তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বাড়ার শঙ্কা দেড় লাখ কোটি টাকা

আশরাফুল ইসলাম

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত নীতি সহায়তার আওতায় ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের পর নির্ধারিত ছাড়কাল- গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগেই কিছু ঋণ হিসাবকে ‘বিশেষ নজরদারি হিসাব’ হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতাদের অভিযোগ, নতুন পরিশোধসূচি অনুযায়ী কিস্তি পরিশোধ শুরুর সময় এখনো আসেনি; অথচ তার আগেই কোনো কোনো ব্যাংক ঋণ হিসাবকে ঝুঁকিপূর্ণ বা বিশেষ নজরদারির তালিকায় ঠেলে দিচ্ছে।
একজন উদ্যোক্তার দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত নতুন ঋণ পরিশোধসূচি অনুযায়ী তার ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হতে এখনো প্রায় এক বছর বাকি। কিন্তু এরই মধ্যে ব্যাংক হিসাবটিকে বিশেষ নজরদারি হিসাব হিসেবে দেখিয়েছে। তার প্রশ্ন- যে কিস্তি এখনো পরিশোধযোগ্যই হয়নি, সেটিকে কেন্দ্র করে ঋণ হিসাবের ঝুঁকি নির্ধারণ কতটা যৌক্তিক?
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে বিশেষ নজরদারি হিসাব বা এসএমএ হিসেবে চিহ্নিত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এসব হিসাবের বড় অংশ পরবর্তী সময়ে খেলাপিতে পরিণত হলে আগামী সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাত লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, শুধু তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
গ্রেস পিরিয়ডের আগেই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিগত সময়ে ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক নানা কারণে অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংকঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়েন। বিশেষ করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়া, নগদ অর্থপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং বাজার পরিস্থিতির অবনতির কারণে অনেক ঋণ হিসাব খেলাপিতে পরিণত হয়। এদের একটি অংশ ছিল অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি।
ব্যবসায়-বাণিজ্যে এসব উদ্যোক্তাকে পুনরায় সক্রিয় করা এবং ব্যাংকিং খাতে আটকে থাকা অর্থের পুনরুদ্ধার বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে নীতি সহায়তা দেয়। এর আওতায় সমস্যাগ্রস্ত ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করে নতুন পরিশোধসূচি নির্ধারণের সুযোগ দেয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্রেস পিরিয়ডও দেয়া হয়।
নীতিগতভাবে এ ধরনের ছাড়ের উদ্দেশ্য হলো- ব্যবসায় পুনরুদ্ধারের জন্য উদ্যোক্তাকে একটি নির্দিষ্ট সময় দেয়া, যাতে তিনি উৎপাদন ও ব্যবসায় স্বাভাবিক করে নগদ অর্থপ্রবাহ তৈরি করতে পারেন এবং পরবর্তী সময়ে নতুন সূচি অনুযায়ী ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, কিছু ব্যাংক সেই ছাড়কাল শেষ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট ঋণ হিসাবকে এসএমএ বা বিশেষ নজরদারির আওতায় নিয়ে আসছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া নীতি সহায়তা কার্যকর থাকার সময়ই যদি ব্যাংক নিজস্ব মূল্যায়নের ভিত্তিতে হিসাবটির ঝুঁকির অবস্থান পরিবর্তন করে, তাহলে সেই নীতি সহায়তার বাস্তব কার্যকারিতা কতটা থাকছে?
‘কিস্তি দেয়ার সময়ই আসেনি’
সংশ্লিষ্ট এক উদ্যোক্তা জানান, দীর্ঘদিনের আর্থিক সঙ্কটের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযোজ্য নীতি সহায়তার আওতায় তার ঋণ হিসাব পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের অনুমোদন দেয়া হয়। এর অংশ হিসেবে নতুন ঋণ পরিশোধসূচি নির্ধারণ করা হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্রেস পিরিয়ড দেয়া হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত তারিখ থেকে কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু কিস্তি পরিশোধের সময় শুরু হওয়ার আগেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ হিসাবটির শ্রেণিকরণে পরিবর্তন এনেছে।
ঋণগ্রহীতার প্রশ্ন, যে সময়ের মধ্যে কোনো কিস্তি পরিশোধ করার আইনগত বা চুক্তিগত বাধ্যবাধকতাই  নেই, সেই সময়কে কীভাবে বকেয়া বা অনিয়মিত ঋণের ঝুঁকির সাথে যুক্ত করা হচ্ছে? বিশেষ করে অনুমোদিত নতুন পরিশোধসূচি অনুযায়ী কোনো কিস্তি এখনো পরিশোধযোগ্য না হলে, শুধু ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ নিয়ে আশঙ্কার ভিত্তিতে হিসাবটিকে বিশেষ নজরদারিতে নেওয়ার যৌক্তিকতা কী?
তার অভিযোগ, এ ধরনের শ্রেণিকরণ শুধু ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে উদ্যোক্তার ভবিষ্যৎ অর্থায়ন, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং ব্যাংকিং গ্রহণযোগ্যতার ওপরও।
ব্যাংকের ‘গুণগত মূল্যায়ন’ বনাম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, ঋণ হিসাবের শ্রেণিকরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা এবং সংশ্লিষ্ট ঋণচুক্তির শর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের পর নতুন পরিশোধসূচি কার্যকর হলে হিসাবের বর্তমান অবস্থা নির্ধারণের সময় সেই সূচি বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে গ্রেস পিরিয়ড চলাকালে কোনো কিস্তি পরিশোধযোগ্য হয়েছে কি না, তা যাচাই না করে হিসাবকে অনিয়মিত বা বিশেষ নজরদারি হিসেবে চিহ্নিত করা হলে তা নিয়ে আপত্তির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে ব্যাংকের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়ন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার কথাও নয়। গ্রাহকের ব্যবসার অবস্থা, আয়, নগদ অর্থপ্রবাহ, সম্পদের মূল্য, বাজার পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংক নিজস্ব ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে- এই গুণগত মূল্যায়ন প্রয়োগের সীমা কোথায়? বাংলাদেশ ব্যাংক যখন নির্দিষ্ট শর্তে পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের অনুমোদন দিয়েছে এবং গ্রাহককে নির্দিষ্ট সময়ের গ্রেস পিরিয়ড দিয়েছে, তখন সেই কাঠামো কার্যকর থাকা অবস্থায় ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়নের ভিত্তিতে হিসাবের অবস্থান পরিবর্তন করা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তার উদ্দেশ্যই দুর্বল হয়ে পড়ে কি না।
এসএমএ বাড়লে সামনে খেলাপির চাপ
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসএমএ নিজেই খেলাপি ঋণ নয়। তবে এটি এমন একটি সঙ্কেত, যার বড় অংশ পরবর্তীতে খেলাপিতে পরিণত হলে ব্যাংকিং খাতের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
জুন শেষে প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার এসএমএ ঋণ থাকায় আগামী কয়েক মাসে এর একটি অংশ খেলাপিতে পরিণত হলে ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান আরো দুর্বল হবে। এর প্রভাব পড়বে প্রভিশন সংরক্ষণ, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং ব্যাংকের মুনাফার ওপর। ইতোমধ্যে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে প্রভিশন ঘাটতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রায় ছয় লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল চার লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করতে পেরেছে মাত্র দুই লাখ ৬১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা।
প্রভিশন ঘাটতির সাথে বাড়ছে মূলধন সঙ্কট
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির সাথে সাথে ব্যাংককে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে বেশি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু বিপুল খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায়। আবার অনেক ব্যাংকের বর্তমান মুনাফা দিয়েও প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে একদিকে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতি, অন্যদিকে দুর্বল হচ্ছে ব্যাংকের মূলধনভিত্তি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মানে।
এ অবস্থায় এসএমএ হিসাবের একটি বড় অংশ যদি আগামী সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপিতে পরিণত হয়, তাহলে ব্যাংকগুলোর ওপর নতুন করে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ তৈরি হবে। ইতোমধ্যে যে ব্যাংকগুলো বিশাল প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
নীতি সহায়তার উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাগ্রস্ত কিন্তু সম্ভাবনাময় ব্যবসায়গুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন একটি প্রয়োজনীয় নীতিগত ব্যবস্থা হতে পারে। তবে এ ধরনের সুবিধা কার্যকর করতে হলে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা- উভয় পক্ষের জন্য নিয়মের স্পষ্টতা থাকতে হবে।
গ্রেস পিরিয়ড চলাকালীন কোন পরিস্থিতিতে একটি ঋণ হিসাবকে এসএমএ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তা করা যাবে না- এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে অভিন্ন প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে নীতি সহায়তার সুফল ব্যাহত হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি হলো- এসএমএ হিসেবে চিহ্নিত এক লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা। এর কত অংশ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের আওতায় রয়েছে, কত অংশের গ্রেস পিরিয়ড এখনো শেষ হয়নি, কত অংশের কিস্তি বাস্তবে পরিশোধযোগ্য হয়েছে এবং কত অংশ কেবল ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি মূল্যায়নের কারণে এসএমএ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে- এসব তথ্য আলাদাভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
কারণ, এসব হিসাবের প্রকৃত চরিত্র পরিষ্কার না হলে আগামী সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কতটা বাড়তে পারে, তা নিরূপণ করা কঠিন। আর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগেই যদি ঋণ হিসাবকে ঝুঁকির তালিকায় ঠেলে দেয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই- ব্যাংক কি আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করছে, নাকি বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া পুনর্গঠন সুবিধার কার্যকারিতাকেই খর্ব করছে?
এ প্রশ্নের উত্তর শুধু সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তার জন্য নয়; ব্যাংকিং খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।