
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে সংঘটিত অনেক অপরাধের পেছনে জুয়া ও মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অনেক গুরুতর অপরাধের পেছনে মাদকাসক্তি ও জুয়ার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুয়া ও মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য অপরাধও কমানো সম্ভব হতে পারে। গতকাল বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ক্র্যাব সভাপতি মির্জা মেহেদী তমাল এবং সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ্র সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আরো বক্তব্য রাখেন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) (সচিব পদমর্যাদা) মো: রাশেদ খান, ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাছির জামাল, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম।
বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধ সংঘটনের পর শুধু অপরাধীকে গ্রেফতার, বিচার ও শাস্তি দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অপরাধের পেছনের কারণ চিহ্নিত করে সেগুলো মোকাবেলা করতে হবে।
তিনি বলেন, অপরাধকে শুধু একটি ঘটনা হিসেবে দেখলে হবে না। কেন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, এর পেছনে কী ধরনের সামাজিক বা অন্যান্য কারণ রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, অপরাধ হচ্ছে একটা উপসর্গ। অপরাধের রোগ হচ্ছে অন্য জায়গায়। মূল কারণ চিহ্নিত করে সেখানে ব্যবস্থা নেয়া গেলে অপরাধের হার কমানো সম্ভব।
সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় আধুনিক ইউনিট অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল ও সাইবার স্পেসে অপরাধ বাড়ার সাথে সাথে অপরাধ শনাক্তকরণে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং তথ্য বিশ্লেষণের গুরুত্বও বেড়েছে। পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে শিগগিরই আধুনিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ সদর দফতর, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং বিভাগীয় পর্যায়ে আধুনিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট ও ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা পর্যায়েও সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি থানা ও উপজেলা পর্যায়েও এ বিষয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা রাখার উদ্যোগ নেয়া হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুরনো আইন দিয়ে নতুন ধরনের অপরাধ সবসময় কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা যায় না। বিশেষ করে অনলাইন ও সাইবার স্পেসে জুয়ার বিস্তারসহ নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবেলায় সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইন সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।
কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে আইন দুর্বল হলে আসামিকে গ্রেফতারের পরও দ্রুত জামিন বা মুক্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধের ধরন ও সমাজের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিক আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকার অথবা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) আওতায় তাদের সহযোগিতা করা যায় কি না, তা নিয়ে উদ্যোগ নেয়া হবে।
ক্রাইম রিপোর্টিংকে অনেকাংশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সাথে সাথে সাংবাদিকদেরও প্রযুক্তি ও নতুন ধরনের অপরাধ সম্পর্কে দক্ষতা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, ক্রাইম রিপোর্টারদের ক্ষেত্রটা আলাদা। এটা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের একটা পার্ট। ক্রাইম রিপোর্টারদের জন্য সনদ দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সনদ দেয়া যায় কি না, তা যাচাই করে দেখার কথা বলেন তিনি।
অপরাধ কমাতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ সাংবাদিকদের দায়িত্বের কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।
অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বক্তৃতায় বলেন, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি দায়িত্বশীল ও স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান যদি তাদের সিদ্ধান্ত মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বদলে ফেলে, তবে আমরা কিভাবে একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচনের আশা করতে পারি? যে সংস্কারগুলোর পক্ষে দেশের ৭০ ভাগ মানুষ রায় দিয়েছে, সেগুলোকে অবিলম্বে এবং পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা আবারো সেই পুরনো ধারার সংসদের দিকে ফিরে যেতে চাই না। আর সংসদে যদি এসবের সমাধান না হয়, তবে সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে রাজপথের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমেই আমাদের দাবি আদায় করা হবে। আমাদের তরুণ ও ছাত্ররা আন্দোলন করে শক্তিশালী স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে, তাই ২০২৪-এর পর দেশ যেন আবারো কোনো নতুন স্বৈরাচার বা সামরিক শাসনের মুখে না পড়ে।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে যে গভীর সঙ্কট তৈরি হয়েছে, সরকারকে তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আগামী বাংলাদেশ যেন সবার বাংলাদেশ হয়। এটি যেন নির্লজ্জ দলীয়করণের বাংলাদেশ না হয়, যেখানে প্রতিটি পদে এবং সিদ্ধান্তের স্থানে শুধু একটি দলের আধিপত্য থাকবে। সবকিছুই আমার বা আমার দলের হাতে থাকতে হবে- এই জঘন্য দলীয় মানসিকতা দেশ এবং সংশ্লিষ্ট দলেরই সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেক কেটে ক্র্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এর আগে সকালে র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। রাতে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।







