
শাহ আলম নূর
উচ্চ সুদহার, গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট ও অনিশ্চয়তায় আগ্রহ কম উদ্যোক্তাদের
আগেই ঋণখেলাপি হওয়ায় নতুন প্যাকেজের ঋণ পাচ্ছে না অনেকে
চার মাসে বন্ধ কারখানার তহবিলে ব্যয় মাত্র ১,২৫০ কোটি টাকা
স্থবির অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ও বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজে চার মাস পরও প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না। বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনের জন্য নির্ধারিত ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে গত ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র এক হাজার ২৫০ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের মাত্র ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্ধ কারখানার বড় অংশই ব্যাংকের খেলাপি গ্রাহক হওয়ায় নতুন ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছে।
গত ২৩ মে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ-২০২৬’ নামে এই ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে ৪১ হাজার কোটি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৯ হাজার কোটি টাকা দেয়ার কথা। প্যাকেজের সবচেয়ে বড় অংশ ২০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত পুনরুজ্জীবনের জন্য। বাকি অংশের মধ্যে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ১০ হাজার কোটি, সিএমএসএমই খাতে পাঁচ হাজার কোটি, রফতানি বহুমুখীকরণে তিন হাজার কোটি এবং উত্তরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে আরো তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চারটি স্কিমে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ হয়েছে পাঁচ হাজার ৬৭৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক। তবে বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনের স্কিমে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ তুলনামূলক অনেক কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বন্ধ শিল্পকারখানার একটি বড় অংশ ইতঃমধ্যে ব্যাংকের ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছে, ফলে তাদের সরাসরি নতুন ঋণ দেয়া ব্যাংকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে খেলাপিমুক্ত হয়ে ব্যবসা চালানোর সক্ষমতা দেখাতে পারলে নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে জানান তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর বন্ধ কারখানাগুলো প্রণোদনার আওতায় ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, যে উদ্যোক্তাদের জন্য মূলত তহবিল গঠন করা হয়েছে, তাদের বড় অংশ যদি খেলাপি ঋণের কারণে বাইরে থেকে যান, তাহলে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কতটা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরনো ঋণের সমাধান না করে শুধু নতুন ঋণের ব্যবস্থা করলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা বঞ্চিত হতে পারেন, আবার ভুলভাবে ঋণ দিলে ভবিষ্যতে নতুন খেলাপি ঋণ তৈরির ঝুঁকিও বাড়বে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ছয় হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চ শেষে এই পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, অর্থাৎ তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। একই সাথে জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি। উচ্চ সুদহার, গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তাদের ঋণ নেয়ার আগ্রহ কমেছে বলে জানা গেছে।
প্যাকেজ ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এটিকে ‘উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার’ কর্মসূচি আখ্যা দিয়ে প্রায় ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশার কথা জানিয়েছিলেন।
ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারদের মূল্যায়ন
বিল্ডের চেয়ারম্যান ও ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান নয়া দিগন্তকে বলেন, শুধু কম সুদের ঋণ দিলেই বন্ধ শিল্প চালু করা সম্ভব নয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, বাজার সঙ্কট, পুরনো ঋণের চাপ বা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে কারখানা বন্ধ হলে নতুন ঋণ তার স্থায়ী সমাধান দেবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা আছে এমন প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে ঋণ দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম নয়া দিগন্তকে বলেন, এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, কার্যকর তদারকি ও অর্থের যথাযথ ব্যবহারের ওপর। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন সতর্ক করে বলেন, কম সুদে ঋণ পেলে ব্যবসায়ীদের তারল্য বাড়বে ঠিকই, তবে তারল্য বাড়া আর সঠিক বিনিয়োগ এক বিষয় নয়। নতুন অর্থায়ন যেন ভবিষ্যতে নতুন খেলাপি ঋণ তৈরি না করে, সেদিকে নজর রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২০ সালে করোনাকালে বিভিন্ন খাতে মোট এক লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার ২৮টি প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়া হয়েছিল। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এসব তহবিলের কিছু ক্ষেত্রে অনিয়মের তথ্য উঠে আসে, যেখানে কেউ কম সুদের অর্থ দিয়ে পুরনো বেশি সুদের ঋণ পরিশোধ করেন, আবার কেউ শেয়ারবাজার বা আবাসন খাতে অর্থ সরিয়ে নেন। নতুন প্যাকেজে এমন অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর নজরদারি ও অর্থ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্যাকেজের আরেকটি দিক হলো, শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর নির্ভর না করে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক ও আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংককেও অর্থায়নের সুযোগ দেয়া হয়েছে, যাদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে মোট আট হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পিকেএসএফ পাবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল কাদের জানান, তাদের ঋণ ফেরতের হার ৯৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এ ছাড়া ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের জন্য সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, ব্র্যাক, সিটি, যমুনা, ডাচ্-বাংলাসহ ১৭টি ব্যাংকের সাথে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, প্যাকেজের অর্থ যেন নির্দিষ্ট খাতের বাইরে না যায়, সে জন্য তথ্যভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বন্ধ কারখানা চালুর ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার সক্ষমতা, কারখানার প্রকৃত অবস্থা, পুরনো ঋণের অবস্থা ও উৎপাদন শুরুর পর বাজার সম্ভাবনা বিবেচনায় নেয়ার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবে সঙ্কটে পড়া ও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাসম্পন্ন উদ্যোক্তাদের দ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে নতুন খেলাপি ঋণের বোঝা তৈরি এড়ানো- এই দু’টিই এখন সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ। সঠিক উদ্যোক্তা বাছাই ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে এই তহবিল বন্ধ কারখানায় উৎপাদন ফেরাতে পারে বলে মনে করছেন তারা, তবে যাচাই দুর্বল হলে এই তহবিলই ভবিষ্যতে নতুন খেলাপি ঋণের উৎস হয়ে উঠতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।







