
লিওনেল মেসি ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে অভিষিক্ত হওয়ার সময় আলবিসেলেস্তারা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অবস্থানে। ১৯৯৩ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের পর তারা আর কোনো বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিততে পারেনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলের শীর্ষে নিজেদের জায়গা পুনরুদ্ধারের জন্য তাদের বছরের পর বছর সংগ্রাম করতে হয়েছে।
দুই দশকেরও বেশি সময় পর মেসি এমন এক যুগের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে বিদায় নিচ্ছেন, যে সময়ে আর্জেন্টিনা জিতেছে ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা, ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা। এ ছাড়া ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালেও উঠেছে তারা। গত ৩১ আগস্ট মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। বেনিনের বিপক্ষে আজকের ম্যাচ দিয়ে বিদায় নিয়েছেন এক জীবন্ত কিংবদন্তির।
বেদনাদায়ক হার থেকে সাফল্যের কাঠামো
পরিবর্তনটা অবশ্য রাতারাতি আসেনি। মেসিকে নিয়ে আর্জেন্টিনা হেরেছে ২০০৭ কোপা আমেরিকা, ২০১৪ বিশ্বকাপ এবং ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে।
বড় পরিবর্তন আসে লিওনেল স্কালোনি এবং এমন এক প্রজন্মের অধীনে, যারা শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে শিরোপায় রূপ দিতে সক্ষম হয়। তবে মেসি যুগে আর্জেন্টিনার রূপান্তর শুধু মাঠেই হয়নি।
এএফএ’র এজেইজা প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্সে ব্যাপক আধুনিকায়ন করা হয়। খেলোয়াড়দের শয়নকক্ষ, খাবারের জায়গা, ড্রেসিংরুম, জিম, চিকিৎসা সুবিধা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র সংস্কার করা হয়। অনুশীলন বিশ্লেষণের জন্য যুক্ত করা হয় নতুন প্রযুক্তিও।
২০২৩ সালে কমপ্লেক্সটির নাম রাখা হয় লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। একইসাথে জাতীয় দলের আবাসন ব্যবস্থা, উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা এবং একটি অডিটোরিয়াম তৈরির পরিকল্পনাও নেয়া হয়।
এরপর নতুন প্রাকৃতিক ঘাসের মাঠ তৈরি এবং যুব দলের সুযোগ-সুবিধারও সংস্কার করা হয়। আর্জেন্টাইন ফুটবল এসোসিয়েশস (এএফএ) ২০২৫ সালে জানিয়েছিল, ২০১৭ সাল থেকে এজেইজায় ৮০টিরও বেশি নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় সিনিয়র দলের জন্য ৪৫০ বর্গমিটারের নতুন দোতলা জিম তৈরির কাজ শুরু হয়।
নতুন প্রজন্ম ইতোমধ্যেই উঠে আসছে
নতুন প্রজন্ম ইতোমধ্যেই উঠে আসছে। মাঠেও আর্জেন্টিনার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। বর্তমানে ২২ বছর বয়সী নিকো পাজ আর্জেন্টিনার ২০২৬ বিশ্বকাপ দলে ছিলেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে কোমোর হয়ে ১২ গোল ও সাতটি অ্যাসিস্ট করার পর তিনি সিরি-আ’র সেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। সম্প্রতি বলিভিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৪-০ গোলের জয়েও তিনি গোল করেছেন।
ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুনো সম্প্রতি বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে নিজের প্রথম সিনিয়র আন্তর্জাতিক গোল করেছেন। অন্যদিকে ১৯ বছর বয়সী বোকা জুনিয়র্সের ফরোয়ার্ড লিওনেল ফ্লোরেস ইতোমধ্যেই স্কালোনির দলে ডাক পেয়েছেন এবং বিশ্বকাপ-পরবর্তী নতুন পর্বে মাঠেও নেমেছেন।
আরেক উদাহরণ ১৯ বছর বয়সী বোকা মিডফিল্ডার তোমাস আরান্দা। জুনে হন্ডুরাসের বিপক্ষে তার আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে অভিষেক হয়। জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি, ভ্যালেন্তিন বারকো ও ম্যাক্সিমো পেরোনে-র মতো খেলোয়াড়রাও বৃহত্তর নবায়ন প্রক্রিয়ার অংশ।
মেসি যুগের প্রকৃত উত্তরাধিকার
আর্জেন্টিনা এমন একজন খেলোয়াড়কে হারাচ্ছে, যাকে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। তবে মেসি যে জাতীয় দলটি রেখে যাচ্ছেন, সেটি তিনি যে দলে যোগ দিয়েছিলেন তার তুলনায় কাঠামোগত ও প্রতিযোগিতামূল, দুই দিক থেকেই সম্পূর্ণ আলাদা।
এখন আর্জেন্টিনার রয়েছে চ্যাম্পিয়নশিপজয়ী একটি মূল দল, প্রতিষ্ঠিত কোচিং কাঠামো, উন্নত উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন অবকাঠামো, যুব ও সিনিয়র দলের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ এবং সুযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা একঝাঁক তরুণ খেলোয়াড়।
মেসি-পরবর্তী যুগের আসল চ্যালেঞ্জ হবে ‘পরবর্তী মেসি’ খুঁজে বের করা নয়। বরং দেখতে হবে, মেসিকে ঘিরে যে কাঠামো ও ভিত্তি গত কয়েক বছরে তৈরি হয়েছে, তা কি আর্জেন্টিনাকে বিশ্বের সেরাদের কাতারে ধরে রাখতে পারে কিনা। বিশেষ করে যখন তার ইতিহাসের এত বড় অংশজুড়ে থাকা সেই খেলোয়াড়টি আর মাঠে থাকবেন না।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








