পোশাকশ্রমিক আন্দোলন, ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি, গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভ, শ্রমিক আন্দোলনে সহিংসতা, আওয়ামী লীগের নাশকতার পরিকল্পনা, শিল্প মালিকদের অর্থায়ন, হকারদের আন্দোলন, গাজীপুরে কারখানা বন্ধ
  •  অর্থের জোগান দিচ্ছেন সমর্থক শিল্প মালিকরা
  •  পোশাকশ্রমিকের পর আন্দোলনে নামছে হকাররা
  •  গোয়েন্দা তথ্য পেয়েও গুরুত্ব দেয়নি সরকার  
     

ডিসেম্বর ঘিরে নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীদের নভেম্বর মাসজুড়ে সঙ্ঘাত-সহিংসতার পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে দেয়ার পরও তেমন প্রস্তুতি নেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে সীমান্তের ওপারে কলকাতায় বসে নাশকতার ছক তৈরি করার বিষয়েও সরকারের কাছে স্পষ্ট তথ্য ছিল। এরপরও আগাম প্রস্তুতি না থাকায় গত রোববার থেকে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে শুরু হওয়া পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরে সহিংস রূপ নেয়। সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করতে আন্দোলনে ঢুকে পড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীরা। এর নেপথ্যে শক্তি ও অর্থের জোগানদাতা খোদ শিল্পমালিকরা। গাজীপুর অঞ্চলে শিল্প কারখানার ২৬৭ জন মালিক আওয়ামীপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো কোনো ভূমিকা না থাকায় বর্তমানে খেসারত দিতে হচ্ছে।

Advertisement

গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, এমপিসহ প্রভাবশালী নেতারা বিদেশে বসে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। অনেকেই কলকাতায় বসে নাশকতার ছক আঁটছেন। দলটির প্রভাবশালী নেতারা নাশকতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে উসকানি  দিচ্ছেন পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোতে বসে। এরই মধ্যে তাদের দেড় শতাধিক নেতাকর্মী শ্রমিক আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হয়ে উসকানি দিয়ে নাশকতা সৃষ্টি করেছে বলে প্রমাণ মিলেছে।ৎ

তবে গোয়েন্দাদের এসব তথ্য সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে গেলেও আগে তা আমলে নেয়া হয়নি। ঘটনা ঘটার পর সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে টনক নড়েছে।

সোমবার (২ নভেম্বর) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন জোগানো হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, এই অস্থিরতার সাথে কিছু শিল্প মালিকও জড়িত। এদের কেউ কেউ আগের সরকারের আমলে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ছিলেন। আন্দোলনে ঢুকে পড়া মুখোশধারীদের পাশাপাশি অর্থদাতাদেরও কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এ দিকে সম্প্রতি উচ্ছেদ হওয়া হকারদের একটি অংশও আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র। পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন শেষ হওয়ার পর বৃহৎ আকারে রাজধানীর বিভিন্নস্থানে সহিংস কর্মসূচির প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এই আন্দোলন জোরদার করতে নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা এরই মধ্যে নাশকতার ছক তৈরি করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে।

গতকাল হকার্স সমিতির পক্ষ থেকে ৭০০ থেকে ৮০০ হকার মানববন্ধন করেছে। পরে তারা গুলশান-২ এ উত্তর সিটি করপোরেশন অফিসে স্মারকলিপি জমা দেন। পাশাপাশি আওয়ামীপন্থী ব্যবসায়ীরাও সক্রিয় হয়ে সহিংসতাকারীদের পেছনে অর্থদাতা হিসেবে কাজ করছে। মদদ দিচ্ছেন খোদ গার্মেন্ট মালিকরাও।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এরই মধ্যে ঢাকায় বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে। তাদের টার্গেট নভেম্বরজুড়ে ব্যাপক নাশকতা-অস্থিরতা এবং পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে টার্গেট কিলিংয়েরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অনেক নেতাকর্মী এরই মধ্যে কলকাতা থেকে এসে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রেকি করেছেন। এ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট করা হচ্ছে বলেও গোয়েন্দা সূত্র জানায়।

দুই দিনে রণক্ষেত্র : গত রোববার সকাল থেকে মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরে একযোগে কর্মবিরতি ও সড়ক অবরোধ শুরু হয়। মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। গাজীপুরের চন্দ্রায় পুলিশ বক্সে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়। কালিয়াকৈরে ঝুটের একটি গুদামে আগুন দেয়া হয়। সংঘর্ষের কারণে মিরপুরের একটি মেট্রো স্টেশন কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হয়। এরমধ্যে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭টি এবং গাজীপুরে শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। ওইদিন পুলিশ মিরপুরে ২৯ জন ও গাজীপুরে ২০ জনকে গ্রেফতার করে।

