
মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে—প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এমন স্বীকারোক্তি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এসব অস্ত্র ‘মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ’ বা স্পেস কন্ট্রোল মিশনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স বা মহাকাশ বাহিনী।
মার্কিন বিমানবাহিনীর সচিব ট্রয় মেইঙ্ক সোমবার এ কথা জানান। একই সাথে কক্ষপথে মোতায়েন এসব অস্ত্রের মিশন সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য দিয়েছে স্পেস ফোর্স। টিডব্লিউজেড জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে মহাকাশভিত্তিক অস্ত্র বরাবরই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় ছিল। কয়েক দশক ধরে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে এ ধরনের সক্ষমতা কতটা রয়েছে, তা নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও প্রকাশ্যে খুব কমই বলা হয়েছে।
মেইঙ্ক এ ঘোষণা দেন এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার সম্মেলনে। তিনি বলেন, ‘আজ আমরা নিশ্চিত করছি যে, মহাকাশে আমাদের স্বার্থের প্রতি হুমকি যেখান থেকেই আসুক, তা মোকাবিলার জন্য আমরা প্রস্তুত রয়েছি। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন কক্ষপথে এমন মহাকাশ নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র রয়েছে, যা শত্রুর হামলা থেকে যৌথ বাহিনীকে রক্ষা করতে সক্ষম।’
বক্তব্যের পর প্রশ্নোত্তর পর্বে মেইঙ্ককে এসব অস্ত্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘ওই কথাটা খুব ভেবেচিন্তেই বলা হয়েছে। তাই আগে যা বলেছি, এখনো সেটাই বলছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘শুধু আকাশে নয়, মহাকাশেও আমাদের আধিপত্য ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছি, যাতে হুমকির মুখে পড়লে তা মোকাবিলা করতে পারি।’
টিডব্লিউজেডসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে পরবর্তী এক গোলটেবিল বৈঠকে মেইঙ্ক বলেন, ‘অস্ত্রের ধরন সম্পর্কে আমি নির্দিষ্ট করে কিছু বলব না।’ তিনি বলেন, সামরিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি বেসামরিক জীবনেও মহাকাশের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। তাই সেখানে আধিপত্য ধরে রাখা প্রয়োজন।
কেন এখন এ তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রতিরোধের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা কী করছি, তার বিস্তারিত প্রকাশ করলে সেই প্রতিরোধ ক্ষমতা বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তিনি আরো বলেন, অস্ত্রগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, কীভাবে ব্যবহার করা হবে—এসব বিষয়েও তিনি কিছু বলবেন না।
এরপর টিডব্লিউজেডের প্রশ্নের জবাবে স্পেস ফোর্সের এক মুখপাত্র বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সব ক্ষেত্রে যৌথ বাহিনীকে সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষা দেয়ার দীর্ঘদিনের নীতি অনুসরণ করে।’ তিনি জানান, বিদ্যমান হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়ানো হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কক্ষপথে এমন মহাকাশ নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র রয়েছে, যা শত্রুর হামলা থেকে যৌথ বাহিনীকে রক্ষা করতে সক্ষম।
মুখপাত্র বলেন, মহাকাশ নিয়ন্ত্রণের আওতায় মহাকাশ ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামরিক কার্যক্রম রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে শত্রুর সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করা, দুর্বল করা এবং প্রয়োজনে ধ্বংস করার জন্য ধ্বংসাত্মক ও অ-ধ্বংসাত্মক উভয় ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। এসব সক্ষমতা আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক—দুইভাবেই ব্যবহার করা সম্ভব।
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইন, ১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি এবং সশস্ত্র সংঘাতের আইন মেনে পরিচালিত হয়।
১৯৬৭ সালে কার্যকর হওয়া আউটার স্পেস ট্রিটি যুক্তরাষ্ট্রসহ স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে কক্ষপথে পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন থেকে বিরত রাখে। তবে প্রচলিত অস্ত্র মোতায়েনের ওপর এ চুক্তিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
টিডব্লিউজেড পরে জানতে চায়, স্পেস ফোর্স কি কক্ষপথে বর্তমানে ভৌত অস্ত্র, যেমন শত্রুর উপগ্রহ ধ্বংস বা বাধা দেয়ার যন্ত্র, এবং অ-ধ্বংসাত্মক সক্ষমতা, যেমন ইলেকট্রনিক যুদ্ধের জ্যামার—দুই ধরনের অস্ত্রই থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করছে কি না। জবাবে মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কক্ষপথে এমন মহাকাশ নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র থাকার কথা নিশ্চিত করছে, যা শত্রুর হামলা থেকে যৌথ বাহিনীকে রক্ষা করতে পারে। তবে অস্ত্রের কার্যপদ্ধতি, পেলোড, কারিগরি বৈশিষ্ট্য বা ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে তারা কিছু বলবে না।
