
‘লক্ষ লক্ষ প্রাণের দাম দিয়েছি অনেক উজাড় গ্রাম/ সুদ আসলে আজকে তাই যুদ্ধ শেষের প্রাপ্য চাই।’ কবি কিশোর সুকান্তের এই উচ্চারণগুলো যেন আজকের এই অগ্নিগর্ভ পৃথিবীরই প্রতিচ্ছবি। সুকান্ত আরও লিখেছিলেন, ‘বন্ধু তোমার ছাড় উদ্বেগ নির্ভীক করো চিত্ত/ বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।’ কবির সেই অবিনাশী বাণী আজ বিশ্বজুড়ে নির্মম এক সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। খামখেয়ালী এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের হটকারী সিদ্ধান্ত আর যুদ্ধ উন্মাদনার জেরে আজ শুধু বাংলা নয়, গোটা পৃথিবীর মাটিই এক দুর্জয় ঘাঁটি হয়ে উঠতে বাধ্য হচ্ছে, যেখানে মানুষ এখন রুখে দাঁড়ানোর তাগিদ অনুভব করছে।
দ্য গার্ডিয়ানের কূটনৈতিক সম্পাদক প্যাট্রিক উইনটুরের শনিবার (৩১ অক্টোবর) অ্যাজ ট্রাম্প ফ্যানস দ্য ফ্লেমস অব আ ওয়ার্ল্ড অন ফায়ার, ক্যান ডিপ্লোমেসি টেক ব্যাক কন্ট্রোল? নিবন্ধে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট: প্রথমত, বিশ্বের বিচ্ছিন্ন সংঘাতগুলো এখন আর একক কোনো ঘটনা নয়; মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ইউক্রেন সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দা একই সূত্রে গাথা। দ্বিতীয়ত, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অস্থিরতা ও হুটকারি সিদ্ধান্ত বিশ্বকে এমন এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে, যা থেকে নিষ্কৃতির জন্য মিত্র দেশগুলোকেও এখন বিকল্প পথ খুঁজতে হচ্ছে। নিবন্ধে স্পষ্ট উঠে এসেছে—কীভাবে ক্ষমতার মাতব্বরি ও অপরিনামদর্শী পদক্ষেপ বিশ্বের স্থিতিশীলতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন দূত টম বারাক গত সপ্তাহে দোহায় দেওয়া বক্তব্যে জানান, তার প্রেসিডেন্ট ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে ইরানে শুরু হওয়া যুদ্ধ অপ্রত্যাশিত পরিণতি ডেকে এনেছে। ছোটখাটো আগুনকে দাবানলে পরিণত করেছে। তিনি মধ্যপ্রাচ্যকে একটি রুবিকস কিউবের সাথে তুলনা করে বলেন যে একটিমাত্র চালে পুরো ছবি বদলে যেতে পারে। তিনি স্বীকার করেন যে তারা ইরানে যা শুরু করেছিলেন তা হামাস, হিজবুল্লাহ, ছয়টি ইরানি মিলিশিয়া এবং হাউছিদের পেরিয়ে এখন উত্তর আফ্রিকায় গড়িয়েছে। বারাক জানান, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য এবং লেবাননে মার্কিন প্রভাবে এর আগে ২৩ বার সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করা হলেও তার একটিও সফল হয়নি। ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, প্রতিবার আমরা মার্কিনীরা হস্তক্ষেপ করে কোনো ব্যক্তি বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছি, আর সেটাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মার্কিন বিশেষজ্ঞ চার্লস কুপচান তার নতুন বইয়ে লিখেছেন যে বিশ্ব গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যবস্থায় দ্রুত ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ছে, যা বৈশ্বিক রাজনীতিকে কেন্দ্রচ্যুত করছে এবং পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে নতুন করে উসকে দিচ্ছে। একই সাথে ডিজিটাল যুগের অগ্রগতি শিল্প যুগের সামাজিক চুক্তিকে দুর্বল করে তুলছে, যার ফলে জাতীয় রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বিশাল আর্থসামাজিক বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। ট্রাম্প এই পদ্ধতিগত ও বিস্তৃত প্রবণতারই একটি লক্ষণ মাত্র। তবে এই আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে একজন খেয়ালী, আত্মম্ভরী ও নীতিহীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে ধ্বংসাত্মক ক্ষতি করতে পারেন, তা বহুগুণ বেড়ে গেছে। আমরা এখন মূলত বিশ্বব্যবস্থার বিপর্যয়ের সাথে ব্যক্তিত্বের ব্যাধির মুখোমুখি হচ্ছি।
ইরান যুদ্ধ এখনো ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ও রহস্যময় ভুল হিসেবে রয়ে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টকেই ইরান সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হতো, যা নিজেই বহু পাক্ষিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল। কিন্তু যেভাবে এই বিষয়টি সামলানো হয়েছে তা পুরোপুরি ট্রাম্পের নিজস্ব মানসিকতার ফসল। মিশিগানের ডেমোক্রেটিক সিনেট প্রার্থী আব্দুল আল-সায়েদ বলেন, সবাই বলতে পারত এটা একটা চরম বোকামি। কিন্তু পুরো বিশ্বে মূলত একজন ব্যক্তিই ছিলেন যার ৪০ বছরের প্রকল্প ছিল আমাদের এই যুদ্ধে নামানো, আর তিনি হলেন অন্য একটি সরকারের প্রধানমন্ত্রী (নেতানিয়াহু)। অবশেষে তিনি এমন একজনকে পেলেন যিনি কাজটি করতে রাজি হয়েছেন। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং গত ফেব্রুয়ারির ইরান-মার্কিন আলোচনার মধ্যস্থতাকারী ক্যামব্রিজে এক বক্তব্যে মনে করিয়ে দেন যে বোমাবর্ষণ শুরু হওয়ার আগে মূল পারমাণবিক ইস্যুতে একটি চুক্তি প্রায় হাতের নাগালে চলে এসেছিল।
