সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় লোগো। নয়া দিগন্ত

দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা এখনো বাড়ছে। ২০৪৫ সাল পর্যন্ত এটি বাড়তে থাকবে। এরপর বেড়ে যাবে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। অর্থাৎ কায়িক শ্রম দিতে অক্ষম মানুষের সংখ্যা কর্মক্ষমদের চেয়ে বেশি হবে। জনমিতিসংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। 
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— ২০২৭ সালে বাংলাদেশে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের অনুপাত ৭ শতাংশে পৌঁছাবে। ফলে দেশে প্রবীণের হার বেশি হবে। ২০৫১ সালে এই হার দ্বিগুণ হবে। তখন সমাজ হবে বয়স্ক জনগোষ্ঠীনির্ভর। 
জনমিতির এই সতর্কবার্তা এমন সময় এলো যখন বাংলাদেশের হাতে সময় আছে দুই দশকেরও বেশি। বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত বেশি হওয়ার আগেই এমন পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে, অর্থনীতি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব নেয়ার মতো সক্ষম হয়ে ওঠে। 
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আশু করণীয় সম্পর্কেও আভাস দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে— বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগ নির্ভর করছে দেশ এই মুহূর্তে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে তার ওপর। এই দুই দশক সময়ের মধ্যে কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা দান, বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তরুণদের দক্ষ করে তোলা এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সর্বোচ্চ সুযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা ও বার্ধক্যকালীন আয়নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। এ জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে।
কিন্তু এই মুহূর্তে দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ধীরগতি শুধু নয়, নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কর্মক্ষমদের প্রায় ৮৪ শতাংশ এমন অনিশ্চিত কাজে জড়িত যেখানে চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও অবসরকালীন সুবিধা নেই। ২০১৮ সালের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ বার্ধক্যের জন্য সঞ্চয় করতে পারেন। বাকি ৯৭ শতাংশই শেষ বয়সে খালি হাতে অবসরে যাবেন। এদের শুধু খাবারের সংস্থান নয়, চিকিৎসাসহ যাবতীয় ব্যয় জোগানোর দায় চাপবে রাষ্ট্রের ঘাড়ে। আমাদের শিক্ষার মানও এতটা নিচু যে, ১০ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৫১ শতাংশ সহজ লেখারও অর্থ বুঝতে পারে না। এদেরকে কর্মক্ষেত্রে সফল হতে হলে যে মানের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ দরকার রাষ্ট্র তা দিতে পারছে না।  
প্রতিবেদনের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, উদ্ভূত সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে আলাদা খাত হিসেবে না দেখে পরস্পর সম্পর্কিত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এতসব করণীয় কারা করবে? একটি বিষয় স্পষ্ট। প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে জনসংখ্যার কোনো সুবিধাই কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাবে না।
রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য গোটা জাতির ঐকমত্যে গৃহীত এবং গণভোটে জনগণের অনুমোদিত সনদ ক্ষমতাসীন সরকার কার্যত উপেক্ষা করছে। অর্থনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো লক্ষণ দূরের কথা, সাধারণ আইনশৃঙ্খলাও সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারছে না। অথচ সামনে এগোনোর জন্য সামাজিক, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিকল্প নেই। জনমিতির সুবিধা কাজে লাগাতে হলে এই মুহূর্তেই সর্বোচ্চ পর্যায়ের সক্রিয় হতে হবে। 

Advertisement