ভারতের গণতন্ত্র,  মুসলমান, ব্যর্থ করেছে, কারাবন্দি,  বিতর্ক,
ভাইয়ের বিয়েতে যোগ দিতে ১১ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর আবার দিল্লির তিহার কারাগারে ফিরছেন শারজিল ইমাম। আল জাজিরা

ভারতের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র কি দেশটির সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, প্রায় ২০ কোটি মুসলমানের অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে? দেশটিতে এখন এই প্রশ্ন ঘিরেই তীব্র বিতর্ক চলছে। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন কারাবন্দি ৩৮ বছর বয়সী মুসলিম পণ্ডিত শারজিল ইমাম। কারাগারে বসে দেয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ভারতের জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তিনি। তার বক্তব্য ঘিরে ভারতজুড়ে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি যুক্তি ও বিতর্ক।

Advertisement

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আল জাজিরায় হ্যাজ ইন্ডিয়াজ ডেমোক্রেসি ফেইল্ড ইটস মুসলিমস? জেইল্ড স্কলার ট্রিগারস ডিবেট শীর্ষক নিবন্ধে  এ প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। তার লেখা থেকে জানতে পারি. গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য কুইন্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইমাম দেশটির মুসলিম সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলেছেন। ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ২১ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ। ইমামের ভাষায়, ‘ভারতে প্রায় ২১ কোটি মুসলমানের বসবাস। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও এই গণতন্ত্রে তাদের কার্যত কোনো কথা বলারই সুযোগ নেই।’

ভারতের সংবিধানে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রাখার ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি দেশটির ধর্মনিরপেক্ষতার ধরনকে ‘বিশেষভাবে ইসলামবিদ্বেষী ও সংকীর্ণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, গণতন্ত্রের নামে মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

কে এই শারজিল ইমাম

ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্য বিহারের জাহানাবাদ জেলার বাসিন্দা শারজিল ইমাম। মুম্বাইয়ের মর্যাদাপূর্ণ ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক করার পর সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন তিনি। পরে আবার পড়াশোনায় ফিরে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয়ে পিএইচডি শুরু করেন। তার গবেষণার প্রধান বিষয় ছিল ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক ইতিহাস।

২০১৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার কয়েক মাস পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকার নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাস করে। ওই আইনে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসা অমুসলিম শরণার্থীদের দ্রুত নাগরিকত্ব দেয়ার সুযোগ রাখা হয়। জাতিসংঘ আইনটিকে মুসলমানদের প্রতি ‘মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক’ বলে আখ্যা দেয়।

‘ভারতে প্রায় ২১ কোটি মুসলমানের বসবাস। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীগুলোর

একটি হওয়া সত্ত্বেও এই গণতন্ত্রে তাদের কার্যত কোনো

কথা বলারই সুযোগ নেই’

আইনটি পাসের পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। মুসলমানদের নেতৃত্বে, বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণে, দিল্লির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ঘনবসতিপূর্ণ মুসলিম অধ্যুষিত শাহিনবাগে কয়েক সপ্তাহ ধরে অবস্থান কর্মসূচি চলে। আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন ইমাম। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আন্দোলনে দেয়া বক্তব্যের মাধ্যমে সহিংসতায় উসকানি দেয়ার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে ইমাম গ্রেপ্তার হওয়ার আগে সেখানে কোনো সহিংসতা ঘটেনি। পরের মাসে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় সিএএর বিরুদ্ধে চলা অবস্থান কর্মসূচিতে হামলা চালায় উগ্র জনতা। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতাদের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের পর এসব হামলার ঘটনা ঘটে।

