
নিজস্ব প্রতিবেদক
ওয়াই-আকৃতির দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থাকে প্রাধান্য দিয়ে দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তিনি এ নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেসসচিব শাহরিয়ার পামির এ কথা জানান।
তিনি জানান, বৈঠকে জানানো হয়, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু ও দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে। আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর সেতু দু’টির অবস্থান, নকশা ও প্রকল্প ব্যয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বৈঠকে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে ওয়াই-আকৃতির সংযোগ ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ছাড়া দ্বিতীয় যমুনা সেতুর ক্ষেত্রে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টি উঠে আসে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে রাজধানীর যোগাযোগ আরো সহজ হবে। পাশাপাশি মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং বেনাপোল ও দর্শনা স্থলবন্দরের সাথে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
এ ছাড়া বৈঠকে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। শুষ্ক মৌসুমে পানির সঙ্কট মোকাবেলা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নদীর প্রবাহ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ব্যারাজের মাধ্যমে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বৈঠকে এ ছাড়াও প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন, জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়ও উঠে আসে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেসসচিব।
বৈঠকে সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো: রাজিব আহসান, অর্থসচিব ড. মো: খায়েরুজ্জামান মজুমদার, সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ, পানিসম্পদ সচিব ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিন, সড়কসচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, পানিসম্পদ অতিরিক্ত সচিব মহা: এনামূল হক, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের পরিচালক (যুগ্মসচিব) মো: ভিখারুদ্দৌলা চৌধুরী, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো: মনিরুজ্জামান, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী মো: আবুল হোসেন এবং পদ্মা ব্যারাজের প্রকল্প পরিচালক মাহমুদ হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সোলার এক্সপো উদ্বোধন : এদিকে গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ সোলার এক্সপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, কুইক রেন্টালের নামে লুটপাটের পরিবর্তে অবশ্যই সাশ্রয়ী পন্থায় বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব। তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে জনগণের ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার সচেতন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
এতে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) যৌথভাবে প্রথমবারের মতো এ সোলার এক্সপোর আয়োজন করে। বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর এবারের মূল প্রতিপাদ্য ‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়াই’।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে জনগণের ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার সচেতন। ফলে চলমান জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তি পর্যালোচনা করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ- এসব বিষয়গুলো নিয়ে সরকার একযোগে কাজ করছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এরই অংশ হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎচাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি মানুষের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে অর্থায়ন সহজ করতে সরকার প্রাথমিকভাবে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করেছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যেন শুধু অর্থের অভাবে পিছিয়ে না পড়েন সরকার সেটি নিশ্চিত করতে চায়। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু একটি সম্ভাবনাময় খাতই নয় বরং এক অনিবার্য বাস্তবতা।
দেশের জ্ঞানের প্রতিযোগিতা চলমান রাখার প্রত্যাশা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ কয়েকটি বিষয়ে কয়েকজন তাদের ইনোভেটিভ আইডিয়া উপস্থাপন করে পুরস্কৃত হলেন। আগামীর বাংলাদেশে এভাবে জ্ঞানের প্রতিযোগিতা চলুক। চলুক নিত্য নতুন উদ্ভাবনী আইডিয়ার প্রতিযোগিতা। একটি ইনোিেটভ আইডিয়া বাংলাদেশের জন্য হতে পারে গেইম চেঞ্জিং। তিনি বলেন, ‘অর্থের অভাবে যাতে তারুণ্যের কোনো উদ্ভাবনী আইডিয়া হারিয়ে না যায় সেটি নিশ্চিত করতে বর্তমান চলতি বাজেটে ‘স্টার্ট আপ’ এর জন্য বছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, দেশটাকে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। ফলে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানি প্রক্রিয়ায় মারাত্মক বিঘœ সৃষ্টি হওয়ার কারণে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশেকে সঙ্কট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরেও বিদ্যুতের প্রায় সমপরিমাণ চাহিদা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ডিজেলের মজুদ বাড়িয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লার সরবরাহ ও মজুদ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিকল্প সরবরাহকারীদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যেই ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিগত সরকারগুলোর ব্যর্থতা কিংবা ভূমিকা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করে সময়ক্ষেপণের পরিবর্তে আগামী দিনগুলোতে কিভাবে বিদ্যুৎচাহিদা মেটানো যায়, বাসাবাড়ি এবং ব্যবসা বাণিজ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, বর্তমান সরকারের কাছে সেটিই প্রধান অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে সরকার ইতোমধ্যেই ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন নীতি সহায়তা, কর ও শুল্কসুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা নিয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই সরকার জাতীয় গ্রিডে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎযুক্ত করতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের প্রত্যাশা, সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ছাদগুলো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হবে। নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ সিস্টেম থেকে নিজস্ব ব্যবহারের পর যারা বাড়তি সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে সক্ষম হবেন ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে প্রণোদনাসহ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে ক্রয় করবে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে সম্পৃক্ত সার্ভিস প্রোভাইডারদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পর সেটি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কি না এবং গ্রাহক প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, অনুগ্রহপূর্বক সেদিকে লক্ষ রাখবেন। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহবান থাকবে, দয়া করে আপনারা উদ্যোক্তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনার প্রতি আন্তরিক থাকুন ।
কৃষিতেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, কৃষকদের সেচের জন্য সরকার ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। সরকার পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্পকে সৌরচালিত সেচপাম্পে রূপান্তর করার পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, পরিবেশ সংরক্ষিত হবে এবং জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎও সাশ্রয় হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ‘স্ফুরণ : টেকসই জ্বালানি উদ্ভাবনের খোঁজে ২০২৬’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। এর আগে সোলার সিস্টেম নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র উপস্থাপন করা হয়। এ সময়ে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, অর্থসচিব ড. মো: খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং বিদ্যুৎসচিব মিরানা মাহরুখ। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








