
মিরপুরের ব্যস্ত রাস্তায় সাইকেলের প্যাডেলে গতি তুলছিলেন পান্থ। তীব্র গরম আর যানজট এড়িয়ে দ্রুত পৌঁছাতে হবে বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে; কেননা সেখানে অপেক্ষা করছিলেন তার খালা। সামনে ওপেন হার্ট সার্জারি, প্রয়োজন রক্ত। মিরপুর থেকে বসুন্ধরা পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছালেন পান্থ। কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের বেডে শুয়ে নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে এলেন প্রিয়জনের জন্য। সেদিনের ক্লান্তিকে ছাপিয়ে কঠিন সময়ে প্রিয়জনের পাশে দাঁড়াতে পেরে তার মনে ছিল এক ধরনের প্রশান্তি।
মানুষের প্রয়োজনে এভাবে এগিয়ে যাওয়ার গল্প অবশ্য সেদিন থেকে শুরু হয়নি। এর শুরু আরও দুই বছর আগে, ২০১৯ সালের ২১ আগস্ট, মাত্র ১৮ বছর বয়সে। অন্তঃসত্ত্বা বোনের সন্তান জন্মের সময় ঘনিয়ে এসেছিল, জরুরি প্রয়োজন ছিল রক্তের। অনেক খোঁজ করেও যখন কাউকে পাওয়া গেল না, তখন নিজেই এগিয়ে এসেছিলেন। সেদিনই প্রথমবারের মতো বোনকে রক্ত দেন তিনি।
রক্ত দেয়ার আগে অবশ্য ভয় কাজ করছিল পান্থের মধ্যে। মোটা সুঁইয়ের ভয়, রক্ত দেয়ার পর দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা—সবই ছিল। কিন্তু বোনের প্রয়োজনের কাছে সেসব ভয় আর বড় হয়ে ওঠেনি। রক্ত দেয়া শেষে শরীরে কোনো দুর্বলতা অনুভব না করে বরং এক ধরনের স্বস্তি পেয়েছিলেন তিনি।
প্রথমবারের পর আর থেমে থাকেননি। ২০২১ সালে চাচার কিডনি ডায়ালাইসিস ও খালার ওপেন হার্ট সার্জারির সময় আবারো রক্ত দেন। ধীরে ধীরে পরিচিত গণ্ডি ছাড়িয়ে বাড়তে থাকে তার রক্তদানের পরিধি। সেই পান্থ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এখন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) টেক্সটাইল মেশিনারি ডিজাইন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর সিনিয়রদের বাবা-মা, বন্ধুদের আত্মীয় কিংবা পরিচিত কারও জরুরি রক্তের প্রয়োজনের খবর পেলেই ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন পান্থ। এভাবেই একসময় রক্তদান তার জীবনের নিয়মিত মানবিক কর্মকাণ্ডের অংশ হয়ে ওঠে।
কখনো সাইকেলে, কখনো বাইকে রক্তের প্রয়োজনে ছুটেছেন ঢাকা মেডিক্যাল, আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল, সিএমএইচ কিংবা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। এভাবেই ২৫ বছর বয়সী পান্থ এখন পর্যন্ত ১৮ বার রক্ত দিয়েছেন।
তবে ১৮টি রক্তদানের মধ্যে কিছু মুহূর্ত তার স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে আছে। ২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি ঢাকা মেডিক্যালে পাঁচ বছর বয়সী এক থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্য রক্ত দিতে গিয়েছিলেন তিনি। শিশুটির ক্লান্ত মুখ আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা-মায়ের অসহায় চোখ তাকে ভেতর থেকে নাড়া দেয়। রক্ত দেয়ার পর শিশুটির মুখে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রং ফিরতে দেখেছিলেন পান্থ। সেই মুহূর্তে তার কাছে এক ব্যাগ রক্তের মূল্য যেন নতুন অর্থ পেয়েছিল।
রক্তদানের পথে কষ্টও কম ছিল না। তীব্র যানজট, প্রচণ্ড গরম, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানো কিংবা করিডোরে রক্তের জন্য স্বজনদের হাহাকার—সবই দেখেছেন কাছ থেকে। কখনো রক্তের ব্যবস্থা করতে না পেরে স্বজনদের কান্নাও শুনেছেন। তবু এসব অভিজ্ঞতা তাকে থামায়নি।
১৮ সংখ্যাটিকেও কোনো শেষ সীমা মনে করেন না পান্থ। রক্ত দেয়ার উপযুক্ত থাকা পর্যন্ত এই কাজ চালিয়ে যেতে চান তিনি।
তার ভাষায়, ‘১৮ বার কোনো বড় অর্জন নয়, বরং এটি একটি চলমান মানবিক দায়িত্ব। সুঁইয়ের ভয় কয়েক সেকেন্ডের, কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডের সাহসই কখনো একটি পরিবারকে ফিরিয়ে দিতে পারে স্বস্তি, ফিরিয়ে দিতে পারে প্রিয় মানুষটিকে। আর সেই অনুভূতিই আমাকে বারবার রক্ত দিতে ফিরিয়ে আনে। এই মানবিক দায়বদ্ধতা এবং নিঃস্বার্থভাবে কারও মুখে বেঁচে থাকার হাসি দেখার তৃপ্তি থেকেই আমি নিয়মিত রক্ত দিই।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