গতকাল সোমবারও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। কোনাবাড়ী, সফিপুর, মৌচাক ও চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকরা মহাসড়কে অবস্থান নেন। পুলিশ ও বিজিবির সাথে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। আন্দোলনকারীদের ছোড়া ইটের আঘাতে বিজিবির এক সদস্য গুরুতর আহত হন। দু’টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে এবং ৩০ জনকে আটক করা হয়। গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি ও ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন করা হয়েছে। দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। দুপুর ১টার পর শ্রমিকরা সরে গেলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

দাবি কী, সরকার কী করেছে : শ্রমিকদের মূল দাবি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। এর পাশাপাশি তারা কালো তালিকা বন্ধ, অন্যায়ভাবে ছাঁটাই বন্ধ এবং বকেয়া বেতন পরিশোধ চান। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা।

সরকার গত রোববার ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে আছেন বিজিএমইএ পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন, শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।

শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, শুক্রবার শ্রমিক নেতাদের সাথে পাঁচ ঘণ্টার আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত হয়। আগামী ৭ তারিখের মধ্যে বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তার ভাষ্য, এ অবস্থায় আন্দোলনে থাকার কারণ নেই।

তবু রাস্তা শান্ত হয়নি। শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, ৩০ হাজার টাকা তাদের দীর্ঘদিনের দাবি। শ্রমিকদের একটি অংশের দাবি, তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছেন, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করছে বহিরাগতরা।

গ্রেফতারদের পরিচয়, পুলিশের দাবি : পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি- শ্রমিকদের আড়ালে সুপরিকল্পিতভাবে সহিংসতা চালানো হয়েছে। মিরপুর থেকে গ্রেফতার ১১ জন এবং গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে গ্রেফতার নয়জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বলে পুলিশ জানিয়েছে। কালিয়াকৈরে ছাত্রলীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদকের নেতৃত্বে মিছিলের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঢাকার বাইরে থেকে লোক এনে মিরপুর ও আশুলিয়ায় জড়ো করা হয়েছিল, যাদের কাজ ছিল শ্রমিকদের উসকানি দেয়া এবং আন্দোলনকে সহিংস করা।

মালিকদের ভূমিকা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোমবার সচিবালয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতাদের সাথে বৈঠক শেষে বলেন, কারা অস্থিরতার পেছনে রয়েছে তা এখন স্পষ্ট হচ্ছে। তিনি মালিকদের কারখানা চালু রাখার আহবান জানান এবং আতঙ্কে হঠাৎ কারখানা বন্ধ না করতে বলেন।

এ দিকে মালিকপক্ষও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি বলেছেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও সহিংসতা চললে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারায় কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন তারা।

সংগঠনটির তথ্য মতে, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৫২৯টি কারখানা তখন বন্ধ ছিল।

শিল্প পুলিশের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু টঙ্গীর কারখানা মালিকদের মধ্যে ২৬৭ জন আওয়ামীপন্থী, বিএনপিপন্থী মাত্র পাঁচজন এবং রাজনীতির বাইরে ১১৫ জন। গাছা, বাসন, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুরের চিত্রও প্রায় একই বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এদের অনেকে এখনো গোপনে আওয়ামী লীগকে আর্থিক জোগান দিচ্ছেন। সরকারের হাতে থাকা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রফতানি বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যাহত করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।

মামলা-গ্রেফতার : পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার নয়া দিগন্তকে বলেন, মিরপুরে ট্রাফিক বক্স ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সোমবারও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের যাচাই-বাছাই চলছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা ও ট্রাফিক বক্স ভাঙচুরের অভিযোগে পল্লবী থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলার বাদি পুলিশ। প্রতিটি মামলায় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার ব্যক্তিকে অজ্ঞাত পরিচয় আসামি করা হয়েছে। তিন মামলায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়াও কাফরুল থানায় আরো একটি মামলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ দিকে ডিবি পুলিশ বলছে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে রাজধানীর মিরপুরে সহিংসতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাদের একটি অংশ অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছিল। আন্দোলনের আড়ালে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনাও ছিল তাদের।

নেপথ্যে শিল্প মালিকরা : গোয়েন্দাদের তথ্যে আগেই জানা গেছে গাজীপুরের টঙ্গীতে শিল্প কারখানার ২৬৭ জন মালিক আওয়ামীপন্থী। টঙ্গীর বিসিক, গাছা, বাসন, কোনাবাড়ি, কাশিমপুরসহ অন্যান্য এলাকায় আওয়ামীপন্থী শিল্প মালিকরা গোপনে দলকে আর্থিক জোগান দিচ্ছেন। শিল্প পুলিশের প্রতিবেদনেও এমনটি উঠে এসেছে। এ ছাড়া আওয়ামীপন্থী ঝুট ব্যবসায়ীদের বাঁচিয়ে রাখতে খোদ বিএনপি নেতারাও ভূমিকা পালন করছেন। সরকারের পট পরিবর্তনের পর ঝুটসহ অন্যান্য ব্যবসা দখলে বিএনপির অনেকে হানা দিলেও মূলত আওয়ামীপন্থী মালিকদের কারণে বেশির ভাগই সফল হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় গত রোববার থেকে পোশাক শ্রমিকদের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।