দেয়াল লিখনে মুক্তির দাবি

সহিংসতা শুরুর সময় ইমাম কারাগারে থাকলেও তার বিরুদ্ধে দাঙ্গা, হত্যা, হত্যাচেষ্টা, রাষ্ট্রদ্রোহ এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর আইনসহ একাধিক আইনে তার বিচার চলছে। একই ঘটনায় জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষক উমর খালিদসহ প্রায় এক ডজন মুসলিম শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে তাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। বিচার ছাড়াই তারা এখনো কারাগারে রয়েছেন। বারবার জামিনের আবেদন নাকচ হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাদের দীর্ঘদিনের কারাবাসকে ক্ষমতার ‘চরম অপব্যবহার’ এবং এমন এক বিচারিক ব্যবস্থার উদাহরণ বলে আখ্যা দিয়েছে, যেখানে প্রমাণের আগে অভিযুক্তকেই অপরাধী ধরে নেয়া হচ্ছে।

ইমামের মতে, বিশেষ করে মুসলমানদের লক্ষ্য করে ক্ষমতার এমন অপব্যবহার বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ভারতের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এর শিকড় বিস্তৃত।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও হিন্দুত্ববাদ একই ধারার?

দ্য কুইন্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধীকেও ‘ফ্যাসিবাদী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ইমাম। তার অভিযোগ, গান্ধী স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া কংগ্রেসকে মূলত একটি হিন্দু দল হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। একইসাথে এমন কিছু ধারণা ও চর্চাকে সমর্থন করেছিলেন, যা এখন মোদির বিজেপি এবং দলটির আদর্শিক অভিভাবক কট্টর ডানপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) সামনে নিয়ে আসছে।

১৯২৫ সালে ইউরোপের ফ্যাসিবাদী দলগুলোর আদলে প্রতিষ্ঠিত আরএসএসের লক্ষ্য হলো সংবিধান অনুযায়ী ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে একটি জাতিগত হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা।

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুরও সমালোচনা করেছেন ইমাম। তার অভিযোগ, নেহরু ‘দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ বইয়ে ভারতকে প্রাচীন ও ‘বিশেষভাবে সহনশীল’ সভ্যতা হিসেবে তুলে ধরতে গিয়ে ইতিহাস নিয়ে ভুল ধারণা ও মিথ তৈরি করেছেন।

তবে সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী উদারপন্থীদের। তার মতে, তাদের সাথে বিজেপি ও আরএসএসের সমর্থকদের মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। ইমামের ভাষায়, ‘সংক্ষেপে বললে, ধর্মনিরপেক্ষতা ও হিন্দুত্ববাদ—দুই ধারার মূল ধারণা একই। উভয়েই একরূপতার মিথ, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে অস্বীকৃতি জানায়।’

ইমামের বক্তব্যের জবাবে আইনবিদ মোহাম্মদ জিশান আহমদ দ্য কুইন্টে লিখেছেন, ইমাম ভারতের ইতিহাস ও আদর্শ নিয়ে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন, যা তার বিরুদ্ধে মামলা চলছে বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তবে ধর্মনিরপেক্ষতা ও হিন্দুত্ববাদকে একই পাল্লায় মাপার যুক্তি তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

আহমদের মতে, ইমামের বক্তব্যে মুসলমানদের একটি অভিন্ন রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরার ঝুঁকি রয়েছে। এতে শ্রেণি, বর্ণ, লিঙ্গ, অঞ্চল ও আদর্শগত পার্থক্যগুলো আড়ালে থেকে যায়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, মুসলমানদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত সুবিধাবঞ্চিত পশমান্দা জনগোষ্ঠীর অবস্থান কোথায়? মুসলিম সমাজের নারীদের অধিকার ও লিঙ্গসমতার প্রশ্নই বা কোথায়? পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর হয়ে কথা বলার অধিকার কার?