কক্ষপথে একটি মহাকাশযান অন্যটিকে আক্রমণ বা কোনো হামলা ঠেকানোর বিভিন্ন উপায় রয়েছে। সব ক্ষেত্রেই ধ্বংস বা স্থায়ী ক্ষতি ঘটানো জরুরি নয়। লেজার দিয়ে কোনো উপগ্রহের ক্যামেরা সাময়িকভাবে অন্ধ করে দেয়া যেতে পারে। ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মাধ্যমে কোনো হুমকিকে সাময়িকভাবে অকার্যকর করা সম্ভব। আবার প্রয়োজন হলে ভৌত প্রতিরোধক, গ্র্যাপলিং আর্ম, উপগ্রহের অপটিকস বা সৌরপ্যানেলে ছিটানো রাসায়নিক পদার্থ কিংবা একটি উপগ্রহকে অন্যটির সাথে সংঘর্ষে ব্যবহার করে ধ্বংসও করা যেতে পারে।
মহাকাশবিরোধী অস্ত্র শুধু মহাকাশে থাকা অস্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর মাটি থেকে উৎক্ষেপণ করা অ্যান্টি-স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্র এবং বায়ুমণ্ডলের ভেতর থেকে পরিচালিত অন্যান্য সক্ষমতাও এর অন্তর্ভুক্ত। আজকের ঘোষণার আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী যে অ্যান্টি-স্যাটেলাইট অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার করেছিল, সেগুলো ছিল ভূমিভিত্তিক ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা।
২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংসাত্মক সরাসরি-উৎক্ষেপণ অ্যান্টি-স্যাটেলাইট অস্ত্রের পরীক্ষা বন্ধ রাখার স্বেচ্ছা নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছিল। তবে অন্য উপায়ে এসব সক্ষমতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এমনকি ওই নীতি এখনো কার্যকর আছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা উদ্যোগের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাগুলোর একটি হলো নতুন মহাকাশভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক মোতায়েন।
মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা যে এখন মার্কিন সামরিক অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। আগাম সতর্কতা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অস্ত্র পরিচালনা এবং প্রায় তাৎক্ষণিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই এসব সক্ষমতার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরশীল। একই সময়ে চীন ও রাশিয়া ক্রমেই শক্তিশালী অ্যান্টি-স্যাটেলাইট সক্ষমতা তৈরি ও মোতায়েন করছে। বিশেষ করে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে। এতে মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আধিপত্য ক্ষয় হচ্ছে এবং মার্কিন বাহিনীর সামনে নতুন হুমকি তৈরি হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস কমান্ডের প্রধান জেনারেল স্টিফেন হোয়াইটিং আগস্টে বলেন, মহাকাশে কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই। সেখানে কোনো পরিখা খোঁড়া বা ঢাল তৈরি করা যায় না। ফলে যুদ্ধ শুরু হলে প্রতিপক্ষের অস্ত্রের আওতার মধ্যে থাকা উপগ্রহগুলোকে টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি তখন বলেছিলেন, মহাকাশে শত্রুর সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করার মতো ‘বিশ্বাসযোগ্য ও স্বীকৃত’ ব্যবস্থা থাকা শত্রুর হামলা ঠেকানো এবং কক্ষপথে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
স্পেস ফোর্সের কমব্যাট ফোর্সেস কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল গ্রেগরি গ্যাগননও এর আগে টিডব্লিউজেডকে বলেছিলেন, শুধু উপগ্রহকে রক্ষা ও প্রতিরক্ষা করলেই মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তার ভাষায়, ‘আপনি চিরকাল কোনো দুর্বৃত্তের কাছ থেকে পালিয়ে থাকতে পারবেন না। কখনো কখনো ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘুষি মারতেও হয়।’ অর্থাৎ প্রতিরক্ষার পাশাপাশি আক্রমণের সক্ষমতাও প্রয়োজন।
মেইঙ্কের আজকের বক্তব্য গ্যাগননের ওই মন্তব্যকে নতুন তাৎপর্য দিয়েছে। তবে কক্ষপথে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী ধরনের অস্ত্র মোতায়েন করেছে, তা এখনো অজানা।
মহাকাশে অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। কারণ মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ ও অন্যান্য ব্যবস্থা এখন দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যাহত হলে অর্থনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে মেইঙ্ক এ ধরনের উদ্বেগের জবাবে চীন ও রাশিয়ার অ্যান্টি-স্যাটেলাইট অস্ত্র উন্নয়নের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এই কক্ষে কি এমন কেউ আছেন, যিনি মনে করেন না যে চীনা ও রুশরা এ ধরনের অস্ত্র তৈরি করছে? আমরা নিজেদের সুরক্ষিত রাখা এবং ওই পরিবেশে কার্যক্রম চালাতে পারার বিষয়টিতেই মনোযোগ দিচ্ছি।’
সব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—পৃথিবীর বাইরের মহাকাশে হুমকির পরিধি বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র শুধু কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনাই করছে না, এরই মধ্যে সেখানে অন্তত কিছু অস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।







