যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ক্ষমতায় ভারসাম্য এনেছে

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এনেছে, যা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জন্য বাঁধভাঙ্গা বিজয় এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের প্রতি ব্যাপক চ্যালেঞ্জ বয়ে এনেছে। নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফলকে ‘নীল টেউ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, যা মার্কিন কংগ্রেসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে তুলে দিয়েছে। এর আগে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড   ট্রাম্পের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও কংগ্রেস তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
গতকাল হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের সব ক’টি আসনে এবং সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নি¤œ কক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের মোট ৪৩৫টি আসনের মধ্যে ২২৮টিতে জয়ী হয়েছে। নি¤œ কক্ষে জয়ী হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল ২১৮টি আসন। আর উচ্চ কক্ষে মোট ১০০টি আসনের মধ্যে ৫৪টি পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। সিনেটে বিজয়ী হতে প্রয়োজন হয় ৫১টি আসন। ডেমোক্র্যাটরা টেক্সাস, জর্জিয়া, ওহাইও, নেভাডা ও আইওয়ার গভর্নর পদসহ গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী আসনগুলো নিজেদের দখলে নিয়ে তাদের প্রভাব আরো প্রসারিত করেছে।
এই নির্বাচনে কিছু পরিবর্তন এসেছে, যা ঐতিহাসিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জেমস টালারিকো টেক্সাসে কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করে ৩৮ বছরের মধ্যে প্রথম ডেমোক্র্যাট হিসেবে সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন, অন্য দিকে জিনা হিনোজোসা রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করেছেন। সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট অ্যানি অ্যান্ডুস সিনেটে প্রায় তিন দশক ধরে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা একটি আসনে অভাবনীয় জয়লাভ করেছেন। মিশিগানে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে জয়লাভ করেছেন আবদুল আল-সাঈদ, যাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জেহাদিসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিলেন। জর্জিয়া থেকে নির্বাচিত হয়েছেন প্রথম নারী গভর্নর কিশা ল্যান্স বটমস।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এই মুহূর্তে মুদ্রাস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এটা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করেছে। এ কারণে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির বিপক্ষে ভোট বেড়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সূচনা করা ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি মূল্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সম্পদের ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। 
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল রিপাবলিকানদের যুদ্ধনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনের আগেই ইরান নীতিতে পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন। এখন ইরান যুদ্ধ সমাপ্তির জন্য নতুন চুক্তি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- দুই পক্ষের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাহী ক্ষমতা, পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রেসিডেন্টের হাতে থাকে। তবে প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন কংগ্রেসের হাতে থাকে। তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের একটা ভারসাম্যমূলক চুক্তি সই হতে পারে।
এ দিকে বিবিসি নিউজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের এই দলবদলের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল অর্থনৈতিক উদ্বেগ এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের প্রতি অসন্তোষ। দেশজুড়ে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বের সাথে নিত্যপণ্য ও জ্বালানির দামকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং রিপাবলিকানদের  নির্বাচনী প্রচারণার বাগাড়ম্বর প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোট এবং ইরানের মধ্যে সামরিক সঙ্ঘাত দেশের অভ্যন্তরে ভোগ্যপণ্যের মূল্য এবং জ্বালানির খরচের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে, যা ব্যালট বাক্সে সরাসরি তার দলের ক্ষতি করেছে। এ ছাড়া রিপাবলিকানদের প্রতি ল্যাটিনো এবং তরুণদের সমর্থনের ব্যাপক পতন হয়েছে। ২০২৪ সালে ট্রাম্পের উপভোগ করা ‘হিস্পানিক মধুচন্দ্রিমা’ উবে গেছে। এক্সিট পোলের তথ্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক ক্ষোভ রিপাবলিকানদের প্রতি ল্যাটিনোদের সমর্থনকে মাত্র ৩৩ শতাংশে নামিয়ে এনেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৪৬ শতাংশ। এটি টেক্সাস ও ফ্লোরিডার মতো রাজ্যগুলোর কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিকগুলোকে আবার ডেমোক্র্যাটদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপরেও পড়বে। আইন প্রণয়নে দেখা দিতে পারে অচলাবস্থা। বিভক্ত সরকারের কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ কর্মসূচি কার্যত স্থবির হয়ে পড়তে পারে। ভবিষ্যতে রিপাবলিকান-সমর্থিত যেকোনো কর ছাড়, ব্যয় বরাদ্দ বা অভিবাসন প্যাকেজ ডেমোক্র্যাটিক সংখ্যাগরিষ্ঠদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক বাধার সম্মুখীন হতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা এখন কংগ্রেসের প্রভাবশালী কমিটিগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে, যা তাদের ট্রাম্প প্রশাসন, নির্বাহী পদক্ষেপ এবং সম্ভাব্য দুর্নীতির বিষয়ে ব্যাপক তদন্ত শুরু করার জন্য সমন জারির ক্ষমতা দেবে। কিছু গোষ্ঠী ইতোমধ্যেই অভিশংসনের সম্ভাবনা উত্থাপন করেছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই পরাজয় ২০২৮ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রকেও নতুন করে সাজিয়ে দিয়েছে। ২০২৮ সালে যদি ক্ষমতাসীনরা একটি কার্যকর নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে চায়, তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ শীর্ষস্থানীয় রিপাবলিকানদের ওপর ট্রাম্পের রাজনৈতিক বোঝা থেকে কৌশলগতভাবে নিজেদের দূরে রাখার জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে।
অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্ভবত সেইসব ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে মনোযোগ দেবেন যেখানে নির্বাহী বিভাগের একতরফা ক্ষমতা রয়েছে। এর অর্থ হলো, তিনি ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য প্রশাসন আগ্রাসী বাণিজ্যনীতি, একতরফা শুল্ক বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বিধিনিষেধের ওপর আরো বেশি জোর দিতে পারেন। অন্য দিকে নতুন ডেমোক্র্যাটিক সংখ্যাগরিষ্ঠরা বিশেষ করে সঙ্ঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক সামরিক সম্পৃক্ততায় হোয়াইট হাউজের ব্যয়ের তীব্র বিরোধিতা করতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কড়া নীতি, বিশেষ করে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইস) নজিরবিহীন তৎপরতাও প্রভাব ফেলেছে। আইসের আগ্রাসী তৎপরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একটি ভীতির সঞ্চার হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো কম খরচে দক্ষ জনবল নিয়োগে বাধার সম্মুখীন হয়। এমনকি টেক্সাসের খামারগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল পাওয়া যাচ্ছিল না। আইসের হাতে কয়েকজন মার্কিন নাগরিকও নিহত হয়েছেন।