
‘কা কা কা!’ ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল অর্ণব। চোখ কচলাতে কচলাতে জানালার বাইরে তাকাল সে। পেয়ারা গাছটায় একটি কাক বসে আপন মনে ডাকছে। কিন্তু অর্ণবের মনে হলো, কী যেন একটা নেই! সে কান খাড়া করল অন্য একটি ডাক শোনার জন্য। রোজ সকালে এই পেয়ারা গাছের ডাল থেকেই ভেসে আসত সুমিষ্ট এক সুর। টিউ... সুই-টু... চিউ-চিউ। আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েলের শিস। লেজ ওপর-নিচ করে সে কী দারুণ গাইত!
দৌড়ে দাদুর কাছে গেল অর্ণব। দাদু তখন আয়েশ করে খবরের কাগজ পড়ছেন। ‘দাদু, ও দাদু! আমাদের পেয়ারা গাছে দোয়েল পাখিরা কিছু দিন ধরে গান গাইছে না কেন গো?’ দাদু কাগজ থেকে মুখ তুলে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘শুধু আমাদের পেয়ারা গাছ থেকে নয় দাদুভাই, পুরো গ্রাম থেকেই দোয়েলরা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।’ অর্ণবের চোখ তো ছানাবড়া! বিলুপ্ত? মানে হারিয়ে যাচ্ছে? কিন্তু কেন? স্কুলে গিয়ে অর্ণব তার দুই বন্ধু নিতু ও সিয়ামকে সব খুলে বলল। সিয়াম ভ্রƒ কুঁচকে বলল, ‘হুম! ব্যাপারটি তো সুবিধার মনে হচ্ছে না। আমাদের দোয়েল-বন্ধুরা কেন হারিয়ে যাচ্ছে, তা খুঁজে বের করতেই হবে।’ নিখোঁজ দোয়েলের সন্ধানে তিন বন্ধু মিলে তৈরি করে ফেলল একটি গোয়েন্দা দল। খাতা-পেন্সিল নিয়ে গ্রামে তদন্তে বের হলো তারা। সবচেয়ে আগে গেল গ্রামের মাঠের দিকে। কিন্তু একী! বড় গাছটা কোথায়? সেখানে শুধু গাছের বিশাল এক গুঁড়ি পড়ে আছে। নিতু মন খারাপ করে বলল, ‘দেখেছিস? দোয়েল পাখিরা তো গাছের গর্তে ও ঘন ডালে বাসা বানায়। আমরা যদি সব বড় গাছ এভাবে কেটে ফেলি, তাহলে তারা বাসা বানাবে কোথায়? বাঁচবে কিভাবে?’ গোয়েন্দা দলের খাতায় লেখা হলো- দোয়েলের বিলুপ্ত হওয়ার প্রথম কারণ, গাছ কাটা এবং বাসা বানানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাব।
এরপর তাদের চোখ পড়ল জব্বার চাচার সবজি বাগানে। অর্ণব খপ করে নাক চেপে ধরল। ‘বাপরে বাপ, কী ঝাঁঝালো গন্ধ!’ তারা দেখল, জব্বার চাচা মুখে গামছা বেঁধে ফসলের ওপর স্প্রে মেশিন দিয়ে কী যেন ছিটাচ্ছেন। ফসসস-ফসসস! সিয়াম বলল, ‘আরে! এগুলো তো বিষাক্ত কীটনাশক।’ সে বিজ্ঞান বইয়ে পড়েছে, এই বিষাক্ত ওষুধগুলো দিলে ফসলের সব পোকা মরে যায়। অর্ণব ভাবল, পোকা না থাকলে দোয়েলরা খাবে কী? নিশ্চয় বিষ-মাখানো পোকা খেয়েই দোয়েল পাখিরা মারা যাচ্ছে।
খাতায় আন্ডারলাইন করে লেখা হলো- অন্যতম বড় কারণ অতিরিক্ত মাত্রায় বিষাক্ত কীটনাশক। গোয়েন্দা দল কারণ তো খুঁজে পেল। কিন্তু এখন উপায়? অর্ণব বলল, ‘আমাদের চুপ করে বসে থাকলে তো চলবে না। চলো, আমরা দোয়েলদের জন্য বাড়ি বানিয়ে দিই আর কৃষকদের বোঝাই।’
যেই কথা, সেই কাজ! তিন বন্ধু মিলে গ্রামের বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় গাছের বীজ বপন করল। তারপর পড়ে থাকা কাঠের টুকরো, পুরোনো মাটির হাঁড়ি আর নারকেলের মালা দিয়ে দারুণ সব পাখির বাসা বানিয়ে ফেলল। সেগুলো গ্রামের বিভিন্ন গাছে গাছে নিরাপদ জায়গায় শক্ত করে বেঁধে দিলো।
এরপর তারা দল বেঁধে সোজা চলে গেল জব্বার চাচার কাছে। নিতু বলল, ‘চাচা, আপনি বাগানে এত বিষ দিচ্ছেন কেন? এই বিষ খেয়ে তো আমাদের দোয়েল পাখিরা সব মরে যাচ্ছে।’ চাচা অবাক হয়ে বললেন, ‘বিষ না দিলে যে পোকায় ফসল খেয়ে ফেলবে রে মা। তখন তো আমার অনেক ক্ষতি হবে।’ অর্ণব চাচকে বোঝাল, ‘চাচা, দোয়েল ও অন্য পাখিরাই তো ওইসব ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফসল বাঁচায়। আপনি যদি বিষ দেয়া বন্ধ করেন, পাখিরা ফিরে আসবে। ওরাই আপনার পোকা দমনের কাজটি করে দেবে।’ সে আরো বলল, ‘তবে কীটনাশক বিষের বদলে আপনি সাবান-পানি বা নিমপাতার রস দিতে পারেন। এতে আপনার বিষ কেনার টাকাও বাঁচবে, পরিবেশেরও ক্ষতি হবে না।’ অর্ণব এ বিষয়গুলো দাদার পড়া খবরের কাগজ থেকে জেনেছে। বিষয়টি জেনে জব্বার চাচার খুব ভালো লাগল। তিনি সাবান-পানি স্প্রে করে খুব উপকারও পেলেন। তার দেখাদেখি গ্রামের অন্য কৃষকরাও এ পদ্ধতিটি ব্যবহার করা শুরু করলেন।
বেশ কয়েকটা মাস কেটে গেছে। একদিন সকালের ঘটনা। টিউ... সুই-টু... চিউ-চিও! লাফ দিয়ে জানালার কাছে গেল অর্ণব। আরে! পেয়ারা গাছে ঝোলানো সেই কাঠের বাক্সটার ঠিক ওপরে বসে আছে একটি দোয়েল। সে আনন্দে লেজ ওপর-নিচ করছে আর গলা ছেড়ে মনের সুখে গাইছে। কী সুমিষ্ট সকাল! শুধু অর্ণবদের বাড়ি নয়, পুরো গ্রামের কৃষকদের বাগানে এখন দোয়েল ও অন্যান্য পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছে, ক্ষতিকর পোকা ধরে খাচ্ছে। বিষমুক্ত ফসলের ক্ষেতে শিরশির বাতাসে প্রকৃতি মনের আনন্দে দুলছে। যেন খুশিতে একনাগাড়ে গেয়ে যাচ্ছে প্রশান্তির গান।








