ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, যুদ্ধবিরতি, খেরসন শহর
রুশ আগ্রাসনের আগে খেরসনে ২ লাখ ৮০ হাজারের বেশি বাসিন্দার বসবাস থাকলেও এখন আছে ৬৩ হাজারের মতো। সংগৃহীত

হাতে বাগান পরিচর্যার রেক নিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন মালি ভলোদিমির ওমেলচেঙ্কো। তার চোখেমুখে যেন অবিশ্বাসের ছাপ। ইউক্রেনের খেরসন শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা ফ্রিডম স্কয়ারে তখন চারপাশ নিস্তব্ধ। শুধু বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ আর ঘাস কাটার যন্ত্রের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। অথচ রুশ বাহিনীর অব্যাহত গোলাবর্ষণে শহরটি প্রায়ই কেঁপে ওঠে।

Advertisement

গত তিন দিনের মানবিক যুদ্ধবিরতির কারণে রুশ নিয়ন্ত্রণাধীন পাশের শহর ওলেশকি থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে। শহরটিতে তীব্র খাদ্যসঙ্কট চলছে।

৩৮ বছর বয়সী দুই সন্তানের বাবা ওমেলচেঙ্কো বলেন, এই যুদ্ধবিরতি যেন ‘একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস’ নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

তবে এই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না। রোববার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।

তিনি বলেন, ‘এই সময়টুকু কাজে লাগিয়ে আমাদের কিছু কাজ শেষ করতে হবে। শীতের আগে গোলাপগাছের ডালপালা ছাঁটছি।’

আঞ্চলিক প্রশাসনের সাবেক কার্যালয়ের সামনে কাজ করছিলেন ওমেলচেঙ্কো। একসময়কার বিশাল সাদা পাথরের ভবনটি স্টালিন আমলের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয়েছিল। গত বছর রুশ হামলায় ভবনটি প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। বিস্তীর্ণ ঘাসের মাঠের পাশে এখন শুধু ভবনের দুই পাশের অংশ টিকে আছে। সেগুলোই এর আগের জাঁকজমকের সাক্ষ্য বহন করছে।

২০২২ সালে রুশ সেনারা খেরসন দখল করে। আট মাস দখলে রাখার পর ইউক্রেনীয় বাহিনী শহরটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়।

এরপর থেকে বেসামরিক নাগরিকদের জন্য ইউক্রেনের অন্যতম বিপজ্জনক শহরে পরিণত হয়েছে খেরসন।

রুশ বাহিনী শহরটিতে গ্লাইড বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় চলাচলকারী মানুষকে অনুসরণ করে হামলা চালায় এসব ড্রোন। সবজি বিক্রেতা কিংবা ছাদ মেরামতের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরাও এর লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। রুশ সেনাদের টেলিগ্রামে প্রকাশ করা ভয়াবহ ভিডিওগুলোতে এমন দৃশ্য দেখা যায়।

ড্রোনের ঝাঁক
খেরসনে এখন প্রতিদিনের জীবন ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

ওমেলচেঙ্কো বলেন, ‘প্রতিনিয়ত ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন উড়তে দেখা যায়। কাজে যেতে আমাদের হেঁটে চলতে হয়। এক গাছ থেকে আরেক গাছের আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে এগোতে হয়।’

প্রতিদিন সকালে এভাবে হেঁটে কাজে যেতে তার এক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। কারণ গাড়িতে চলাচল করা আরো বিপজ্জনক।

যানবাহনগুলোকে নিয়মিত লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘অবশ্যই ভয় লাগে। কিন্তু আমাদের আর কোনো উপায় নেই। কোথায় যাব, আর সেই খরচই বা জোগাড় করব কীভাবে? যাওয়ার মতো জায়গা প্রায় নেই বললেই চলে।’

পরিস্থিতির অবনতি এবং যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর আবারো হামলা শুরুর আশঙ্কা থাকলেও স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে শহরেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। সামনে কঠিন শীতও অপেক্ষা করছে।

আঞ্চলিক প্রশাসনের যোগাযোগ বিভাগের উপপ্রধান ওলেকসান্দর তোলোকোননিকভের তথ্য অনুযায়ী, খেরসনে এখনো প্রায় ৬৩ হাজার মানুষ বসবাস করছেন। রুশ আগ্রাসনের আগে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৮০ হাজারের বেশি।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘রাশিয়া খেরসনকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলতে চাইছে। কিন্তু শহরটিকে অচল করে দিতে পারবে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘সব ধরনের হুমকি সত্ত্বেও বাসিন্দারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। খেরসনকে সচল রাখতে প্রতিদিন নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু করছেন।’

বাসিন্দারা ড্রোন প্রতিরোধে বিশেষ জাল দিয়ে ঢাকা সড়ক ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। তোলোকোননিকভের তথ্যমতে, শহরজুড়ে ৭০ কিলোমিটারের বেশি সড়কে এ ধরনের জাল টাঙানো হয়েছে।

এছাড়া অঞ্চলটিতে ১৫টি ভূগর্ভস্থ হাসপাতাল রয়েছে। আরো ১১টি নির্মাণাধীন।

একটি ক্লিনিকে কর্মরত ৫১ বছর বয়সী ইরিনা চাপোভাল বলেন, ‘আমরা এসবের সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করি। নিজেদের যত্ন নিতে হয় এবং হামলার শিকার হওয়া এড়াতে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। আমরা সব সময় সতর্ক অবস্থায় থাকি, কখনো অসতর্ক হই না।’

‘সবকিছুই তো দেখেছি’
যুদ্ধবিরতি শেষ হলে আবারো যুদ্ধ শুরু হবে—এ বিষয়ে কারো কোনো বিভ্রান্তি নেই। রোববার রাত ১১টার কিছু আগে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।

৫০ বছর বয়সী ইভান বলেন, ‘তারা হয়তো সামরিক সরঞ্জাম সরাচ্ছে।’

পুড়ে যাওয়া গাড়ির ধ্বংসাবশেষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি রুশ সেনাদের গতিবিধি সম্পর্কে এ কথা বলেন।

পেশায় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী ইভান শুধু নিজের প্রথম নাম প্রকাশ করেছেন। তিনি স্ত্রী ও ১০ বছর বয়সী মেয়েকে যুদ্ধের সম্মুখসারির কাছ থেকে দূরে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ একটি শহরে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

তবে নিজে খেরসনেই রয়ে গেছেন। যদিও একটি নিয়ন্ত্রিত আকাশবোমার আঘাতে তার ভবনের সামনের দেয়াল উড়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘সবাই চলে গেলে শহরটি জনশূন্য ও প্রাণহীন হয়ে পড়বে।’

কস্তিয়ান্তিন নামে আরেক বাসিন্দা পোষা প্রাণীর খাবার বিক্রি করেন। তিনিও শুধু নিজের প্রথম নাম প্রকাশ করেছেন। ৪৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তি জানান, কয়েক মাস ধরে তিনি ‘এক দিনও ছুটি নেননি’।

তিনি বলেন, ‘এখানে অনেক প্রাণী পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। তাদের খাবার দিতে হবে।’

আবারো যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে খুব একটা বিচলিত নন তিনি। বলেন, ‘দখল, মুক্তি, গোলাবর্ষণ—সত্যি বলতে, এর চেয়ে খারাপ আর কী হতে পারে? আমরা তো সবকিছুই দেখে ফেলেছি।’

সূত্র : এএফপি/বাসস