জামায়াত আমির, ডা: শফিকুর রহমান
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ শেষে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে আয়োজিত সমাপনী সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। নয়া দিগন্ত

সাত দফা দাবি মেনে না নিলে এক দফার আন্দোলন অনিবার্য হয়ে উঠবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের স্বার্থে, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনে এক দফার ডাক দিতে বাধ্য হবেন তারা। সাত দফা মেনে নিলে এক দফার প্রয়োজন হবে না।

Advertisement

শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া অভিমুখে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ শেষে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে আয়োজিত সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি আপনাদের দাবি নিয়ে। আমাদের কোনো দলীয় দাবি নেই, ১১ দলেরও কোনো দাবি নয়। আমরা যে সাত দফা দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছি, তা বাংলাদেশের আপামর জনগণের দাবি। বর্তমান সরকার জনগণকে অপমান করেছে। আমরা তার প্রতিবাদ জানাতে এখানে এসেছি।’

তিনি বলেন, ‘দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ রাজনীতিতে পরিবর্তন চেয়েছিল। তারা রাজনীতির নোংরা ধারাকে মাটিচাপা দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। ১ হাজার ৪০০’র বেশি সন্তান বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ফ্যাসিবাদের হাত থেকে নতুন বাংলাদেশ উপহার দিয়ে গেছে। কিন্তু সরকার কার্যত সেই শহীদদের সম্মান করছে না।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন, মানবিক ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের দলিল হচ্ছে গণভোট। অথচ সরকার গণভোটের রায় মানছে না। সংসদ নির্বাচনের ভোটকে বৈধ বলা হচ্ছে, কিন্তু গণভোটকে অবৈধ বলা হচ্ছে। একইসাথে অনুষ্ঠিত দুটি ভোটের একটি বৈধ আর অন্যটি অবৈধ হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘এক মায়ের যমজ দুই সন্তান—হয় দুইটাই বৈধ, না হয় দুইটাই অবৈধ। গণভোট অবৈধ হয় আর সংসদ নির্বাচনের ভোট বৈধ হয়—কী চমৎকার!’

সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি তুলে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘তারা দেশজুড়ে আন্দোলন করতে চাননি। জনগণের ভোটে সংসদ গঠনের পাশাপাশি একটি সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে সংসদে বসেই বিষয়টির সমাধান চেয়েছিলেন।’ কিন্তু কায়দা করে ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন দখল করে নেওয়ায় সরকার কাউকে পরোয়া করছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জনগণের রায়কে সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইতিহাসে যখনই জনগণের রায়কে অপমান করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী ও দলকে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। তাই সময় থাকতে জনগণের দাবি মেনে নেয়া উচিত।’

প্রয়োজনে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকা অভিমুখে আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘আজ আমরা ঢাকা থেকে লংমার্চ করে কুষ্টিয়া এসেছি। এক দফার প্রয়োজনে যদি কুষ্টিয়া থেকে ঢাকা যেতে হয়, আপনারা কি প্রস্তুত?’

আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘জনগণের অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে প্রয়োজনে জীবন যাবে, তবু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করব না। ইনশাআল্লাহ, জনগণের দাবি আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরব।’

কুষ্টিয়ার সন্তান আবরার ফাহাদের আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আপনাদের এক সন্তান আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দিয়ে জীবন দিয়েছে। এর মাধ্যমে সে প্রমাণ করেছে, সে দেশকে ভালোবাসে। আপনারাও নিশ্চয়ই দেশকে ভালোবাসেন, আমরাও দেশকে ভালোবাসি।’

সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘জনগণের ভোটাধিকার ও রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি অব্যাহত রাখলে জনগণই সরকারকে লাল কার্ড দেখাবে।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার আট মাস পার হওয়ার আগেই গুপ্তহত্যার ভয়াবহ পরিস্থিতি ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দর ইজারা দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশকে অন্য রাষ্ট্রের করদরাজ্যে পরিণত করার পাঁয়তারা চলছে।’ 

শহীদ আবরার ফাহাদের নামে প্রতিষ্ঠিত স্টেডিয়াম থেকে তিনি ঘোষণা দেন, ‘বাংলাদেশকে আর কখনো অন্য কোনো রাষ্ট্রের করদরাজ্যে পরিণত হতে দেয়া হবে না।’

বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে মামুনুল হক বলেন, ‘শেখ হাসিনার পর বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে। শেখ হাসিনা করেছিলেন উন্নয়নের গণতন্ত্র, আর তারেক জিয়া করতে চাইছেন কার্ডের গণতন্ত্র।’ ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড দিয়ে জনগণের ভোটাধিকারকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি মনে করেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড দিয়েই ৭০ শতাংশ জনগণের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাবেন, তাহলে মনে রাখবেন, জনগণের কাছেও একটি কার্ড আছে। সেই কার্ডের নাম লাল কার্ড। জনগণ পকেট থেকে লাল কার্ড বের করলে তারেক জিয়ার সরকার ক্ষমতার মসনদে থাকতে পারবে না।’

জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘যে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় ক্ষমতায় যাওয়ার পর অস্বীকার করে দলটি জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।’ জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বিএনপি আবারো দেশকে ফ্যাসিবাদের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে প্রায় দেড় হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং ৪০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। এত ত্যাগ ও সংগ্রামের পর নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার আট মাসের মধ্যেই আবার আন্দোলনে নামতে হবে, এমন পরিস্থিতি কেউ প্রত্যাশা করেনি।’

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের দিনই রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো সংস্কারের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দীর্ঘ নয় মাস ধরে ৩৩টি রাজনৈতিক দলের নেতারা বৈঠক করে ৮৪টি প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন।’ নির্বাচনের আগে গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিএনপি সেই গণভোটকে অবৈধ বলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ খন্দকার এ কে এম আলী মুহসিন। সঞ্চালনা করেন কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি অধ্যাপক সুজাউদ্দিন জোয়াদার।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ, সংসদ সদস্য আব্দুল গফুর, সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন, চুয়াডাঙ্গার সংসদ সদস্য মাসুদ পারভেজ রাসেল, অ্যাডভোকেট এনামুল হক, জাগপার মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, ডাকসুর জিএস ফরহাদ হোসেন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম এবং চাকসুর ভিপি ইব্রাহিম রনি। এ ছাড়া ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।