কুকুরী ও শিয়ালের বন্ধুত্ব : আবুল কাসেম
কুকুরী ও শিয়ালের বন্ধুত্ব : আবুল কাসেম।


খালপাড়ের এক নির্জন কোণে ঘন সবুজের একটি ঝোপ ছিল। সেই ঝোপের ভেতরেই বাস করত একটি কুকুরী। কিছু দিন ধরে পাশের বনের একটি শিয়ালের সাথে তার চরম শত্রুতা চলছিল।
মাঝেমাঝে শিয়ালটি ঝোপের আশপাশে এসে ঘুরাঘুরি করত। তাকে দেখামাত্রই কুকুরীটা কখনো দাঁত বের করে ঘেউ ঘেউ করে উঠত, কখনো সুযোগ পেলে আক্রমণও করে বসত। কুকুরীর তাড়া খেয়ে শিয়ালটি দৌড়ে পালাত, কিন্তু কিছুক্ষণ এদিক-সেদিক ঘুরে আবার ফিরে আসত সেই ঝোপের ধারে। 
এরই মাঝে কুকুরীর ঘরে জন্ম নিল পাঁচটি ফুটফুটে ছানা। একদিন সে ছানাগুলোকে ঝোপে রেখে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল; কিন্তু সেদিন খাবার সংগ্রহ করতে বেশ সময় লেগে গেল। এই সুযোগে শিয়ালটি এসে হাজির হলো ঝোপের ভেতর।
কুকুরীর পাঁচ ছানা তখন আপনমনে খেলছিল। শিয়ালটাকে দেখে তারা কোনো ভয় পেলো না, বরং কৌতূহলী হয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। তখন শিয়ালটি তাদের  সাথে খেলতে শুরু করল- কখনো তাদের সামনে দৌড়াচ্ছে, কখনো থেমে তাদের দিকে তাকাচ্ছে। কখনো আবার নিজের জিহ্বা দিয়ে তাদের শরীরের লোম চেটে দিচ্ছে। ঠিক তখনই ঝোপের দিকে দূর থেকে ছুটে এলো কুকুরীটা।
শিয়ালকে দেখেই তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। ভয়, উৎকণ্ঠা আর সন্তান হারানোর আশঙ্কায় সে অস্থির হয়ে পড়ল।  দূর থেকেই জোরে জোরে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। তার চোখ বেয়ে টলমল করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
সে যেন নিঃশব্দে আর্তনাদ করে
 বলছে-
‘কেউ আমার ছানাগুলোকে বাঁচাও!’
কুকুরীটা এক মুহূর্তও দেরি না করে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে শিয়ালের দিকে এগিয়ে গেল।  কিন্তু কাছে এসে যা দেখল, তাতে সে যেন থমকে গেল- শিয়ালটি তার ছানাগুলোকে  আদর করছে। 
কুকুরী কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখল এবং ভাবল- ‘যে শিয়ালকে দেখামাত্র এতদিন আমি তাড়া করতাম, সেই শিয়ালই আজ আমার ছানাদের আগলে রেখেছে।’  সে ধীরে ধীরে ছানাগুলোর কাছে গেল। 
একে একে তাদের সবাইকে শুঁকে দেখল। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে পড়ল। ছানাগুলো মাকে কাছে পেয়ে দুধ খেতে লাগল।
শিয়ালটিও তখন তাদের পাশেই চুপচাপ বসে রইল। সেদিন যেন তাদের পুরোনো শত্রুতার সমাপ্তি ঘটল।  শুরু হলো এক অনন্য বন্ধুত্বের অধ্যায়। এরপর থেকে শিয়াল আর কুকুরীকে প্রায়ই একসাথে দেখা যেত। কুকুরী যখন খাবারের সন্ধানে বের হতো, শিয়ালটা তখন তার ছানাগুলোর পাশে বসে পাহারা দিত। কোনো মানুষ কিংবা হিংস্র প্রাণী  কুকুর ছানাগুলোর কাছে এলেই সে তাদের তাড়া করত।