
শরতের প্রকৃতিতে বইতে শুরু করেছে শীতের আগমনী বার্তা। ভোরের কুয়াশা শিশিরভেজা মাঠ আর হালকা শীতল বাতাসের সাথে চুয়াডাঙ্গার মাঠে মাঠে খেজুর গাছ পরিচর্যা ও কাটার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা।
চুয়াডাঙ্গার চার উপজেলার মাঠে মাঠে খেজুর গাছ পরিচর্যা ও কাটার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। কারও হাতে ধারালো দা, কোমরে বাধা সরঞ্জামের থলে। নিপুণ হাতে গাছের শুকনো অংশ পরিষ্কার করে রস আহরণের উপযোগী করে তুলছেন তারা। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গাছে গাছে ঝুলবে মাটির হাড়ি, সংগ্রহ শুরু হবে খেজুরের রস। সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে সুস্বাদু গুড় ও পাটালি, যা চুয়াডাঙ্গার সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে যাবে দেশের বিভিন্ন জেলায়।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গা জেলায় খেজুর গাছের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ ৭১ হাজার ৯৬০টি। চলতি মৌসুমে এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে দুই হাজার ৭০০ টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মৌসুমেও গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই হাজার ৭০০ টন। সে সময় খেজুরের গুড় ঘিরে প্রায় ৭৫ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছিল বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
ফলে ঐতিহ্যবাহী এই মৌসুমি পণ্যকে ঘিরে এবারও আশাবাদী গাছি, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
চুয়াডাঙ্গা সদর, দামুড়হুদা-দর্শনা, আলমডাঙ্গা ও জীবননগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মাঠে এখন খেজুর গাছ পরিচর্যার ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে দামুড়হুদা-দর্শনা ও আলমডাঙ্গা অঞ্চলে খেজুর গাছের উপস্থিতি বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই গাছ প্রস্তুত করতে চাইছেন গাছিরা। কারণ, সময়মতো গাছ পরিচর্যা ও সঠিকভাবে কাটতে না পারলে রস সংগ্রহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গাছিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একজন শ্রমিক প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি খেজুর গাছ কাটছেন। এ কাজে দৈনিক ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দেয়া হচ্ছে। শীতের মৌসুমে খেজুর গাছ কাটা ও রস সংগ্রহকে কেন্দ্র করে অনেক শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। বছরের এই সময়টায় গাছ পরিচর্যা, রস সংগ্রহ এবং গুড় তৈরির কাজই হয়ে ওঠে তাদের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম অবলম্বন।
দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা এলাকার গাছি রহিম খা বলেন, ‘এ বছর আগেভাগেই গাছ প্রস্তুত করছি। কয়েক দিন পর গাছ কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে। তাই এখন প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০টি গাছ কাটছি। একজন শ্রমিককে দৈনিক ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে। শীত বাড়লে রস সংগ্রহের কাজ শুরু হবে। এরপর সেই রস থেকে গুড় তৈরি করে স্থানীয় হাটসহ বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হবে।’
স্থানীয় গাছিরা জানায়, খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য শুধু গাছ কেটে দিলেই হয় না প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। গাছের উপযুক্ত অংশ নির্দিষ্ট কৌশলে পরিষ্কার ও কাটার মাধ্যমে রস আহরণের ব্যবস্থা করতে হয়। এরপর গাছের সাথে মাটির হাড়ি বেধে রাতভর রস সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় তরল গুড়, দানাদার গুড় ও পাটালি। মানসম্মত গুড় তৈরিতে রসের বিশুদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা ও সঠিক প্রক্রিয়ায় জ্বাল দেয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
শীতের সকালে টাটকা খেজুরের রস, রসের ক্ষীর-পায়েস আর নলেন গুড়ের স্বাদ গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যের সাথে জড়িয়ে আছে চুয়াডাঙ্গার মানুষের জীবন ও অর্থনীতি। মৌসুমে উৎপাদিত গুড় স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হয়। ফলে খেজুরের গুড় শুধু শীতের খাবার নয়, জেলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা জেলার উৎপাদিত খেজুরের গুড়ের মান ভালো হওয়ায় এর চাহিদাও ভালো। সেই চাহিদা পূরণে গাছিরা ইতোমধ্যে রস সংগ্রহের জন্য খেজুর গাছ পরিচর্যা ও কাটার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। জেলার উৎপাদিত গুড় স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়ে থাকে।’
তিনি জানান, গত মৌসুমে গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই হাজার ৭০০ টন এবং এবারও একই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছরের উৎপাদিত গুড়ের ব্যবসায়িক মূল্য ছিল প্রায় ৭৫ কোটি টাকা। তবে চলতি মৌসুমে প্রকৃত উৎপাদন ও আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ মৌসুম শেষে হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রস সংগ্রহ শুরুর সময় মূলত আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত শীত পড়লে গাছ থেকে রস সংগ্রহের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। তাই এখন গাছ পরিচর্যা ও প্রস্তুতির কাজ চললেও রস সংগ্রহ শুরুর নির্দিষ্ট সময় আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
চুয়াডাঙ্গার মাঠে মাঠে গাছিদের এই কর্মব্যস্ততা তাই কেবল শীতকে বরণ করার প্রস্তুতি নয়, এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে শত বছরের ঐতিহ্য, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং কোটি টাকার মৌসুমি বাণিজ্যের সম্ভাবনা। কয়েক সপ্তাহ পর গাছে গাছে মাটির হাড়ি ঝুলবে, ভোরে ভোরে সংগ্রহ হবে টাটকা রস। এরপর চুলায় জ্বাল দেয়া রসের মিষ্টি সুবাসে মুখর হয়ে উঠবে গ্রামের উঠান। সেই সুবাসের সাথে বাজারে ফিরবে চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী খেজুরের গুড় ও পাটালি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








