উচ্চফলনশীল ‘সিকৃবি সরিষা-১’, (ডানে) উদ্ভাবক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. দিলারা আক্তার
উচ্চফলনশীল ‘সিকৃবি সরিষা-১’, (ডানে) উদ্ভাবক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. দিলারা আক্তার। নয়া দিগন্ত

দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ এবং প্রতিকূল পরিবেশে কৃষির বিস্তার ঘটাতে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সিকৃবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের অধ্যাপক ড. দিলারা আক্তারের নেতৃত্বে গবেষক দল প্রতিকূল পরিবেশে চাষ উপযোগী উচ্চফলনশীল সরিষার নতুন জাত ‘সিকৃবি সরিষা-১’ উদ্ভাবন করেছেন। গবেষকদের মতে, এটি দেশের অম্ল (অ্যাসিডিক) মাটিতে সর্বোচ্চ ফলনশীল সরিষার জাত।

Advertisement

দীর্ঘ চার মৌসুমের নিবিড় গবেষণার পর জাতীয় বীজ বোর্ড গত ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সভায় জাতটিকে অনুমোদন ও নিবন্ধন দিয়েছে। পাশাপাশি সমগ্র বাংলাদেশে চাষাবাদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সুপারিশ করেছে।

গবেষকদের তথ্য ও জাতীয় বীজ বোর্ডের নিবন্ধনপত্র অনুযায়ী, ইনব্রিড জাতের এই সরিষা দেশের বর্তমান সরিষার জাতগুলোর তুলনায় অধিক উৎপাদনশীল ও লাভজনক।

প্রতি হেক্টরে এর গড় ফলন এক দশমিক পাঁচ মেট্রিক টন। এই জাতে আয়-ব্যয়ের অনুপাত (বিসিআর) ৫:১। অর্থাৎ চাষে প্রতি এক টাকা বিনিয়োগে কৃষকের পাঁচ টাকা লাভের সুযোগ রয়েছে।

প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীলতা
সিলেট অঞ্চলসহ হাওরাঞ্চলের অনাবাদী অম্লীয় মাটিতে এই জাতের সরিষা অত্যন্ত অনায়াসে ও সফলভাবে চাষ করা যাবে।

জীবনকাল ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য
রবি মৌসুমে (অক্টোবরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির শেষ) চাষ উপযোগী এই জাতের ফসল তুলতে ১১৫ থেকে ১২৫ দিন সময় লাগে। গাছের দৈর্ঘ্য ২০০-২৩০ সেমি, ফুল উজ্জ্বল হলুদ ও বীজের খোসা লালচে রঙের হয়। এই জাতের এক হাজার বীজের ওজন ৩.৫ থেকে ৩.৯ গ্রাম।

স্বাস্থ্যসম্মত তেল ও রোগ প্রতিরোধ
এতে ৪২-৪৪ শতাংশ তেল পাওয়া যায় এবং ক্ষতিকর ইরুসিক অ্যাসিডের মাত্রা কম থাকায় এটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যসম্মত। জাতটি অল্টারনারিয়া পাতা ঝলসানো রোগ মাঝারি মাত্রায় প্রতিরোধ করতে পারে এবং এতে জাবপোকার আক্রমণ তুলনামূলক অনেক কম হয়।

সহজ ও সাশ্রয়ী চাষপদ্ধতি
সারিতে বপনে হেক্টরপ্রতি মাত্র ১.৮ কেজি বীজ লাগে এবং মাত্র দু’টি সেচেই নিশ্চিত ফলন পাওয়া সম্ভব।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মুহাম্মদ সফি উল্লাহ মজুমদার বলেন,
‘‘সিকৃবি সরিষা-১’ আমাদের গবেষকদের এক অনন্য অর্জন। দেশীয় কৃষিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে এবং প্রতিকূল পরিবেশের জমি— বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের পতিত জমিতে চাষাবাদ ফিরিয়ে আনতে এই জাতটি মুখ্য ভূমিকা রাখবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রেখে আমাদের শিক্ষকরা তাদের গবেষণার উৎকর্ষতা প্রমাণ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই নতুন জাত দ্রুত কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সব ধরনের সহযোগিতা করবে।’

উদ্ভাবক দলের প্রধান ও কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের অধ্যাপক ড. দিলারা আক্তার বলেন, ‘প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে দেশকে ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়। সিলেট ও হাওরাঞ্চলের অম্লীয় মাটির অনাবাদী জমিতে ‘সিকৃবি সরিষা-১’ চাষের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। এতে কৃষক যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন, তেমনি দেশও স্বাস্থ্যকর ভোজ্যতেল উৎপাদনে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে। জাতটি যেন দ্রুত দেশের প্রান্তিক কৃষকদের হাতে পৌঁছায়, আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করছি।’

সহজ চাষপদ্ধতি ও স্বল্প খরচে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়ার সুযোগ থাকায় ‘সিকৃবি সরিষা-১’ খুব দ্রুতই সারাদেশের কৃষকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাবে বলে আশা করছেন গবেষক দল।