মেলা
খাদ্যশিল্প মেলা। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে শুরু হয়েছে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ‘সিয়াল প্যারিস ২০২৬’। ১৭ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত প্যারিস-নর্দ ভিলপ্যাঁত প্রদর্শনী কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে পাঁচ দিনব্যাপী এ আয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খাদ্য উৎপাদক, পরিবেশক, আন্তর্জাতিক ক্রেতা, বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে মেলাটি নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গঠন, উদ্ভাবনী পণ্য উপস্থাপন এবং বিশ্ব খাদ্যবাজারে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বৃদ্ধি ও রফতানি বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে।

Advertisement

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এবারের মেলায় প্রায় তিন লাখ পেশাজীবী দর্শনার্থীর সমাগম প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যাদের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদেশী। এতে আট হাজারের বেশি প্রদর্শক অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। মোট দুই লাখ ৮০ হাজার বর্গমিটার প্রদর্শনী এলাকাজুড়ে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী সমাধান তুলে ধরা হচ্ছে।

সিয়াল প্যারিস কেবল খাদ্যপণ্যের প্রদর্শনী নয়; এটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও বাজার সম্প্রসারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। পাঁচ দিনের এ আয়োজনে বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান নতুন বাজার অনুসন্ধান, ব্যবসায়িক অংশীদার খোঁজা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছে।

আয়োজকদের হিসেবে, মেলায় পাঁচ হাজার বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতার অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত। তাদের সম্মিলিত ক্রয়ক্ষমতা ১০০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি। আয়োজকদের দাবি, একজন প্রদর্শক গড়ে ১৩৬টি পেশাগত যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ পান। অন্যদিকে, ৮১ শতাংশ ক্রেতা মেলায় সরাসরি অথবা মেলা-পরবর্তী সময়ে লেনদেন সম্পন্ন করেন।

বাহরাইন, বেনিন ও কিরগিজস্তানের মতো নতুন দেশের অংশগ্রহণ এবারের মেলার আন্তর্জাতিক পরিসরকে আরো বিস্তৃত করেছে। বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণ বিশ্ব খাদ্যবাজারের বৈচিত্র্য, নতুন ভোক্তা চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তনশীল প্রবণতা তুলে ধরছে।

এবারের আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ সিয়াল সামিটসের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন। এসব সম্মেলনে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুষ্টির মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

‘নুরি আঁ মন্দ সু তঁসিয়োঁ’ বা ‘উত্তেজনা ও সঙ্কটের মধ্যে বিশ্বকে খাদ্য জোগানো’ শীর্ষক প্রথম সম্মেলনে বার্ত্রঁ পিকার্ডের অংশগ্রহণে ভূরাজনৈতিক ও জলবায়ুগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় খাদ্যশিল্পের অভিযোজন কৌশল নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

দ্বিতীয় সম্মেলন ‘ফুড ইন্টেলিজেন্স : রেদেফিনির লা শেন দ্য ভালর’ বা ‘খাদ্যবিষয়ক বুদ্ধিমত্তা : খাদ্যশিল্পের মূল্যশৃঙ্খলকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা’ শীর্ষক আলোচনায় খাদ্য সরবরাহব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার গুরুত্ব পাবে। এতে ক্যারেফুরের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা অলিভিয়ে জিবারের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে।

তৃতীয় সম্মেলন ‘লের দ্য লালিমঁত পার্সোনালিজে’ বা ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক খাদ্যব্যবস্থার যুগ’-এ ব্যক্তির পুষ্টিগত চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যপণ্য তৈরির বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি তুলে ধরা হবে।

নতুন উদ্যোক্তা ও খাদ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মেলায় বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ৬৫০টির বেশি নবীন উদ্যোগের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ১৫০টি প্রতিষ্ঠান হল পাঁচ-এ ও হল ছয়-এর মাঝামাঝি নির্ধারিত নবীন উদ্যোগের বিশেষ প্রদর্শনী এলাকায় নিজেদের উদ্ভাবন তুলে ধরবে।

উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্প খাদ্য, স্বাস্থ্যসম্মত কার্যকরী খাদ্য, চিনি ও লবণের ব্যবহার কমানো এবং ঐতিহ্যবাহী খাদ্য উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ; এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে নতুন পণ্য ও সমাধান প্রদর্শিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগ খাদ্য উৎপাদনের প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি ভোক্তাদের পরিবর্তিত চাহিদা পূরণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপনের বিশেষ মঞ্চে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগকারী ও বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সামনে নিজেদের প্রকল্প তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি ‘ত্রিশ সেকেন্ডে ত্রিশটি সেরা ধারণা’ কর্মসূচীতে নির্বাচিত ৩০টি প্রতিষ্ঠান সংক্ষিপ্ত সময়ে তাদের উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করবে।

খাদ্যশিল্পে পরিবেশগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরুত্ব তুলে ধরতে হল ছয়-এর মধ্যবর্তী তলায় আয়োজন করা হয়েছে ‘সিয়াল ফর চেঞ্জ’। এখানে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, টেকসই কৃষি এবং দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

