সব শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও কলেজের ১৪ লাখ আসন ফাঁকা থাকবে

শাহেদ মতিউর রহমান

এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়ের কারণে কলেজগুলোতে থাকবে শিক্ষার্থী সঙ্কট। অবশ্য শুরু থেকেই অনেকে আশঙ্কা করছেন একাদশ শ্রেণীতে ভর্তিযোগ্য আসনের তুলনায় পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় দেশের বিপুলসংখ্যক কলেজে শিক্ষার্থী সঙ্কট আরো প্রকট হতে পারে। বিশেষ করে জেলা-উপজেলার অপেক্ষাকৃত কম জনপ্রিয় এবং বেসরকারি কলেজগুলোতে এ সঙ্কটের প্রভাব বেশি পড়তে পারে। ঢাকা শিক্ষা  বোর্ড সূত্র জানিয়েছে- সব উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও  কলেজের প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার  আসন খালি থাকতে পারে।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। অর্থাৎ প্রায় ছয় লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। সামগ্রিক পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যেখানে ২০২৫ সালে ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। একই সাথে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও এক লাখ ৩৯ হাজার ৩২ থেকে কমে এক লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬-এ নেমেছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের কলেজ ও মাদরাসায় একাদশ শ্রেণীতে ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ। গত শিক্ষাবর্ষে এসব আসনের মাত্র ৫৮ দশমিক ৭ শতাংশে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। এবার পাসের হার আরো কমে যাওয়ায় শূন্য আসনের সংখ্যা আরো বাড়বে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সব উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসন খালি থাকতে পারে। সূত্র আরো জানায়,  মোট  আসনসংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ধরে বলা হয়েছে, ফলে খালি আসনের সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখেরও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ হিসাবের ভিত্তি ভিন্ন হলেও দুই হিসাবেই একটি বিষয় স্পষ্ট- একাদশ শ্রেণীতে আসনের তুলনায় শিক্ষার্থী উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
সঙ্কটের চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে
সংশ্লিষ্টরা জানান, কলেজের এই শিক্ষার্থী সঙ্কট  এবারই নতুন নয়। গত শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রমের তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা যায়, শেষ ধাপে দেশের ৩৭৬টি কলেজ একজন শিক্ষার্থীও পায়নি। দ্বিতীয় ধাপে এমন কলেজের সংখ্যা ছিল ৪১৩। কিছু প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পছন্দক্রমও দেয়নি। ফলে এবার পাসের হার কমে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্কট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ সঙ্কটের প্রভাব সব কলেজে সমান হবে না। রাজধানী ও বড় শহরের পরিচিত কলেজগুলোতে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের চাপ থাকবে। ঢাকার নামী কলেজগুলোর আসনসংখ্যা তুলনামূলক কম এবং এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির আগ্রহ বেশি। ফলে এক দিকে কিছু কলেজে ভর্তির প্রতিযোগিতা থাকবে, অন্য দিকে অনেক কলেজে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষার্থী পাওয়াই কঠিন হতে পারে।
জেলা-উপজেলায় বেশি ঝুঁকি
বোর্ড-ভিত্তিক আসনসংখ্যার মধ্যেও বড় পার্থক্য রয়েছে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ডে একাদশ শ্রেণীর আসন প্রায় চার লাখ ৬৭ হাজার ৯৪৯টি। রাজশাহী বোর্ডে তিন লাখ ৯২ হাজার ১৮২, দিনাজপুরে তিন লাখ ৩১ হাজার ২১০, কুমিল্লায় দুই লাখ ৬২ হাজার ৩২০ এবং যশোরে দুই লাখ ২১ হাজার ২২৯টি আসন রয়েছে। তুলনায় সিলেট বোর্ডে আসন এক লাখ ৪৩ হাজার ৪০৫টি এবং ময়মনসিংহে এক লাখ ৩৭ হাজার ৭০৭টি। শিক্ষার্থী সঙ্কট বাড়লে কলেজগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব বেসরকারি কলেজের আয় শিক্ষার্থীদের টিউশন ও ভর্তি ফি-নির্ভর, সেখানে কম ভর্তি মানে আয় কমে যাওয়া। এর প্রভাব শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিক্ষার পরিবেশে পড়ার ঝুঁকি থাকে। অন্য দিকে ফল বিপর্যয়ের কারণে এবার কলেজগুলোর মধ্যে শিক্ষার্থী পাওয়ার প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হতে পারে। ইতোমধ্যে বরিশাল অঞ্চলের কিছু কলেজে শিক্ষার্থী সঙ্কট মোকাবেলায় অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীদের অজান্তে একাদশ শ্রেণীর ভর্তির আবেদন করে রাখার অভিযোগও প্রকাশ পেয়েছে। বিষয়টি দেখিয়ে দিচ্ছে, শিক্ষার্থী সঙ্কট কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি অস্তিত্ব ও পরিচালনাগত চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ফলে ২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফল কলেজ-পর্যায়ে একটি বড় কাঠামোগত প্রশ্ন সামনে এনেছে- দেশে যখন লাখ লাখ আসন খালি থাকে, তখন এত বিপুলসংখ্যক কলেজ কেন শিক্ষার্থী সঙ্কটে পড়ে? শুধু নতুন কলেজ খোলা নয়, বিদ্যমান কলেজগুলোর আসন, শিক্ষার্থীসংখ্যা, শিক্ষক, অবকাঠামো ও শিক্ষার মান বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। না হলে প্রতি বছরই এক দিকে নামী কলেজে ভর্তির চাপ, অন্য দিকে বহু কলেজে শূন্য আসনের বিপরীত চিত্র আরো স্পষ্ট হতে পারে।
এবারো কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য কোনো বাছাই বা ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে না। কেবল শিক্ষার্থীর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে ভর্তি করা হবে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির আসনের ৭ শতাংশ কোটায় রাখা হয়েছে। কলেজগুলোর মোট আসনের বাকি ৯৩ শতাংশ সবার জন্য মেধার ভিত্তিতে উন্মুক্ত থাকবে। নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ফল প্রকাশের পর ভর্তি নিশ্চায়নের জন্য ১৮ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভর্তি নিশ্চায়ন না করলে নির্বাচন ও আবেদন বাতিল হবে। ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় পছন্দক্রম অনুযায়ী মাইগ্রেশনের ফল প্রকাশ।
একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি কার্যক্রম চলবে ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। সব শেষে একাদশ শ্রেণীর ক্লাস শুরুর কথা রয়েছে ২৪ সেপ্টেম্বর। নীতিমালা অনুযায়ী, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯৩ শতাংশ আসন মেধার ভিত্তিতে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এসব আসনে এসএসসি ও সমমানের ফলের ভিত্তিতে মেধাক্রম তৈরি করে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে। অবশিষ্ট ৭ শতাংশ আসনের মধ্যে ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলে-মেয়েদের জন্য এবং দুই শতাংশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীন দফতর-সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে।