
প্রিয়জনের মৃত্যু স্বজনদের জন্য শোক ও বেদনার। হাসপাতালে কারো মৃত্যু হলে পরিস্থিতি কখনো কখনো বিভীষিকায় রূপ নেয়। গত মঙ্গলবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এমন মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়েছিল। ওই দিন পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ধর্মঘট ছিল। এতে লাশ বাড়ি নেয়ার জন্য অসহায় হয়ে ছোটাছুটি করতে হয়েছে স্বজনদের। অনেক চেষ্টা করেও অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে পারছিলেন না তারা। শেষে পিকআপ, ভ্যান, রিকশা কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে লাশ নিয়ে যাত্রা করতে হয়েছে তাদের। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতেও পোহাতে হয়েছে ভোগান্তি।
সহযোগী একটা দৈনিকে এর কিছু চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সোমবার নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৭০ বছর বয়সী দাদীকে নিয়ে এসেছিলেন মো: শাহীন। মঙ্গলবার বিকেলে দাদীর মৃত্যু হয়। লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য তিন ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষা করেও অ্যাম্বুলেন্স পাননি তিনি। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সও চোখে পড়েনি। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যায় চানখাঁরপুল মোড় থেকে একটি পিকআপ ভ্যান ভাড়া করে দাদীর লাশ নিয়ে রওনা হন শাহীন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে মানুষের অসহায়ত্বকে এমন জিম্মি করা সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিপর্যয়। প্রিয়জনের লাশের কফিন বা ভেন্টিলেটরে থাকা গুরুতর অসুস্থ রোগীকে সাথে নিয়ে স্বজনদের ছোটাছুটির দৃশ্য সভ্য সমাজে কাম্য হতে পারে না। এই দৃশ্য দেশের প্রধান একটি হাসপাতালের সুব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে। সেই সাথে প্রশ্ন উঠে— যারা ধর্মঘট ডেকেছেন, তাদের বিবেচনাবোধ নিয়ে, পার্কিংয়ের মতো একটি প্রশাসনিক বা ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধান কি মানুষের অসহায়ত্বকে জিম্মি করে করতে হবে? অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি সেবাকে হাতিয়ার বানানোর মানসিকতা কোন ধরনের নৈতিকতার মধ্যে পড়ে? আমাদের সংবেদনশীলতা কি তবে ভোঁতা হয়ে গেছে?
অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের পার্কিং বা ব্যবসার নিজস্ব কিছু সমস্যা থাকতে পারে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে তাদের মতপার্থক্যও থাকতে পারে। এই সমস্যাগুলো আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান করা যেত। কিন্তু রোগীদের যাতায়াত ও লাশ বহনের মতো জরুরি সেবা আকস্মিকভাবে বন্ধ করে দেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আন্দোলনের নামে অমানবিক ব্ল্যাকমেইল, যা অপরাধের শামিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। এই ধরনের সঙ্কট এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে দূরদর্শিতা ও তৎপরতা দেখানো প্রয়োজন ছিল, তার যথেষ্ট ঘাটতি লক্ষ করা গেছে। দেশের সবচেয়ে বড় এই সরকারি হাসপাতালে সুশৃঙ্খল পার্কিং ব্যবস্থাপনা থাকা জরুরি ছিল। বিকল্প ব্যবস্থা না করেই অ্যাম্বুলেন্স সরিয়ে দেয়ায় সঙ্কট আরো বেড়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা অন্য আট-দশটি সাধারণ পণ্য বা ব্যবসার ক্ষেত্র নয়। এটি সরাসরি মানুষের জীবন ও মৃত্যুর সাথে জড়িত। তাই এই খাতের সাথে জড়িত চিকিৎসক, সেবিকা, ওষুধ বিক্রেতা কিংবা অ্যাম্বুলেন্স চালকসহ সবার ভেতরে ন্যূনতম মানবিক বোধ ও দায়বদ্ধতা থাকা আবশ্যক।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির যৌথ আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান দরকার। হাসপাতালের ভেতরে বা আশপাশে অ্যাম্বুলেন্সের সুশৃঙ্খল পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের অসহায়ত্বকে জিম্মি করার অসুস্থ মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








