শেখ হাসিনা-আসাদুজ্জামানের সম্পদ নিতে স্বরাষ্ট্রে চিঠি
শেখ হাসিনা-আসাদুজ্জামানের সম্পদ নিতে স্বরাষ্ট্রে চিঠি।
  • হলফনামায় শেখ হাসিনার সম্পদ ৪ কোটি ৩৪ লাখ
  • আসাদুজ্জামানের ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা
     

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়।
গতকাল মঙ্গলবার পাঠানো চিঠিতে দুই দণ্ডিতের সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে সতর্ক করা হয়েছে, দ্রুত সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণে নেয়া না হলে তারা এসব সম্পদ বিক্রি বা অন্যভাবে হস্তান্তর করে ট্রাইব্যুনালের বাজেয়াপ্তকরণের আদেশ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করতে পারেন।
চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম চিঠি পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। চিফ প্রসিকিউটরের সই করা চিঠির বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব এবং আইনমন্ত্রীর একান্ত সচিবকে অবগত করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর একটি মামলার রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই রায়ে তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিলিবণ্টনের আদেশ দেয়া হয়। সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অবিলম্বে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেয়া প্রয়োজন। তাদের সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী শহীদ পরিবার ও ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে জমা দেয়া হলফনামায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান তাদের সম্পদের বিবরণ দিয়েছিলেন। ওই হলফনামা অনুযায়ী, শেখ হাসিনার নামে ঘোষিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য ছিল চার কোটি ৩৪ লাখ টাকা। আসাদুজ্জামান খানের ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এসব মূল্য হলফনামায় উল্লেখ করা অর্জনকালীন বা ঘোষিত মূল্য; বর্তমান বাজারমূল্য নয়।
শেখ হাসিনার সম্পদ
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের হাতে নগদ অর্থ দেখিয়েছিলেন ২৮ হাজার ৫০০ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার জমা ছিল প্রায় দুই কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং ৫৫ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত বা এফডিআরের তথ্য দিয়েছিলেন তিনি।
হলফনামায় তিনটি মোটরগাড়ির মালিকানা দেখিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এর মধ্যে একটি উপহার হিসেবে পাওয়া, যার মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। অন্য দু’টি গাড়ির দাম দেখানো হয়েছিল ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তার নামে সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর মূল্য দেখানো হয়েছিল ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। আসবাবের মূল্য ছিল সাত লাখ ৪০ হাজার টাকা।
শেখ হাসিনা নিজের নামে ১৫ দশমিক ৩ বিঘা কৃষিজমির তথ্য দিয়েছিলেন। এর মধ্যে কেনা জমির অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয়েছিল ছয় লাখ ৭৮ হাজার টাকা। জমিগুলো গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ সদর, গাজীপুর ও রংপুরে রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়। গাজীপুর শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে মৌচাকের তেলিরচালা এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের একটি বাগানবাড়ি রয়েছে। বাংলাদেশ স্কাউট প্রশিক্ষণকেন্দ্রের পূর্ব পাশে এই সম্পত্তির অবস্থান।
স্থানীয় ভূমি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০ সালের দিকে স্থানীয় এক ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ওই জমি লিখে দিয়েছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিক হন শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা। পরে তারা জমির কিছু অংশ সন্তানদের নামে লিখে দেন। এর ফলে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ এবং শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকও জমির মালিক হন। নথিপত্রে জমির পরিমাণ ২৯৭ শতক বা প্রায় ৯ বিঘা।
হলফনামায় শেখ হাসিনার নামে ঢাকার পূর্বাচলে একটি প্লটের তথ্য রয়েছে। এর মূল্য দেখানো হয়েছিল ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার নিজের নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ, ছোট বোন শেখ রেহানা এবং রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকের নামে ১০ কাঠা করে প্লট বরাদ্দের তথ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে পরিবারের ছয় সদস্য ৬০ কাঠা জমি পেয়েছেন।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের মাধ্যমে এসব প্লট বরাদ্দ নেয়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা চলছে। হলফনামায় শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তিনতলা ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতক জমির মালিকানা দেখিয়েছিলেন। জমিটির অর্জনকালীন মূল্য উল্লেখ করা হয়েছিল পাঁচ লাখ টাকা।
শেখ হাসিনার জমির পরিমাণ নিয়ে এর আগে অসঙ্গতির অভিযোগ তুলেছিল দুদক। সংস্থাটি ২০২৫ সালের ২২ মে এক ব্রিফিংয়ে জানায়, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের নামে ৬ দশমিক ৫০ একর জমির তথ্য দিয়েছিলেন। ওই জমির কেনার সময়কার মূল্য দেখানো হয়েছিল এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, যাচাই করে শেখ হাসিনার নামে ২৮ একর ৪১ শতকের বেশি স্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সংস্থাটি নির্বাচন কমিশনকে চিঠিও দিয়েছিল। অন্যদিকে, ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটির মালিকানা শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে রয়েছে বলে ভূমি কার্যালয়ের সূত্র জানিয়েছে। শেখ হাসিনার বাসভবন ধানমন্ডির সুধা সদনের মালিকানা তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের নামে।

Advertisement