তবে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইরফান আহমদ ইমামের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশের সাথে একমত। দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলমানদের অবস্থান নিয়ে একাধিক প্রশংসিত বইয়ের লেখক ইরফান আল জাজিরাকে বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে কি না, তা নিয়ে ইমামের প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

উমর খালিদ

তার মতে, ভারতের জাতীয়তাবাদের প্রচলিত বয়ানে কংগ্রেসের নেহরু-গান্ধীর ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদকে একদিকে এবং ডানপন্থী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে অন্যদিকে দাঁড় করানো হয়। কিন্তু শুরু থেকেই কংগ্রেসের ভেতরে হিন্দু জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদী শক্তির উপস্থিতি ছিল। কংগ্রেস ও প্রকাশ্য হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর মধ্যে নেতাদের যাতায়াতও ছিল স্বাভাবিক। উদাহরণ হিসেবে তিনি লালা লাজপত রায়, কে এম মুন্সি, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ও মদন মোহন মালব্যের নাম উল্লেখ করেন। আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা কে বি হেডগেওয়ারও একসময় কংগ্রেসের সাথে যুক্ত ছিলেন।

ইরফান আহমদের মতে, কংগ্রেস ও বিজেপির পার্থক্য অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের পার্থক্যের মতো। দুই দলই শেষ পর্যন্ত ‘মার্কিন স্বার্থ’ এগিয়ে নিতে এবং দেশের বাইরে যুদ্ধ চালাতে একমত হয়। ভারতের মুসলমানদের সমস্যাও শুধু দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বামপন্থী দলসহ ভারতের সব রাজনৈতিক দল কমবেশি ভারতীয় বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের ধারণা মেনে চলে।

তিনি বলেন, কোনো গণতন্ত্রে যদি একটি জনগোষ্ঠী নিয়মিতভাবে আইনসভায় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে অদৃশ্য হয়ে যায়, তাহলে সেই গণতন্ত্রের ভিত্তিতেই সমস্যা রয়েছে। ভারতের সংসদে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব ক্রমাগত কমে আসা তাদের কণ্ঠরোধেরই প্রমাণ।

মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে ইমামের প্রস্তাব

সাক্ষাৎকারে ইমাম ভারতের জন্য এমন এক ‘সাংবিধানিক প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করা হবে। তার দাবি, ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ ভাগ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে কংগ্রেসের জোরাজুরি ছিল।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে তিনি একজন ‘মহান গণতান্ত্রিক নেতা’ হিসেবে দেখেন। কবি ও দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবালকে নিজের রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা বলে মনে করেন। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ক্ষমতা ভাগাভাগির পক্ষে অবস্থান নিয়ে ইকবালের ‘ভারতের ভেতরে একটি মুসলিম ভারত’ প্রতিষ্ঠার ধারণার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।

ভারতের নির্বাচনে বর্তমানে প্রচলিত সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার ব্যবস্থার (এফপিটিপি) বদলে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব চালুর দাবি জানিয়েছেন ইমাম। তার বক্তব্য, ‘ইকবাল ও জিন্নাহ ঠিকই বুঝেছিলেন, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ছাড়া এই নির্বাচনী ব্যবস্থা মুসলমানদের স্থায়ীভাবে প্রান্তিক করে রাখবে। দেশভাগের আগেও উদীয়মান জাতীয়তাবাদী বয়ানে মুসলমানদের ঘৃণিত সংখ্যালঘু ও বহিরাগত হিসেবে দেখা হতো। ইতিহাস তাদের কথার সত্যতা প্রমাণ করেছে।’

ইমামের বক্তব্যের সমালোচনা করে দ্য প্রিন্টে ছদ্মনাম ব্যবহারকারী কলাম লেখক ইবনে খালদুন ভারতী তাকে ‘ইসলামপন্থী রাজনৈতিক কর্মসূচির’ প্রতিনিধি বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, ইমাম ভারতের সীমানার মধ্যে আরেকটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি তুলছেন।

তবে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইরফান আহমদ

ইমামের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশের সাথে একমত। দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলমানদের অবস্থান নিয়ে একাধিক প্রশংসিত বইয়ের

লেখক ইরফান আল জাজিরাকে বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে কি না,

