ডেঙ্গু
বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ ও ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) যৌথ আয়োজনে জনস্বাস্থ্য সংলাপ অনুষ্ঠিত ছবি: নয়া দিগন্ত

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে একটি নির্দিষ্ট মৌসুমে সীমাবদ্ধ না রেখে একটানা পাঁচ বছর ধরে কাজ করতে হবে। ডেঙ্গুর প্রজনন ও বিস্তার রোধে প্রান্তিক পর্যায়ে কমিউনিটিভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কাজ করতে হবে। এ কাজে স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের কাজ করতে হবে। এ কাজ যেন কেবল ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। কলকাতার মেয়র এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কলকাতায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ব্র্যাক টাওয়ারে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ ও ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) যৌথ আয়োজনে একটি জনস্বাস্থ্য সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানেই বক্তারা উপরোক্ত কথাগুলো বলেন। এটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের উপদেষ্টা ড. ইয়াসমিন আহমেদ। 

এ সময় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন প্রশ্ন করেন, অবহেলার কারণে সবাই দেরিতে হাসপাতালে আসে কি না। একজন প্রান্তিক মানুষ গ্রাম থেকে শহরে চিকিৎসার জন্য যেতে পারে না। দরিদ্র মানুষ যখন হাসপাতালে যান তখন প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তাকে আরো ‘খারাপ অবস্থা’ হলে তারপর হাসপাতালে আসতে বলা হয়। আবার গ্রামের হাসপাতালেও মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয় না প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই বলে। প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা পায় না বলেই একজন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মানুষ দ্রুত চিকিৎসা নিতে যায় না। আমার মতে, কমিউনিটিভিত্তিক জ্বরের স্ক্যানিং করে সরকারের পক্ষ থেকেই ডেঙ্গুর চিকিৎসার প্রসারে কাজ করতে হবে।

ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ২০১৯ সালে আমি ডেঙ্গুকে মহামারী হিসেবে ঘোষণা করতে সরকারকে আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার তা ঘোষণা দিতে চায় না। কোনো সরকার তা স্বীকার করতে চায় না।

সংলাপে গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত বলেন, সহজে মানুষকে বোঝানোর জন্য এই বইটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে এসে আমরা এতো উন্নত অবকাঠামো তৈরি করছি কিন্তু আমরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। এ বছর মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২০০ কোটি টাকা বাজেট করেছে। কিন্তু আমরা কেউ জানি না এ টাকা কোথায় যাচ্ছে? তারা কিভাবে এবং কোথায় এ টাকা খরচ করছে। মশার কাছে আগের সব সরকার পরাজিত হয়েছে, বর্তমান সরকারও পরাজিত হতে চলেছে। সরকার চেষ্টা করলে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। আমাদের এখানে মশা হলো সুশাসনের সমস্যা, এটি কোনো মশার নিয়ন্ত্রণের সমস্যা নয়।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহ্রুখ মহিউদ্দীন বলেন, ইউপিএল সাধারণত শিক্ষা ও গবেষণামূলক বই প্রকাশ করে থাকে। তারমধ্যে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে এ ধরনের বই করেছি। 

সংলাপের সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের আহ্বায়ক ড. আহমেদ মোশতাক রাজা চৌধুরী বলেন, সময়োপযোগী উদ্যোগ এই বইটি। ড. বাশার এ বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেছেন। আগে মনে হতো ডেঙ্গু কেবল শহরের সমস্যা। কিন্তু এখন ডেঙ্গু একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এমন হওয়ার কথা ছিল না। এ সমস্যা চিহ্নিত করে সারা বছর ধরে কাজ করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ২৭ বছর ধরে মশা নিয়ে গবেষণা করছি। প্রথম ২০০০ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হলে কাজ শুরু করি। 

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো দেশে ডেঙ্গু নিয়ে এতো মানুষের মৃত্যুর খবর নাই। হাসপাতালে দেরিতে ভর্তি হওয়াও মৃত্যুর একটি বড় কারণ। অসচেতনতার জন্য দেরিতে ভর্তি হয়। নারীদেরও মৃত্যুর হার বেশি এ কারণে। জ্বর সেরে গেলেই মূল সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখতে হবে। 
তিনি বলেন, এ বইটি সাধারণ মানুষের জন্য লেখা হয়েছে। এই বইটি দেশের প্রতিটি ঘরে একটি করে থাকলে এবং পড়ে কাজ করলে ডেঙ্গু কমতে পারে। 

ড. বাশার বলেন, এতো দীর্ঘ সময় ধরে সিটি করপোরেশন কাজ করছে তবু কমছে না কেন? সিটি করপোরশেন একা এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। ফগিং আর লার্ভিসাইডিং করে এডিস মশা মরবে না। আর সিঙ্গাপুরের মডেলও বাংলাদেশে কাজ করবে না। এখানকার ডেঙ্গু সমস্যার সমাধানে স্থানীয়ভাবে উপযোগী মডেল লাগবে।

প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল বলেন, সরকার ও নাগরিকেরা কী করবেন তা এ বইয়ে আছে, কিন্তু জনস্বাস্থ্যবিদরা কী করবেন তা উল্লেখ নাই। তবে তাদের কাজের পরিধি অনেক বেশি। মিডিয়াকর্মীরা কী করবেন তা নিয়ে আলোচনা করা হয়নি। ২০১৭ সালে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যে নির্দেশনা দেয়, সেগুলো বাংলা করে অনুবাদ করে কাজ করলেও এ সমস্যা সমাধান করা যেত।

ডা: হালিদা হানুম আখতার বলেন, ডিজি হেলথের পক্ষ থেকে এই মুহূর্তে এই বইটি যেন কিনে নেয় এবং এসব বক্তব্য বিভিন্ন প্রচারপত্র, পোস্টার করে ছড়িয়ে দিতে হবে। বর্তমানের করণীয় এবং ভবিষ্যতের করণীয় ঠিক করতে হবে। এ ছাড়া যে কোনো অসুস্থতায় নারীরা বেশি ক্ষতির শিকার হয়। ডেঙ্গুতেও আক্রান্ত নারীর জন্য বিশেষ সচেতনতার কাজ করতে হবে।

ফ্যামিলি মেডিসিন ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: এম এইচ চৌধুরী লেলিন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে অনেক বেশি প্রদর্শনবাদী কাজ করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু বিষয়ক সচেতনতা বাড়ানো বিষয়গুলো এই বইয়ে লিপিবদ্ধ করার কাজ করেছেন লেখক। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর যে হিসেব দেখানো হয় তা একটি বিশাল অংশের সামান্য অংশমাত্র। সরকারের বেশিরভাগ রিপোর্টে কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশের লিপিবদ্ধ হয়, বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতালের আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা লিপিবদ্ধ হয় না।