহভাজন ব্যক্তির মধ্যে বেশ কয়েকজন আসামির গতিবিধি, চালচলন ও পূর্ব ইতিহাস গভীর ও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের মোটিভ এবং হত্যাকাণ্ডে কে বা কারা জড়িত, তা এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট করা যায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পিবিআই, সিআইডি, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও র্যাবের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স কর্তৃক অত্র মামলায় লুণ্ঠিত মোবাইল ফোন, ও দু’টি ল্যাপটপ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। ওই মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক ডিএমপি ডিবির মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম, সাবেক র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাওয়া যায়নি। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। সাংবাদিক রুমী নোমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। অন্য আরো অনেককে জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। উল্লিখিত ব্যক্তিগণকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হয়তোবা মামলার কোনো গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য কিংবা নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে।
হাইকোর্টে দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার সাথে আলোচনাকালে তারা প্রাথমিকভাবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সাথে সাবেক সেনাকর্মকর্তা জিয়াউল আহসান ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতা পেয়ে তদন্তপূর্বক যাচাই বাছাই করছে মর্মে জানান। তাদের প্রাথমিক তদন্ত শেষ হলে প্রাপ্ত তথ্যাদি পিবিআই এর তদন্তকারী কর্মকর্তাকে হস্তান্তর করবে মর্মে জানান।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া করা বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর ও রুনি। সাগর সে সময় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙা টিভিতে আর রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন। সাগর-রুনি হত্যার ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। প্রথমে এই মামলা তদন্ত করছিল শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ। চার দিন পর মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার ৬২ দিনের মাথায় ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টে ব্যর্থতা স্বীকার করে ডিবি। পরে আদালত র্যাবকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেন। ১২ বছর ৬ মাস ১৫ দিন পর র্যাবের কাছ থেকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন টাস্কফোর্সকে।
সূত্র : বাসস
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