তা নিয়ে ইমামের প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে

ভারতী ইমামকে উদারনীতি, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সংবিধানবিরোধী এবং এককথায় ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। তার যুক্তি, একটি জাতির নিজস্ব রাষ্ট্র প্রয়োজন, আর সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন সাংবিধানিক নিশ্চয়তা। তাত্ত্বিক বা বাস্তব কোনো অর্থেই একইসাথে একটি জনগোষ্ঠী জাতি ও সংখ্যালঘু—দুই পরিচয় বহন করতে পারে না। তার অভিযোগ, মুসলিম নেতারা নিজেদের জন্য একটি দেশ প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি সংখ্যালঘু হিসেবে বিশেষ সুবিধাও আদায় করেছেন।

দ্য টেলিগ্রাফে লেখা এক কলামে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলী ভারতীর এই যুক্তিকে অদ্ভুত এক পরিস্থিতি বলে উল্লেখ করেছেন। তার প্রশ্ন, যে ব্যক্তি সহিংসতার কোনো আহ্বান ছাড়াই সড়ক অবরোধের ডাক দেয়ার অভিযোগে ছয় বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন, তাকে কীভাবে এমন দাঙ্গার ষড়যন্ত্রকারী বলা যায়, যে দাঙ্গা শুরু হয়েছিল তার গ্রেপ্তারের এক মাস পর?

আলীর মতে, ইমামের মতো মুসলমানদের অভিজ্ঞতার মধ্যে শুধু ব্যক্তিগত বৈষম্য নয়, অতীতের সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞ, সন্ত্রাসবাদী মামলায় মুসলিম পুরুষদের ফাঁসানো এবং পুলিশের নির্যাতনের ইতিহাসও রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, গান্ধী ও জিন্নাহ সম্পর্কে ইমামের মূল্যায়ন গুরুতরভাবে বিকৃত এবং স্বাধীনতার আগের সময় ও ভরতভাগের ইতিহাস নিয়ে তার পাঠও যথাযথ নয়।

তারপরও আলীর মতে, ভারতের সবার সমতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চাওয়া একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ইমামের মতো মানুষের জায়গা থাকা উচিত। তার ধারণা, ইমাম মধ্যবিত্ত মুসলিম অধিকারকর্মীদের নিয়ে এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিতে চান, যারা মুসলমানদের দাবি ও অধিকার নিয়ে কথা বলবে এবং ধর্মীয় নেতাদের একচ্ছত্র প্রভাবের বাইরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করবে।

শারজিল ইমাম ও উমর খালিদ : দুই ধরনের মুসলিম নেতৃত্ব

ভারতের ভবিষ্যৎ মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের প্রশ্নে প্রায়ই শারজিল ইমাম ও উমর খালিদের তুলনা করা হয়। ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে দুজনকেই অভিযুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর একই কারাগারে রয়েছেন তারা। তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দুজনের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।

৩৯ বছর বয়সী উমর খালিদ বামপন্থী অধিকারকর্মী। ইমামের মতো তিনি ভারতের সংবিধান, গণতন্ত্র কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রচলিত ধারণাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন না। তার বক্তৃতা ও লেখায় প্রায়ই গান্ধী এবং তার অহিংস প্রতিরোধের দর্শনের উল্লেখ পাওয়া যায়।

ভারতের বামপন্থী ও উদারপন্থীরা খালিদকে একজন ‘আদর্শ মুসলিম’ হিসেবে তুলে ধরেন। তাদের মতে, মোদির সরকারের বিদ্বেষমূলক রাজনীতির বিরোধিতা করার কারণেই তাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও খালিদের মুক্তির দাবি উঠেছে।

