
উন্নয়নের চাকায় পিষে হচ্ছে নাগরিক প্রাণ। বেশ কয়েক বছর ধরে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলার উপায় নেই। একে দুর্ঘটনা না বলে কাঠামোগত হত্যা বলতে হবে। রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় গত ১৮ অক্টোবর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত একটি ভারী ক্রেনের ধাক্কায় প্রকৌশলী এ বি এম আহসান উল্লাহ আরিফ নামের এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এ প্রকল্পের ভঙ্গুর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং গাফিলতির শিকার হয়ে প্রাণ হারালেন প্রকৌশলী আরিফ; যা চরম পরিহাস ও নিষ্ঠুরতা। এটি শুধু দুর্ঘটনা নয়; আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিধিমালার প্রকাশ্য লঙ্ঘন। আইনের কোনো তোয়াক্কা না করার এক ভয়াবহ পরিণতি।
নির্মাণকাজের বিধিমালা এবং সড়ক পরিবহন আইন অত্যন্ত স্পষ্ট। জনবহুল ও ব্যস্ত সড়কে ক্রেন বা ভারী যন্ত্রপাতি চলাচলের সময় সাধারণ যানবাহন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা বাধ্যতামূলক। ক্রেনের লোডার ঘোড়ার ব্যাসার্ধের মধ্যে যানবাহন বা মানুষের প্রবেশ ঠেকাতে চারদিকে ফ্ল্যাগম্যান বা ওয়াচম্যান থাকার কথা। অথচ হাতিরঝিলে প্রকৌশলী আরিফকে পিষে ফেলার সময় কোনো ট্রাফিক শাটডাউন বা ওয়াচম্যান ছাড়া সম্পূর্ণ অরক্ষিতভাবে ক্রেনটি সড়কে নামানো হয়েছিল। একটি বৃহৎ প্রকল্পে এ ধরনের নিরাপত্তা দুর্বলতা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এর আগেও মগবাজার, মহাখালী, তেজগাঁও বা আশুলিয়ায় বৃহৎ প্রকল্পের লোহার ফ্রেম, রড ও গার্ডার পড়ে একের পর এক মানুষের জীবন গেছে। ২০২২ সালে গাজীপুর-উত্তরা বিআরটি প্রকল্পে ক্রেন থেকে ফ্লাইওভারের গার্ডার খসে একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনা অনেকের মনে আছে।
লক্ষণীয়, প্রতিবার মৃত্যুর পর তদন্ত কমিটি গঠন, মৌখিক আশ্বাস ও ক্ষণিকের শোক দেখা যায়। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই ধরনের কোনো দায়িত্বহীন দেশী-বিদেশী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির নেই। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি মূলত দেশী-বিদেশী ঠিকাদারদের কাছে এদেশের সাধারণ মানুষের জীবন মূল্যহীন করে তুলেছে। বাংলাদেশ সেতু বিভাগ বা প্রকল্প তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীরাও নিয়মিত সেফটি অডিট নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ‘সেফটি প্রটোকল অনুসরণ’ শুধু কাগজে-কলমে আর আনুষ্ঠানিক মন্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়।
নাগরিকের প্রাণ রক্ষা ছাড়া কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রশংসনীয় হতে পারে না। প্রকৌশলী আরিফের পরিবারের আকুতি অর্থ বা ক্ষতিপূরণ নয়। আর কোনো পরিবার যেন এভাবে নিঃস্ব না হয়। সময় এসেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
নিজের নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—গাফিলতিতে জড়িত কর্মকর্তা ও বিদেশী ঠিকাদারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করা। সাথে সাথে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী ছাড়া বৃহৎ প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা। বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণকাজ যেন নিরপরাধ মানুষের জন্য ‘মৃত্যুফাঁদ’ না হয়ে ওঠে তা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এটি নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোরও যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








