জনগণের ভোটের রায় বাস্তবায়নে জনগণের কাছেই ফিরে যাচ্ছে বিরোধীরা

খালিদ সাইফুল্লাহ 

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে আবারো জনগণের কাছে যাচ্ছে ১১ দলীয় ঐক্য। প্রায় ৭২ ভাগ জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে ভোট দেয়ার পরও সরকার সে দাবি বাস্তবায়ন না করায় আবার তাদের কাছেই অভিযোগ জানাতে জনসম্পৃক্ততার কর্মসূচি বেছে নিয়েছে বিরোধীরা। সে জন্য ঢাকা-চট্টগ্রামে সফলতার পর এবার নিজেদের ঘাঁটি রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করতে যাচ্ছে তারা।  
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সঙ্কট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন; দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি রোধ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে সঙ্কীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে লংমার্চের কর্মসূচি দিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য। 
এ দিন সকাল ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে উদ্বোধনী সমাবেশ শেষে লংমার্চের বহর রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করবে। পথে গাজীপুর বাইপাস, টাঙ্গাইলের নগর জালপাই, সিরাজগঞ্জের হাঁটিকুমরুল, বগুড়ার চারমাথা, গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পাঁচটি পথসভা হবে। সবশেষ রংপুর জিলা স্কুল মাঠে গিয়ে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানসহ জোটের শীর্ষ নেতারা অংশ নেবেন। 
এ কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে ১১ দলীয় ঐক্য। লংমার্চ কর্মসূচিতে ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে রংপুর জিলা স্কুল পর্যন্ত মানবপ্রাচীর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে তারা। এ জন্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় জেলা, মহানগরী পর্যায়ে একাধিক প্রস্তুতি বৈঠক করেছে জামায়াতসহ জোটের শরিক দলগুলো। অঞ্চলভিত্তিক সভাও করেছে জামায়াতে ইসলামী, যেখানে কেন্দ্রীয় নেতারা বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সবশেষ গত রোববার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট শাখার নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছে দলটি। 
নেতারা বলছেন, এবারের লংমার্চের রুট, অর্থাৎ ঢাকা থেকে রংপুর অঞ্চলে জামায়াতের জনসমর্থন তুলনামূলক বেশি। সেই জনসমর্থন কাজে লাগাতে চায় দলটি। যেহেতু আপাতত সরকারকে বেকায়দায় ফেলার অর্থাৎ হরতাল-অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি দেবে না; তাই জনগণের উপস্থিতি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে চায় জামায়াত। নেতাদের ভাষ্য নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় দাবি আদায় করবেন তারা। 
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম নয়া দিগন্তকে বলেন, লংমার্চের দিন মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে রংপুর জিলা স্কুল পর্যন্ত মানবপ্রাচীর গড়ে তোলা হবে। সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সব শাখায় খবর নিয়ে দেখেছি, মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে রংপুর জিলা স্কুল পর্যন্ত লোকে-লোকারণ্য হয়ে যাবে। দৃশ্যমান সব জায়গায় আমাদের নেতাকর্মীরা দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন নিয়ে অবস্থান করবেন। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার, মোড় এমন কোনো জায়গা বাদ থাকবে না, যেখানে লংমার্চের সমর্থনে লোক থাকবে না। তিনি আরো বলেন, আমরা আশা করছি আগের লংমার্চের চেয়ে বেশি লোকসমাগম হবে। শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি আদায় করতেই আমরা মাঠে নেমেছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি চলতে থাকবে। 
১৪ জেলায় প্রস্তুতি 
রংপুরের কর্মসূচি ঘিরে শুধু মহানগর ও জেলা পর্যায়েই নয়, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। জামায়াতের রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের প্রস্তুতি সভায় রংপুর ও দিনাজপুরের পাশাপাশি নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের জেলা পর্যায়ের নেতারা অংশ নেন। তা ছাড়া গত মঙ্গলবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রস্তুতি সভায় গাজীপুর, রংপুর, বগুড়া, গাইবান্ধা, টাঙ্গাইল, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, পাবনা অঞ্চলের নেতারা অংশ নেন। 
দলীয় নেতারা বলছেন, এসব জেলা থেকে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের রংপুরের কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। ফলে ১৯ সেপ্টেম্বর লংমার্চ কর্মসূচিতে বড় ধরনের জনসমাগম ঘটবে। বিশেষ করে মানবপ্রাচীর তৈরি করতে শাখাগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তা ছাড়া কর্মসূচি সার্বিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতিসভা, গণসংযোগ, প্রচারপত্র বিলি ও প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ এবং ১১ দলীয় ঐক্যের স্থানীয় নেতাদের সাথে নিয়ে প্রস্তুতির জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন নেতারা। 
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, বিভিন্ন জেলায় প্রস্তুতি সভার পাশাপাশি আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে বর্ধিতসভা করেছি। লংমার্চের বিষয়ে তৃণমূল নেতাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এলাকাভিত্তিক পরিবহন মালিক ও প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা, অনলাইন ও অফলাইনে প্রচারণার বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এগুলো ফলোআপ করার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়েছে। সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে আমরা সবার সহযোগিতা চাই। 
ধারাবাহিক কর্মসূচি ১১ দলের  
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে জোটের ঘোষিত দাবিগুলো নিয়ে দেশব্যাপী জনমত গড়ে তোলার পাশাপাশি বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্য রয়েছে ১১ দলীয় ঐক্যের। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা টু চট্টগ্রাম লংমার্চ করেছে সরকারবিরোধী এ জোট। তাতে ব্যাপক সাড়া পাওয়ার পর আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ এবং ১০ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা-সিলেট লংমার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ঢাকায় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। প্রথমে ১৪ নভেম্বর মহাসমাবেশের তারিখ ঘোষণা করলেও তা পরিবর্তনের কথা জানায় জামায়াত। তবে এখনো সেই তারিখ আবার ঘোষণা করেনি দলটি।