তাদের মধ্যে রয়েছেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি। এ বছরের জুলাইয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা গ্লোবাল লিডারশিপ ফোরামে উদ্বোধনী বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি খালিদের কারাবাস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মামদানি বলেন, ‘দিল্লিতে উমর খালিদের বন্দিজীবনের ষষ্ঠ বছর শুরু হওয়া পর্যন্ত আমাদের কেন অপেক্ষা করতে হবে? মাদিবার বিরুদ্ধে আনা সন্ত্রাসবাদের সাজানো অভিযোগের মতো একই অভিযোগে তাকে রাজনৈতিক বন্দি করে রাখা হয়েছে।’

ভারতীয় বংশোদ্ভূত মামদানি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো খালিদের প্রসঙ্গ তুললেন। জানুয়ারিতে তিনি খালিদের মা-বাবার সাথে দেখা করেন এবং তার জন্য হাতে লেখা একটি চিঠি রেখে আসেন। তাতে লেখা ছিল, ‘প্রিয় উমর, তিক্ততাকে নিজের মধ্যে জায়গা না দেয়ার বিষয়ে আপনার কথাগুলো প্রায়ই আমার মনে পড়ে। আপনার মা-বাবার সাথে দেখা করে ভালো লেগেছে। আমরা সবাই আপনার কথা ভাবছি।’

গত মাসে আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স খালিদকে ২০২৬ সালের ঝুঁকিতে থাকা মানবাধিকারকর্মীদের পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দেয়।

কিন্তু ইমামের ক্ষেত্রে এমন আন্তর্জাতিক সংহতি দেখা যায় না। তার প্রতি সমর্থন মূলত ভারতের মুসলিম সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

অধ্যাপক ইরফান আহমদ এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন, মামদানি যখন উমর খালিদের মুক্তির কথা বলেন, তখন শারজিল ইমামের নাম উল্লেখ করতে তার বাধা কোথায়? তার মতে, মামদানি বা ভারতের বামপন্থী উদারপন্থীদের কাছে খালিদের পক্ষে কথা বলা সহজ। কারণ, খালিদ নিজেকে মুসলিম হিসেবে সামনে আনেন না এবং নিজের রাজনীতি ব্যাখ্যা করতে ইসলামের ভাষা ব্যবহার করেন না। কিন্তু ইমাম ইসলামী পরিভাষা ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনীতির কথা বলায় তারা নীরব থাকেন।

ইরফান বলেন, ‘খালিদের পক্ষে উদারপন্থীদের এত সাবলীল বক্তব্য আর ইমামের বিষয়ে তাদের অদ্ভুত নীরবতা বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি, না হলে নৈতিক কাপুরুষতার লক্ষণ।’

ভবিষ্যতে মুসলমানদের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতায়নের আন্দোলনে ইমাম ভূমিকা রাখতে পারবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইরফান বলেন, ভবিষ্যৎ জানার কোনো গোপন চাবিকাঠি তার হাতে নেই। তবে তার আশঙ্কা, বর্তমান সরকার এ ধরনের কণ্ঠস্বর দমন করতে প্রস্তুত।

ইমামের কারাবাসের সাথে ইতালির মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির কারাবাসের তুলনাও টেনেছেন তিনি। ১৯২৬ সালে গ্রামশির বিচারের সময় সরকারি কৌঁসুলি বলেছিলেন, ‘২০ বছরের জন্য আমাদের এই মস্তিষ্কের কাজ বন্ধ করে দিতে হবে।’ ইরফানের মতে, শারজিল ইমামও প্রায় সাত বছর ধরে অন্যায়ভাবে কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন।

শেষে উমর খালিদ, শারজিল ইমামসহ মুসলিম ও অমুসলিম বিবেকের বন্দিদের কারাবাসের প্রসঙ্গে উনিশ শতকের দার্শনিক হেনরি ডেভিড থোরোর কথা তুলে ধরেন ইরফান। তার ভাষায়, ‘অন্যায় ব্যবস্থায় একজন ন্যায়পরায়ণ মানুষের প্রকৃত জায়গা কারাগারেও হতে পারে।’