যেকোনো বিচারেই এই যুদ্ধ একটি বিপর্যয়কর ব্যর্থতা, যার পরিণতি প্রাথমিক সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতিকে ৪ শতাংশে ঠেলে দিয়েছে। শত শত বছর ধরে বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকা হরমুজ প্রণালী এখন ইরানের দরকষাকষির হাতিারে পরিণত হয়েছে। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক দুই সপ্তাহ আগে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৭ ডলারে পৌঁছায়, যা যুদ্ধপূর্ব স্তরের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক পাওয়ারহাউজ সৌদি আরবের জিডিপি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে, অথচ জুলাই মাসেই ১ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। হাউস অব সৌদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তেলের মূল্যের ওঠানামা সামলাতেই দেশের 'ভিশন ২০৩০' পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারি থেকে সেই হিসাবের প্রতিটি অনুমানই ব্যর্থ হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সৌদি সরকার তাদের ২০২৬ সালের বাজেট ঘাটতির প্রাক্কলন বাড়িয়ে ৬৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে বাধ্য হয়, যা মূল পূর্বাভাসের চেয়ে ৪৮ শতাংশ বেশি।
সংঘাতের ফলে ইরানও স্থিতিশীল হয়নি। যুদ্ধের প্রথম দিনেই কৌশলগতভাবে সবচেয়ে দক্ষ আলারিঝানি নিহত হওয়ায় নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির চারপাশের কট্টরপন্থীরা আরও শক্ত অবস্থান নিয়েছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ আলোচনা এখন পরমাণু অস্ত্র না রাখার ফতোয়া তুলে নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে। এছাড়া দুই-দুবার আলোচনার মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার পর ইসলামী বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি) মার্কিন ঘাঁটির পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে অগ্রিম আঘাত হানার নীতি গ্রহণ করেছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা প্রধান টনি রাডাকিন স্বীকার করেছেন, দূর থেকে মানুষ আমাদের ক্ষতি করতে পারে এবং এর জন্য বিশাল অর্থের প্রয়োজন হয় না।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসংলগ্ন ও আইনহীন পদক্ষেপ তার নিজের দেশের জনপ্রিয়তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। রাজনৈতিক জনসমর্থন হারাতে থাকা ট্রাম্প নিজের ভুল স্বীকার না করে তেলের উচ্চমূল্যের দায় ইউক্রেনের রুশ তেল শোধনাগারে হামলার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতি তার জমিয়ে রাখা ক্ষোভ উগরে দিয়ে তাকে শান্তির পথে প্রধান বাধা হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং রাশিয়ার সাথে ব্যবসার নতুন যুগের কথা বলেন। তবে এই পদক্ষেপেও হোয়াইট হাউসের চরম অদক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে। ট্রাম্প প্রথমে সম্পূর্ণ কাল্পনিক একটি ৬০ দিনের জ্বালানি যুদ্ধবিরতির কথা ঘোষণা করেন, যাতে জেলেনস্কি বা পুতিন কেউই রাজি ছিলেন না। মার্কিন নেতৃত্বের এই অদক্ষতার সুযোগ নিয়ে পুতিন চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে একটি ত্রিমুখী শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তাব দিয়েছেন। অ্যামেরিকার বর্তমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে পুতিন ইউক্রেন ও ইরান দুই যুদ্ধই নিজের শর্তে শেষ করতে চান।
তবে এসবের একটি বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। বহু দেশ অবশেষে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে যে আমেরিকার দ্বারা উপেক্ষিত ও শোষিত হওয়ার বিপদ কতটা মারাত্মক। ট্রাম্পের ইরান ট্র্যাজেডি ইউক্রেনের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ইউরোপে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিক্ষোভকারীদের জানান যে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তাদের ক্ষোভ যুক্তিযুক্ত, যা পারস্য উপসাগরে শুরু হওয়া সংঘাতের ফল, যে যুদ্ধে ফ্রান্স অংশ নেয়নি কিন্তু পরিণতি ভোগ করছে। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করে জানান যে তেলের এই আকাশচুম্বী দাম মার্কিন সিদ্ধান্তের ফল। অন্যদিকে ইলন মাস্কের স্টারলিংক নিয়ে টানাটানির পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজস্ব ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমেরিকার প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও বুঝতে পারছে যে কেবল ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষা করা মার্কিন ব্যবস্থার ওপর আর ভরসা রাখা যায় না। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির প্রস্তাবিত উপসাগরীয় নিরাপত্তা চুক্তিতে ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান এক নতুন বার্লিন প্রাচীর পতনের মুহূর্তের মতো। যার মূল অর্থ হলো—আমেরিকা আর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার গ্যারান্টি প্রদানকারী হিসেবে থাকছে না। যেখানে বিশ্বসংস্থাগুলোর ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে, সেখানে কবি সুকান্তের সেই দুর্জয় ঘাঁটি গড়ার প্রত্যয়ে সংঘাত থামাতে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের কাছ থেকে বিশ্ব পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়া এখন সময়ের দাবি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








