মধ্যপ্রাচ্যে কোণঠাসা মার্কিন বাহিনী
মধ্যপ্রাচ্যে কোণঠাসা মার্কিন বাহিনী

আল মায়াদিন 
ইরানের সাথে টানা সঙ্ঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, কূটনৈতিক অবকাঠামো ও বিমানবহরে নজিরবিহীন বিপর্যয় নেমে এসেছে। মার্কিন প্রতিরা সদর দফতর পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ তদারকি সংস্থা ইন্সপেক্টর জেনারেলের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে, তেহরানের পাল্টা আঘাতের মুখে মার্কিন সামরিক সমতা, ঘাঁটি ও অস্ত্র সম্ভার চরম সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কাল পর্যালোচনার ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে জানানো হয়, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্দানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ধ্বংস অথবা ব্যাপকভাবে তিগ্রস্ত হয়েছে। 
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, টানা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অস্ত্রের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরা পেণাস্ত্র ঘাটতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সিএনএনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সঙ্ঘাত শুরুর পর মার্কিন টিএইচএএডি (থাড) ব্যবস্থার প্রায় ৮০ শতাংশ এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধাংশ ব্যবহৃত হয়ে গেছে। মার্কিন শীর্ষ কমান্ডাররা ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছেন যে, তাদের প্রধান গোলাবারুদের মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে। ইরানি হামলায় অব্যাহত য়তি এড়াতে বাধ্য হয়ে সেন্ট্রাল কমান্ড তাদের কার্যক্রম পুনর্গঠন করছে। নিজেদের রসদ ও সেনাসদস্যদের সুরায় অনেক ঘাঁটি খালি করে স্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে। উদাহরণের খাতিরে, পরিস্থিতি বিবেচনায় ইরাক ও কুয়েত থেকে মার্কিন বাহিনীর জরুরি চিকিৎসা হেলিকপ্টার প্রত্যাহার করা হয়। ফলে আঘাতপ্রাপ্ত সেনাদের দ্রুত সরাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ সড়কপথ ব্যবহারের বিকল্প থাকছে না।
অন্য দিকে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর আঞ্চলিক সদর দফতরটি ইরানি  পেণাস্ত্র ও হামলায় গুঁড়িয়ে যাওয়ায় সেখান থেকে সামরিক সরবরাহ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হাং কাও এটিকে সম্পূর্ণ বিনাশ বলে উল্লেখ করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন নৌবাহিনী ভারত মহাসাগরের সুদূর ডিয়াগো গার্সিয়া দ্বীপে বিকল্প লজিস্টিক হাব গড়ে তোলে। তবে সুদূর দূরত্বের কারণে জ্বালানি ও রসদ পৌঁছানোর সময়সীমা বেড়ে ১৪ থেকে ১৮ দিনে দাঁড়িয়েছে। পারস্য উপসাগরে দীর্ঘ দিন ধরে মোতায়েন থাকা মার্কিন নাবিকদের জন্য এটি পরিস্থিতি আরো দুর্বিষহ করে তুলেছে, কারণ একই সাথে তারা যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি ইরানি সমুদ্রবন্দর অবরুদ্ধ করার প্রয়াসে যুক্ত রয়েছে। যুদ্ধের তিকর প্রভাব কেবল সামরিক অবকাঠামোর ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; আঞ্চলিক কূটনৈতিক দফতরেও লেগেছে বড় ধাক্কা। ওয়াশিংটনের প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন কূটনৈতিক ভবনে তি হয়েছে প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন ডলার। সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত কেবল সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনার খরচই ধরা হয়েছে ৩৩.৪ বিলিয়ন ডলার, যাতে য়তি মেরামতের অঙ্ক অন্তর্ভুক্ত নেই। জুলাইয়ে সিনেট শুনানিতে মার্কিন প্রতিরামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরান যুদ্ধের প্রাথমিক ব্যয় ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর কথা জানান, যা বাস্তবে আরো বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সময়ে স্টেট ডিপার্টমেন্টের হিসাব অনুযায়ী, গত ২ জুন পর্যন্ত তাদের প্রাথমিক তি হয়েছে ১১৩ মিলিয়ন ডলার, যা পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নে আরো বৃদ্ধি পাবে। 