খাদ্যবিষয়ক সাময়িকীর সাথে অংশীদারত্বে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় প্রদর্শনীতে অংশ না নেয়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান এবং নবীন উদ্যোগগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে এলএসডিএইচ গোষ্ঠীর সামগ্রিক দায়বদ্ধতামূলক উদ্যোগ এবং অরিজিন প্রতিষ্ঠানের কৃষকদের পুনর্জননমূলক কৃষির দিকে এগিয়ে নিতে সহায়তার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া বিশেষজ্ঞদের আলোচনা, কর্মসংস্থানবিষয়ক মঞ্চ এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য চিহ্নিত করার জন্য নির্ধারিত পরিদর্শনপথও থাকছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে খাদ্যশিল্পে পরিবেশগত প্রভাব কমানো এবং উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক চর্চাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

এবারের নতুন আকর্ষণ সিয়াল স্ট্রিট ল্যাব। হল ছয়-এর প্রবেশপথে ৬০০ বর্গমিটারের বেশি জায়গাজুড়ে প্যারিসের একটি রাস্তার আদলে এ বিশেষ প্রদর্শনী এলাকা তৈরি করা হয়েছে।

বাড়ির বাইরে খাবার গ্রহণ, দ্রুত পরিবেশনযোগ্য খাবার এবং পরিবর্তিত জীবনযাত্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ খাদ্যপণ্যের বাজার কীভাবে বদলাচ্ছে, তা এখানে তুলে ধরা হবে। নেলি রোদি প্রতিষ্ঠানের সাথে পরিচালিত ভবিষ্যৎ বাজারবিষয়ক গবেষণার ভিত্তিতে সাজানো এ পরিসরে থাকবে বিভিন্ন খাবার ও পানীয়ের কেন্দ্র, সরাসরি রান্নার প্রদর্শনী এবং রন্ধনশৈলীর সরাসরি পরিবেশনা।

খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, দ্রুতগতির নগরজীবন এবং ভোক্তাদের নতুন চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে তৈরি এ উদ্যোগ খাদ্য ব্যবসায়ীদের সামনে ভবিষ্যৎ বাজারের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরবে।

খাদ্যশিল্পের নতুন প্রবণতা ও ভবিষ্যৎ বাজারের সম্ভাবনা চিহ্নিত করার অন্যতম উদ্যোগ সিয়াল ইনোভেশন ২০২৬ সালে ৩০ বছর পূর্ণ করছে। হল ছয়-এ প্রোতিন এক্সটিসির সহযোগিতায় আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় উদ্ভাবনী খাদ্যপণ্য ও প্রযুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে।

এবারের পুরস্কার বিভাগে রয়েছে ফ্রান্স পুরস্কার, রেস্তোরাঁ ও প্রাতিষ্ঠানিক খাদ্য পরিষেবা পুরস্কার এবং কার্যকরী খাদ্য ও পুষ্টিসহায়ক খাদ্যপণ্যের মতো বিশেষ শ্রেণি। পাশাপাশি সিয়াল লাইভ মঞ্চে বাজার বিশ্লেষণ ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হবে।

খাদ্যপণ্যের গুণগত মান, পুষ্টিগুণ, উৎপাদনপ্রযুক্তি ও বাজারজাতকরণে নতুনত্বের স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে এ উদ্যোগ খাদ্যশিল্পে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নতুন পণ্য পরিচিত করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এ আন্তর্জাতিক খাদ্য প্রদর্শনী বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের জন্যও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে দেশীয় খাদ্যপণ্য পরিচিত করা, রফতানি বাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ ধরনের মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের তালিকায় প্রাণ গ্রুপ, বসুন্ধরা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, সিটি গ্রুপ, এসিআই, আকিজ ফুড, কাজী ফার্মস ও ওয়াক ফুডের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সিয়াল প্যারিস ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক প্রদর্শক তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রাণ গ্রুপ ও ইস্পাহানি লিমিটেড; এই দুটি প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (কমার্শিয়াল) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, এবার সিয়াল মেলায় অংশ নেয়নি রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)।

বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদকদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে পণ্যের গুণগত মান, খাদ্যনিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, আকর্ষণীয় মোড়ক এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উন্নয়ন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সিয়াল প্যারিসের মতো আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এসব বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন এবং বিদেশী ক্রেতাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মসলা, হালকা নাশতা, পানীয় এবং অন্যান্য কৃষিভিত্তিক পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পণ্যের মান বজায় রাখা, নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং রফতানির নিয়মকানুন অনুসরণ করা জরুরি।

সব মিলিয়ে সিয়াল প্যারিস ২০২৬ আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারের পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, টেকসই উৎপাদন এবং নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনাকে একই মঞ্চে তুলে ধরছে। বিশ্ব খাদ্যশিল্পের সাথে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এ মেলা নতুন বাজারে প্রবেশ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কৌশল নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের জন্যও আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে এ ধরনের উদ্যোগ থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।