
সৌদি আরবের মরুভূমিতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার প্রবাসী জসিম উদ্দিন। কিন্তু তার স্বজন ফিরে আসা আনন্দের নয়, বরং স্ত্রী ও তিন সন্তানের জীবনে বয়ে এনেছে এক অপূরণীয় শূন্যতা। একদিকে স্বামীর নিথর দেহের কফিন, অন্যদিকে বাবাকে হারানোর শোকে তিন কন্যার কান্না। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) নিজ গ্রামে জসিমের লাশ পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। বাবার কফিনের সামনে আহাজারি করতে দেখা যায় তিন মেয়েকে। স্বামীকে হারিয়ে শোকে পাথর স্ত্রী রুমা আক্তার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে এখন তিন সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি তিনি।
এর আগে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের আল কাসিম এলাকায় প্রায় চার লাখ টাকা দেশে পাঠানোর উদ্দেশ্যে এক সহকর্মীর সাথে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। এর কয়েকদিন পর আল কাসিমের একটি মরুভূমি থেকে বালুচাপা অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
নিহত জসিম উদ্দিন মতলব উত্তর উপজেলার ঘাসিরচর গ্রামের আইয়ুব আলীর ছেলে। স্ত্রী রুমা আক্তার ও তিন মেয়ে জাকিয়া (১৮), আয়েশা এবং জেসিয়াকে নিয়ে ছিল তার সংসার। বড় মেয়ে জাকিয়া স্বামীর সংসারে, মেজ মেয়ে আয়েশা ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে জেসিয়া দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করে।
পরিবারের স্বপ্ন ছিল, প্রবাসে পরিশ্রম করে সন্তানদের লেখাপড়া করাবেন, গড়ে তুলবেন সুন্দর ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে নির্মম হত্যাকাণ্ড। এখন বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত তিন মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাদের মা।
স্বামী হত্যার বিচার দাবি করে রুমা আক্তার বলেন, স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তান নিয়ে তিনি এখন অসহায়। যারা তার স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তিনি। কোনো স্ত্রী ও সন্তান যেন এভাবে স্বজন হারানোর যন্ত্রণা নিয়ে জীবন কাটাতে বাধ্য না হয়, সেই প্রত্যাশাও তার।
অন্যদিকে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী মেজ মেয়ে আয়েশার কাছে বাবাকে হারানোর শোক যেন জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট। যে বাবার হাত ধরে বড় হওয়ার স্বপ্ন ছিল, সেই বাবার কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে এখন তাকে বিদায় জানাতে হয়েছে। বাবার আদর, ভালোবাসা ও সান্নিধ্য হারিয়ে দিশেহারা আয়েশা। বাবার হত্যাকারীদের বিচার চায় এই শিশুকন্যাও।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের আল কাসিম এলাকায় প্রায় চার লাখ টাকা পাঠানোর উদ্দেশ্যে এক সহকর্মীর সাথে বের হন জসিম। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিলেন তিনি। কয়েক দিন পর আল কাসিমের একটি মরুভূমি থেকে বালুচাপা অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, জসিমকে হত্যা করে লাশ বালুর নিচে চাপা দেয়া হয়। পরে তার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে স্ত্রী ও স্বজনদের কাছে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এ ঘটনায় সৌদি পুলিশ সাব্বির নামে একজনকে গ্রেফতার করেছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মতলব উত্তর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে।
জসিমের মৃত্যুর পর তার লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। পরিবার যখন দিশেহারা, তখন সাংবাদিক শামীম মিয়াজীর মাধ্যমে যুব অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মর্তুজা মাহবুবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন স্বজনরা। পরে বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের সহযোগিতা কামনা করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, তার ব্যক্তিগত সহকারী আল আমিন এবং যুব অধিকার পরিষদ নেতা মর্তুজা মাহবুবের আন্তরিক প্রচেষ্টায় অবশেষে ৩১ অক্টোবর জসিমের লাশ দেশে আনা সম্ভব হয়। শনিবার বাদ আছর নিজ গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
যুব অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মর্তুজা মাহবুব বলেন, তার এলাকার একজন প্রবাসী বিদেশে নিহত হয়েছেন। তার লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা তাদের দায়িত্ব মনে করেই প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রতিমন্ত্রী আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে দ্রুত লাশ দেশে আনার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। অবশেষে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়েছে।
লাশ দেশে ফেরানোর সহযোগিতার জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন জসিমের পরিবারের সদস্যরা। জানাজা শেষে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর শোকাহত পরিবারের সাধে কথা বলেন এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
তবে জসিমের লাশ দেশে ফিরলেও তার হত্যার বিচার এখনো পরিবারের কাছে বড় প্রত্যাশা। স্ত্রী রুমার দাবি, স্বামীর হত্যার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তিন কন্যার পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ জীবন নিশ্চিত করতে সরকারের সহযোগিতাও কামনা করেছেন তিনি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








