
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
শুক্রবারের জুমার খুতবা থেকে শুরু করে রাজপথের সমাবেশ, ইরানের ধর্মীয় নেতা ও সরকারি কর্মকর্তারা ক্রমেই দেশটির নেতৃত্বের প্রতি দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার থেকে সরে এসে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আহ্বান জানাচ্ছেন। একসময় কেবল কট্টরপন্থীদের অবস্থান হিসেবে বিবেচিত এই দাবি এখন ইরানের মূলধারার জনপরিসরে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে। এই পরিবর্তনের পরিণতি ইরানের জন্য সুদূরপ্রসারী হতে পারে। কারণ দেশটির সরকার কয়েক দশক ধরে দাবি করে আসছে- তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কুহদাশতের জুমার নামাজের ইমাম আলী সেপাহভান্দকে বহুল প্রচারিত একটি ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত হতে হবে, যাতে আমরা শক্তি নিয়ে অপরাধী আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়তে পারি ইনশা আল্লাহ।’ যুদ্ধের ময়দানে গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে সঙ্ঘাতে নিহত সামরিক কমান্ডারদের ছবিতে সাজানো নামাজের এক হলঘরে তার কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হওয়ার সাথে সাথে মুসল্লিরা স্লোগান দেন, ‘পারমাণবিক প্রতিরোধ আমাদের অবিচ্ছেদ্য অধিকার!’
ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে ক্রমবর্ধমান এই আহ্বান এমন এক সময়ে সামনে আসছে, যখন দেশটির নেতারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এমন যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হচ্ছে।
কয়েক দশক ধরে ইরানের কর্মকর্তারা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জারি করা ফতোয়া বা ধর্মীয় নির্দেশনার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে আসছেন। ওই ফতোয়ায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল। ইরানের ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দেয়া ওই নির্দেশনায় দেশটির সামরিক বাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসসহ (আইআরজিসি) সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছিল।
তবে একই সময়ে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গত কয়েক বছরে এমন কিছু আলামতের কথা জানিয়েছে, যেগুলো থেকে ধারণা করা হয়- ইরান ইউরেনিয়াম এমন মাত্রায় সমৃদ্ধ করছিল, যা পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার কাছাকাছি। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছিলেন, ফতোয়া থাকা সত্ত্বেও ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই হুমকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বিশ্বশক্তি ইরানের সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। ওই চুক্তির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার কথা ছিল। তবে তিন বছর পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, আয়াতুল্লাহ খামেনির কৌশল ছিল ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাক্সক্ষা সম্পর্কে অস্পষ্টতা বজায় রাখা। এর মাধ্যমে তিনি আশা করেছিলেন, ইরানকে সরাসরি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত না করেই সম্ভাব্য হামলা থেকে দেশটিকে রক্ষা করা যাবে।
কিন্তু এই কৌশল ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চালানো দু’টি যুদ্ধ ঠেকাতে পারেনি। ২০২৫ সালের জুন থেকে শুরু হওয়া ওই সঙ্ঘাতগুলোর একটিতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে খামেনি নিজেও নিহত হন। ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক এবং স্বাধীন আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম আমওয়াজ মিডিয়ার সম্পাদক মোহাম্মদ আলী সাবানি বলেন, ‘তিনি (আলী খামেনি) এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন, যেখানে ইরান পুরোপুরি পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকও ছিল না, আবার সেই অবস্থান থেকে বেরিয়েও আসেনি। ফলে যে বোমা তাদের ছিল না, সেটির জন্যই তাদের মূল্য দিতে হয়েছে।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