পেন্টাগনের খতিয়ান মতে, যুদ্ধ চলাকালে ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কূটনৈতিক ভবনগুলো সরাসরি আক্রমণের শিকার হয়। মার্চ মাসের শুরুতে রিয়াদে মার্কিন ট্রাস্টি দূতাবাস ভবনে দু’টি ইরানি ড্রোন হামলায় সিআইএ স্টেশনসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত বিনাশ ঘটে। দুবাইয়ের মার্কিন কনস্যুলেটের সেবা ভবন ও কুয়েতে দূতাবাসের মূল কেন্দ্রও একই মাসে তিগ্রস্ত হয়ে সব ধরনের স্বাভাবিক কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়, যা পরবর্তীতে জুনের শেষার্ধে জরুরি সেবার জন্য আবার সচল করা সম্ভব হয়। সবচেয়ে বেশি ধাক্কা লেগেছে ইরাকে, যেখানে ৬০০টির বেশি হামলার কারণে য়তির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫৭ মিলিয়ন ডলার। ইরানের ধারাবাহিক আক্রমণে নিরাপত্তাহীনতায় অঞ্চলটিতে মার্কিন মূল জনবল উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে অন্তত সাড়ে ৩ হাজার কূটনৈতিক কর্মকর্তা ও তাদের আত্মীয়স্বজন মধ্যপ্রাচ্য ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বাহরাইন, ইরাক, জর্দান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপ্রয়োজনীয় কর্মী সরাতে বাধ্য হয় স্টেট ডিপার্টমেন্ট। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি মার্কিন দূতাবাস চরম সীমাবদ্ধতা রা করে আংশিক সেবা প্রদান করছে।
এমন পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মাঝে শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ীভাবে সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনা হবে কি না, তা নিয়ে চলছে আলোচনা। বর্তমানে ওই অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করলেও ট্রাম্প প্রশাসন সঙ্কট থেকে উত্তরণের সুনির্দিষ্ট এক্সিট প্ল্যান দেখাতে পারেনি। পেন্টাগন ও গোয়েন্দা মহল গোপন বৈঠকে কর্মী কমানোর চিন্তা করছে, কারণ ইরানি দূরপাল্লার পেণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মার্কিন আকাশ প্রতিরার ফাঁকফোকর ফুটিয়ে তুলেছে। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলমান এই সংঘর্ষে এরই মধ্যে অন্তত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত ও প্রায় ৮০০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। সামরিক অবকাঠামোর বাইরে পেন্টাগন এবং মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস বিশাল বিমান য়তির বিবরণ তুলে ধরেছে। প্রাপ্ত রিপোর্ট অনুসারে, সংঘাত শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধশতেরও বেশি যুদ্ধ বিমান তিগ্রস্ত বা চিরতরে বিনষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪টি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল ধ্বংস হওয়া এবং একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া। পাশাপাশি একটি এ-১০ অ্যাটাক এয়ারক্রাফট সম্পূর্ণ তিগ্রস্ত হয়েছে। 
রিপোর্টে আরো দেখা যায়, আকাশে জ্বালানি ভরার কাজে নিয়োজিত ৭টি কেসি-১৩৫ বিমান তিগ্রস্ত বা ধ্বংস করা হয়েছে। য়তির তালিকায় আরো রয়েছে একটি ই-৩ এওয়াক্স বিমান ও একটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ হেলিকপ্টার। মার্কিন বাহিনীর নিজস্ব পরিচালনগত ভুলের কারণে চারটি এএইচ-৬ হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে। এগুলো ছাড়া একটি এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি, একটি এমএইচ-৬০, একটি এমকিউ-৪সি নেভাল ড্রোন ও ৩০টির বেশি সর্বাধুনিক এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ধ্বংসের খাতায় যুক্ত হয়েছে। পেন্টাগনের এই রিপোর্ট বিশ্বজুড়ে ওয়াশিংটনের সামরিক ও রাজনৈতিক সমতার গভীর সঙ্কটকেই বিশ্ব দরবারে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।